গরু নিয়ে বিজেপির কেন আগ্রাসী মনোভাব?

ইউপি'তে নির্বাচনী বিজয় বিজেপিকে এই কৌশলে উৎসাহিত করছে বলে বিরোধীদলীয় রাজনীতিকরা বলছেন। ছবির কপিরাইট AFP
Image caption ইউপি'তে নির্বাচনী বিজয় বিজেপিকে এই কৌশলে উৎসাহিত করছে বলে বিরোধীদলীয় রাজনীতিকরা বলছেন।

ভারতে একের পর এক বিজেপি শাসিত রাজ্যে গরু হত্যাকারীদের কঠোর সাজা হবে বলে সরকার হুঁশিয়ারি দিচ্ছে, পাশাপাশি বন্ধ করে দেয়া হচ্ছে কসাইখানাগুলো।

গরু হত্যা করলে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড হবে, গুজরাট এই মর্মে আইন পাস করার ঠিক পর পরই ছত্তিশগড়ের মুখ্যমন্ত্রী রমন সিং-ও জানিয়েছেন, গোহত্যাকারীদের তার সরকার সোজা ফাঁসিতে ঝুলিয়ে দেবে।

বিজেপি শাসিত নানা রাজ্যে কসাইখানা থেকে শুরু করে মুরগী বা পাঁঠার মাংসের দোকান পর্যন্ত বন্ধ করে দেওয়া হচ্ছে।

বিরোধীদের মতে এটা তাদের সাম্প্রদায়িক বিভাজনের রাজনীতি ছাড়া কিছু নয়।

কিন্তু কেন গরু রক্ষার নামে বিজেপি আচমকা এমন আগ্রাসী মনোভাব দেখাচ্ছে?

গত দু'দশক ধরে বিজেপির দুর্গ বলে পরিচিতি গুজরাটে ভোট এ বছরের শেষের দিকেই।

কিন্তু নানা কারণে বিজেপির অবস্থা সেখানে বেশ নড়বড়ে বলেই পর্যবেক্ষকদের ধারণা।

এ সপ্তাহে সেখানে বিধানসভার অধিবেশনের শেষ দিনে বিজেপি সরকার এমন একটি আইন পাস করিয়েছে, যাতে গরু মারলে হত্যাকারীর ১৪ বছর জেল ও পাঁচ লাখ রুপি পর্যন্ত জরিমানা হবে।

গোহত্যার জন্য এত কঠোর সাজা সারা দেশে আর কোথাও নেই।

বিজেপি শাসিত আর একটি রাজ্য ছত্তিশগড়ে ভোট আগামী বছর, সেখানে মুখ্যমন্ত্রী রমন সিং অবশ্য আরও এক ধাপ এগিয়ে ফাঁসির সাজার কথা শুনিয়ে রেখেছেন।

তাকে যখন এ ব্যাপারে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, মুখ্যমন্ত্রী রমন সিং সগর্বে জানান তার রাজ্যে গত ১৫ বছরে একটাও গরু মারার ঘটনা ঘটেনি।

কিন্তু যদি কেউ মারে, তাকে তিনি "সটান ফাঁসিতে লটকে" দেবেন।

ছবির কপিরাইট AFP
Image caption আহমেদাবাদে নিজের গরুর সাথে সেলফি তুলছেন ভিজয় প্রাসান্না।

বিরোধীরা বলছেন, গরু রক্ষার নামে বিজেপি যে এই ধরনের আক্রমণাত্মক মনোভাব দেখাচ্ছে সেটা আসলে উত্তরপ্রদেশের সাফল্য থেকে উৎসাহিত হয়েই।

বামপন্থী এমপি তপন সেন বিবিসিকে বলছিলেন, এই সব কথা বলে মুসলিমদের বিরুদ্ধে হিন্দু ভোট যে এককাট্টা করা যায়, বিজেপি তা উপলব্ধি করেছে।

মি. সেনের কথায়, "বিজেপি এজেন্ডাই হল হিন্দুরাষ্ট্র গঠন - আর এগুলো সেই বৃহত্তর পরিকল্পনারই অংশ। তা ছাড়া তারা এই সব কথা বলে ভয় ও ত্রাসের একটা পরিবেশ কায়েম করতে চায়।"

" আর দেশের যা আইনকানুন তাতে মুখ্যমন্ত্রী চাইলেই কাউকে ফাঁসিতে লটকাতে পারেন না কি? কিন্তু তবু এগুলো বলা হচ্ছে যাতে তাদের অনুগত বাহিনী মাংস-বিক্রেতা বা ব্যবসায়ীদের ওপর চড়াও হতে পারে।"

উত্তরপ্রদেশে যোগী আদিত্যনাথ মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেওয়ার পর থোকই এই প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে বলে তাঁর ধারণা।

এবং এই সাম্প্রদায়িক পোলারাইজেশন বা মেরুকরণের চেষ্টা এখন অন্য রাজ্যেও ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে বলে তিনি বলছেন।

বিজেপি নেতৃত্ব অবশ্য দাবি করছে, গোমাতার রক্ষার সঙ্গে দেশের বেশির ভাগ মানুষের ভাবাবেগের প্রশ্নটি জড়িত - আর তাই এখানে কোনও আপস করা সম্ভব নয়।

আরো দেখুন:

কাজে ফিরেই বরখাস্ত সিলেট, রাজশাহীর মেয়র

যেভাবে গ্রেফতার করা হয়েছিলো শেখ মুজিবকে

স্কুলের ৭০ জন ছাত্রীকে নগ্ন করে দেহ পরীক্ষা

গরু জবাই করলে গুজরাটে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড

ছবির কপিরাইট AFP
Image caption তামিলনাডুতে গোমাতার সেবা।

আর এ কথা তারা বলাচ্ছে দলের অন্যতম মুসলিম মুখপাত্র সৈয়দ শাহনওয়াজ হুসেনকে দিয়ে।

মি. হুসেনের মতে, "গুজরাট যেমন গোহত্যাকারীদের জন্য যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের বিধান করেছে, অন্য রাজ্যগুলিরও সেই পথ অনুসরণ করা উচিত।"

"আমরা আবেদন করব প্রত্যেক দেশবাসী যেন এই দাবিতে গলা মেলান - এবং গরুকে আমরা যেন একটি রাষ্ট্রীয় পশুর মতো সম্মান দিই", বলছেন বিজেপির ওই নেতা।

মুসলিম নেতা ও হায়দ্রাবাদের এমপি আসাদুদ্দিন ওয়াইসি পাল্টা যুক্তি দিচ্ছেন - গোরক্ষার নামে বিজেপি যেটা করছে সেটা আসলে দ্বিচারিতা ও ভণ্ডামি ছাড়া কিছুই নয়।

তিনি বলছেন, "বহু বছর ধরে বংশপরম্পরায় যারা মাংসের ব্যবসা করে আসছেন তাদের ধান্দা বন্ধ করে দেওয়া হচ্ছে - তালা ঝোলানো হচ্ছে বৈধ বিফ রফতানি ইউনিটেও। কালো টাকার কারবারিদের যদি জরিমানা দিয়ে সরকার ক্ষমা পাওয়ার সুযোগ করে দিতে পারে, তাহলে এরা কি দোষ করল?"

"আর একটা কথা হল, উত্তরপ্রদেশে গরু মাতা - অথচ মেঘালয়-মিজোরামের মতো উত্তরপূর্বাঞ্চলে বিফ খেতে খুব ভাল লাগে? এক জায়গায় গরু মাম্মি, আর অন্য জায়গায় ইয়াম্মি - এ কেমন কথা?"

কসাইখানার ব্যবসার সঙ্গে যারা জড়িত - সারা দেশে তাদের নব্বই শতাংশের বেশিই মুসলিম। ফলে বিজেপির আগ্রাসী নীতিতে কোপটা মূলত পড়ছে ভারতের সংখ্যালঘু শ্রেণীর ওপরেই।

কিন্তু উল্টোদিকে গোরক্ষার রাজনীতি সংখ্যাগরিষ্ঠদের ভোট একজোট করতে সাহায্য করবে, সম্ভবত এই অঙ্ক নিয়েই তারা এগোতে চাইছে - বিশেষ করে যে সব রাজ্যে ভোট আসন্ন।

সম্পর্কিত বিষয়