Twitter Embeds Test 1

  • ১৫ জুন ২০১৭

তুমি যা ভাবছ তা না ম্যাডাম। আসলে রান্না শেখার দরকার পড়েনি কখনও। বাড়িতে থাকতে মা বা অন্য কেউ আর কাজের সূত্রে বাইরে থাকলে এই রকম কোনও হোটেল বা হোম ডেলিভারি। এতেই দিব্বি কেটে গেছে জীবন। প্রয়োজন পড়েনি তাই শিখিনি। সিম্পল। এর পেছনে অন্য কোনও কারণ খুঁজতে যেও না প্লিজ।

হুম। যুক্তিটা একেবারে ফেলনা নয় তাও কোথাও একটা খচখচ করছিল।

তুমি ড্রাইভ করো? প্রায় ঠাণ্ডা হয়ে যাওয়া উপমা সাবধানে এক চামচ মুখে তুলে বিস্বাদের অনুভূতিতে আরও বিরক্ত হয়ে জানতে চাই আমি।

এ বার উচ্ছ্বসিত আমার বন্ধু।

Image caption BBC

করি মানে! ড্রাইভিং আমার প্যাশন বলতে পারো। মুম্বাইয়ে থাকতে শুরু করার পরে সে প্যাশন যদিও মাথায় উঠেছে। তাও মাঝেমাঝে বাড়ির সবাইকে নিয়ে বা একটু রাতের দিকে একাই লং ড্রাইভে বেড়িয়ে পড়ি। বর্ষা নামলে মুম্বাই চলে এসো। তোমায় ড্রাইভ করে পুনে

নিয়ে যাব। দেখবে ইয়োরোপ-এর লং ড্রাইভ-এর উচ্ছ্বাস নিমেষে উধাও হয়ে যাবে।

বলেই যাচ্ছে, বলেই যাচ্ছে, ড্রাইভিং-এর গল্প আর থামছেই না তার!

ঠক করে কফি-র কাপটা টেবিলে নামিয়ে সশব্দে হাসি আমি।

পথে এসো বাবা!

মানে? উচ্ছ্বাস কথনে বাধা পড়ায় খেই হারিয়ে প্রশ্ন করে আমার বন্ধু।

কুকিং শেখনি, ড্রাইভিং শিখছ, অথচ এই দুটো ক্ষেত্রে তোমার দেওয়া তথাকথিত প্রয়োজনের যুক্তি এক রাস্তায় হাঁটে না কেন? কাটা কাটা উচ্চারণে জিজ্ঞেস করি আমি।

বুঝতে পারছি কোন দিকে যাচ্ছ তুমি।

ঠিক দিকেই যাচ্ছি স্যার। রান্না শেখার প্রয়োজন পড়েনি মেনে নিলাম। সেই একই যুক্তিতে গাড়ি চালানোও না শেখা উচিত ছিল তোমার। কিন্তু সেটা শিখেছ কারণ প্রথম কাজটা মেয়েলি, দ্বিতীয়টা নয়। অর্থাৎ এই কাজগুলোর সঙ্গে জড়িয়ে থাকা স্টেরিওটাইপ ধারণা থেকে বেরিয়ে আসতে পারনি তুমি।

আজকাল কিন্তু ছেলেরা প্রচুর রান্না করে, মেয়েরাও ড্রাইভ করে এন্তার।

ছেলেরা তখনই রান্না করে যখন তার সঙ্গে স্বীকৃতি এবং অর্থ জড়িয়ে থাকে। ভেবে দেখো, বড় হোটেল-এর শেফ হিসেবে বা টেলিভিশন-এর কুকারি শো-তে ছেলেরা যতটা স্বচ্ছন্দ, রোজের হেঁশেল ঠেলায় ততটা কি?

আমার বন্ধুর ভুরু কুঁচকে জ্যামিতিক চেহারা নিয়ে ফেলেছে। গভীর ভাবে কিছু একটা ভাবতে ভাবতে এক টুকরো তরমুজ মুখে পুরে আমার দিকে প্রশ্ন ছোঁড়ে-

তুমি ড্রাইভ করতে পারো? মেয়েদের ড্রাইভিং-এর প্রসঙ্গটা এড়িয়ে গেলে বলে প্রশ্নটা মাথায় এল।

না পারি না। শেখার প্রয়োজন পড়েনি কখনো। এক নিঃশ্বাসে কথাগুলো বলেই থমকে যাই।

উল্টো দিকে বসে থাকা পুরুষটির ঠোঁটের কোণে চিলতে হাসি আমার অস্বস্তি বাড়ায়।

আমি যদি বাজে যুক্তি দিয়ে থাকি তাহলে সেই একই দোষে তুমি ও দুষ্ট। আয়েশ করে তরমুজের আরও একটা টুকরো মুখে পুরে বলে ও।

Image caption BBC

আমি চুপ।

ভেবে দেখো, তুমি বা আমি সমাজের যে স্তরে বাস করি তাতে রান্না বা ড্রাইভিং কোনওটা শেখাই বাধ্যতামূলক নয়। কিন্তু তাও তুমি রান্না শিখেছ, ড্রাইভিং না। আর আমি ড্রাইভিং শিখেছি, রান্না না। এ ক্ষেত্রে আমাদের দুজনেরই অবচেতনে একটা ইচ্ছে-অনিচ্ছে কাজ করেছে যেটা আমাদের নারী-পুরুষ পরিচয় ও সেই সংক্রান্ত ধ্যান ধারণার পরিপূরক বোধহয়।

সত্যি তো। ড্রাইভিং না শিখলে খুব একটা এসে যায় এমন কখনও মনে হয়নি অথচ রান্না শিখেছি নিজের তাগিদে। সেই তাগিদ কি আমার ভেতরে মেয়ে হিসেবে যে ইমেজটা ঘাপটি মেরে বসে আছে তাকে তুষ্ট করতেই

স্টেরিওটাইপ-এর লালন পালনে আমার পুরুষ বন্ধুর থেকে আমিই বা কম যাই কিসে!

আমার সামনে রাখা কফির কাপ জুড়িয়ে যায়। জুড়িয়ে জল হয়ে যায়।