পশ্চিমবঙ্গে জমি আন্দোলনে গুলি, একজন নিহত

Image caption সংঘর্ষের পর পুলিশের সতর্ক অবস্থান

পশ্চিমবঙ্গের দক্ষিণ চব্বিশ পরগণা জেলায় বিদ্যুতের সাবস্টেশন তৈরি করাকে ঘিরে আজ পুলিশ ও গ্রামবাসীদের মধ্যে দফায় দফায় সংঘর্ষ হয়েছে। সংঘর্ষের সময়ে গুলিতে আহত হয়েছেন চারজন, যার মধ্যে একজনের মৃত্যু হয়েছে বলে স্থানীয় মানুষদের দাবী।

পুলিশ বলছে তারা নয়, গুলি চালিয়েছে বহিরাগত কিছু দুষ্কৃতি - যাতে একজন মারা গেছেন।

ওদিকে গ্রামবাসীরা বেশ কয়েকটি পুলিশ গাড়িতে আগুন লাগিয়েছে আর ভাঙচুর করে পুকুরে ফেলে দিয়েছে।

মানুষের বিক্ষোভের ফলে ওই বিদ্যুৎ সাবস্টেশনের প্রকল্প বাতিল করার ঘোষণা করেছে পশ্চিমবঙ্গ সরকার।

দক্ষিণ চব্বিশ পরগণার ভাঙড় এলাকায় বিদ্যুৎ সাবস্টেশন গড়া নিয়ে গত কয়েকদিন ধরে চলতে থাকা বিক্ষোভ ও পুলিশের সঙ্গে আন্দোলনকারীদের সংঘর্ষের সময়ে আজ গুলিতে একগ্রামবাসী মারা গেছেন। আহত হয়েছেন আরও তিনজন।

রাজ্য পুলিশের এ ডি জি (আইন শৃঙ্খলা) অনুজ শর্মা বিবিসিকে জানিয়েছেন, "পুলিশ গুলি চালায় নি আজ। আন্দোলনকারীদের মধ্যে মিশে থাকা কিছু বহিরাগত দুষ্কৃতিরাই গুলি চালিয়েছে। গুলিবিদ্ধ একজনকে কলকাতার এস এস কে এম হাসপাতালে নিয়ে আসা হয়েছিল। পথেই তাঁর মৃত্যু হয়েছে বলে আমরা খবর পেয়েছি।"

ভাঙ্গড় এলাকায় বেশ কিছুদিন ধরেই বিক্ষোভ চলছিল সাবস্টেশনটির বিরুদ্ধে। কেন্দ্রীয় সরকারী বিদ্যুৎ সংবহন সংস্থা পাওয়া গ্রিড কর্পোরেশন ওই সাবস্টেশনটি বানাচ্ছিল। কাজ অনেকটা এগিয়েও গিয়েছিল। কিন্তু স্থানীয় মানুষ বলেন, তাঁদের ভুল বুঝিয়ে জমি নেওয়া হয়েছিল। তাই এখন জমি ফেরত দিতে হবে।

সোমবারও সেখানে বিক্ষোভ দেখান স্থানীয় মানুষ - আর তারপরে রাতে আন্দোলনকারীদের এক নেতাকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। গ্রামবাসীদের অভিযোগ সেই সময়ে পুলিশ গ্রামের মানুষকে হয়রানি করে। বেশ কিছু ঘরদোর ভাঙচুর করে পুলিশ।

তার পরে আজ সকাল থেকেই এলাকা উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। যদিও ছেড়ে দেওয়া হয়েছিল ধৃত ওই নেতাকে।

Image caption ঘটনাস্থলে উত্তেজিত জনতা

আন্দোলনকারীদের একজন - ভাঙ্গরের বাসিন্দা আবু জাফর জানাচ্ছিলেন, "রাতে প্রচুর পুলিশ ঢুকেছিল গ্রামে। বহু লোককে মারধর করেছে। সেই রাগে আজ সকাল থেকেই সবাই রাস্তায় নেমে পড়েছিল। প্রায় হাজার দশেক লোক পুলিশদের ঘিরে রেখেছিল। কিন্তু পুলিশের একাংশ যেভাবে বন্দুক উঁচিয়ে ছিল তা দেখে উত্তেজনা বাড়ে। আবার আমাদের মধ্যেও কিছু দুষ্কৃতি ঢুকে পড়েছিল - এদের জন্যই কিছু দুষ্কৃতির জন্য অবস্থা খারাপের দিকে যায়। ওই লোকগুলো বোম মারে পুলিশের দিকে, স্বাভাবিকভাবে পুলিশও উত্তেজিত হয়ে প্রচণ্ড মারধর করে।"

সারাদিন ধরে মাঝে মাঝেই সংঘর্ষও হয় দুতরফে - পুলিশকে লক্ষ্য করে যেমন ঢিল, ছোঁড়া হয়, তেমনই তাদের গাড়িও ভাঙচুর করা হয়। পুলিশও রবার বুলেট, কাঁদুনে গ্যাস চালায়। বিকেলের দিকে গ্রাম থেকে পুলিশবাহিনী বেরিয়ে আসার সময়ে আবারও সংঘর্ষ তীব্র হয়। পুলিশের গাড়িতে আগুন দেওয়া হয়, অন্তত চারটি গাড়ি পুকুরে ফেলে দেওয়া হয়।

এদিকে অবস্থা নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে দেখে সরকার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল দুপুরেই যে ওই সাবস্টেশন গড়ার প্রকল্প বাতিল করে দেওয়া হবে। আর সেই সরকারী সিদ্ধান্ত গ্রামের মানুষদের কাছে পৌঁছে দিতে পাঠানো হয় দীর্ঘদিন বামফ্রন্টের মন্ত্রী থাকা ও বর্তমান সরকারেরও সিনিয়র মন্ত্রী আব্দুর রেজ্জাক মোল্লাকে।

তিনি বিবিসিকে বলছিলেন, " আমি গিয়ে গ্রামে গ্রামে ঘুরে মানুষকে বলে এসেছি যে মমতা ব্যানার্জীর সিদ্ধান্ত নিয়েছে, ভাঙ্গরের মানুষ না চাইলে ওখানে সাবস্টেশন হবে না। আর দ্বিতীয় কথা বলেছি যে জমির চরিত্র পরিবর্তন করাও বন্ধ থাকবে। ওখানে কয়েক হাজার বিঘা জমি বিভিন্ন বেসরকারি নানা প্রকল্পের জন্য কিনে রেখেছে। এরাই আন্দোলনকারীদের উস্কাচ্ছে। তারা যেমন চাষজমি কিনেছে, সেখানে চাষই করতে হবে, অন্য কিছু চলবে না।"

ওদিকে এই আন্দোলনের প্রেক্ষিতে প্রশ্ন উঠে আসছে যে তৃণমূল কংগ্রেস সরকার সিঙ্গুর নন্দীগ্রামে জমি আন্দোলনের মধ্যে দিয়েই ক্ষমতায় এসেছিল, তারা কীভাবে গ্রামবাসীদের ইচ্ছার বিরুদ্ধে গিয়ে জমি নিয়ে সাবস্টেশন গড়তে গিয়েছিল।

তৃণমূল কংগ্রেস দলের মহাসচিব পার্থ চ্যাটার্জীর কথায়, "সিঙ্গুর নন্দীগ্রামে জোর করে পুলিশ দিয়ে জমি দখল করা হয়েছিল বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের জন্য। কিন্তু এখানে সরকারী বিদ্যুৎ সাবস্টেশনের জন্য ওই গ্রামের লোকই তো জমি দিয়েছিল। এখন যদি তাঁরা মনে করেন যে বিদ্যুতের দরকার নেই, উন্নয়নের দরকার নেই, তাহলে মানুষের সঙ্গে কথা বলেই সিদ্ধান্ত হবে। এটা আমাদের সরকারের ঘোষিত নীতি যে জোর করে পুলিশ দিয়ে জমি অধিগ্রহণ করা হবে না।"

পুলিশ যদিও বলছে সন্ধ্যা থেকে ভাঙ্গড় এলাকার পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রয়েছে, সিনিয়র অফিসারের সেখানে অবস্থান করছেন এবং আরও বাহিনী পাঠানো হচ্ছে, তবে স্থানীয় মানুষরা বিভিন্ন জায়গায় প্রতিরোধ তৈরি করেছেন যাতে পুলিশ গ্রামে না ঢুকতে পারে।