পুরুষের 'শুভ ভাবনায়' কি নারীর অবিশ্বাস দূর হয়?

দেবশ্রুতি রায়চৌধুরী ছবির কপিরাইট দেবশ্রুতি রায়চৌধুরী

এ মাসের গোড়ার দিকের কথা। কর্মসূত্রে দিল্লিতে। সকাল সকাল দৌঁড়চ্ছি সিরি ফোর্ট অডিটোরিয়াম। যাওয়ার পথে এইমস-এর সামনে ট্র্যাফিক সিগন্যালে হঠাৎই চোখ পড়ল সামনের ট্যাক্সির পেছনে লেখা বার্তায়। 'This taxi respects women'।

সোজা বাংলায় - এই ট্যাক্সি মহিলাদের প্রতি শ্রদ্ধাশীল।

চমকেই উঠলাম খানিকটা। মুহূর্তের মধ্যে ভিড় করে এলো অনেক প্রশ্ন।

ঠিক কো‌ন্‌ পরিস্থিতিতে ট্যাক্সি চালককে বিজ্ঞাপন দিয়ে ঘোষণা করতে হচ্ছে যে তিনি মহিলাদের অশ্রদ্ধা করেন না বা তাঁর বাহনে মহিলারা নিরাপদ? রাত বিরেতে বাড়ি ফিরতে এই ট্যাক্সিতে উঠলে তাঁদের কটূক্তির মতো আপাত নিরীহ বা ধর্ষণের মতো মারাত্মক বিপর্যয়ের সম্মুখীন হতে হবে না?

অন্য দিক থেকে ভাবতে গেলে পুরুষদের প্রতি মহিলাদের অনাস্থা কি এতটাই খারাপ জায়গায় পৌঁছেছে যে পুরুষকে আমি ধর্ষক নই, আমাকে বিশ্বাস করতে পারেন গোছের গোদা আশ্বাস বাণী ট্যাক্সির পেছনে বা টি শার্টের বুকে সেঁটে ঘুরতে হচ্ছে?

কাজ সেরে হোটেলে ফিরে রাতের দিকে ফোন করলাম পুরনো বান্ধবীকে। দিল্লির এক বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ায় সে।

"শোন, আজ একটা ট্যাক্সির পেছনে লেখা পড়ে মাথা ঘুরে গেছে আমার। লেখা ছিল এই ট্যাক্সি মেয়েদের শ্রদ্ধা করে - এটা পড়ে আশ্বস্ত হব না কি নারী-পুরুষের পারস্পরিক সম্পর্ক কোন তলানিতে গিয়ে ঠেকেছে সেটা ভেবে চিন্তিত হব বুঝতে পারছিনা।"

ছবির কপিরাইট Mark Kolbe/Getty Images
Image caption শুভ ভাবনা না অবিশ্বাস, কোনটার পাল্লা ভারি?

আমার বান্ধবী এমনিতেই ধীরে কথা বলে, আমার ঝড়ের বেগে করা প্রশ্নের সামনে ওর কথা বলার গতি যেন আরও শান্ত শোনাল।

"এক'শ বিশ কোটির এই দেশে ৫১ শতাংশ মহিলা। অর্থাৎ মেজরিটি। তা সেই সংখ্যা গরিষ্ঠরাই যদি পুরুষদের সব কিছুতে অবিশ্বাস করতে শুরু করে তাহলে আলোচনাটা আর নিছক ইনটেলেকচুয়াল ডিসকোর্স-এ সীমাবদ্ধ থাকে না।"

"তুই বলতে চাইছিস এর প্রভাব পেটেও পড়ে?"

"একদম। এই ট্যাক্সিচালক বা তাঁর সহকর্মীদের অবস্থাটা ভাব। মহিলা যাত্রীরা ভরসা করে এঁদের গাড়িতে না উঠলে ক্ষতির পরিমাণটা নেহাত ফেলনা নয় কিন্তু।"

"মন্দ বলিসনি। দিল্লির মতো মেট্রোপলিটন শহরে কর্মরত মেয়েদের সংখ্যাটা যেখানে চোখে পড়ার মতো সেখানে তারা সবসময় পুরুষ সঙ্গীকে ঢাল হিসেবে খাড়া করে রাস্তাঘাটে ঘোরাফেরা করবে এরকম ভাবারও কারণ নেই যেখানে...।"

"ঠিক তাই। কিন্তু এই একা মেয়েরা, রাতবিরেতে কাজ করে বাড়ি ফেরা মেয়েরা রোজ যা দেখছে, শুনছে তাতে একা ট্যাক্সিতে ওঠার থেকে একা বাঘ শিকারে যাওয়া এদের কাছে সহজ বোধহয়।"

আমার বান্ধবীর শুকনো অথচ হুল ফোটানো সেন্স অফ হিউমার-এ না হেসে পারলাম না।

ও বিরক্ত হয়। "হাসি পাচ্ছে তোর?"

"তা কেন? পাকস্থলী কেন্দ্রিক সমস্যাটা বুঝে ওই ট্যাক্সি চালকদের জন্যে খারাপই লাগছে।"

"অন্য দিকটাও খেয়াল কর।"

"এই বিশ্বাসহীনতার সমস্যার দিকটা বলতে চাইছিস তো?"

"হুঁ" বলে থেমে যায় আমার বড় হয়ে ওঠার সঙ্গী। কয়েক সেকেন্ড চুপ করে থেকে বলে, "আজ যে ট্যাক্সিটা তুই দেখলি - তার চালক মানুষটা হয়তো সত্যিই অন্যরকম..."

ছবির কপিরাইট PRAKASH SINGH/Getty Images
Image caption দিল্লিতে ট্যাক্সির সাড়ি: চালকদের মধ্যে কতজন 'অন্যরকম'?

ওকে থামিয়ে দিয়ে বলি, "হয়তো তিনি হঠাৎ বড় হয়ে যাওয়া এক কন্যা সন্তানের বাবা। বা তাঁর স্ত্রী কাজের সূত্রে রাস্তায় বেরিয়ে এমন অভিজ্ঞতার শিকার যে তাঁর মনে হয়েছে এই বার্তাটা দেওয়া প্রয়োজন,তাই ট্যাক্সির পেছনে ওই লেখা....।"

"জানিস", আমি বলি, "বিশ্বাস করতে খুব ইচ্ছে করে এমনটাই সত্যি।"

"ওই ইচ্ছেটুকু যতদিন জ্যান্ত আছে ততদিনই মঙ্গল।" তেতো হাসি হাসে যেন আমাকে একেবারে ঠিক ঠিক পড়তে পারা, ফোনের ওপর প্রান্তের নারী!"

"যা বলেছিস,ভাবছি এর পরের বার রাস্তায় ওই ট্যাক্সিটা দেখলে গাড়ি থেকে নেমে ওটায় চেপে বসব।"

"বসিস। অল দ্য বেস্ট। শুভ ইচ্ছা, শুভ ভাবনা একতরফা হওয়া কাজের কথা নয় বোধ হয়।"

বললাম তো বটে। শুভ ইচ্ছা না অবিশ্বাস, কার পাল্লা বেশি সেটা ঠাওর করতে পারলাম কি? পেছনে ভাল কথা লেখা, স্টিকার সাঁটা ট্যাক্সি দেখলেই রাত বিরাতে উঠে বসতে সত্যিই পারব তো?

ফোন রেখে দিই আমি। অস্বস্তিকর এক অনুভূতি সে রাতে আমায় ঘুমোতে দেয়না।

সম্পর্কিত বিষয়