আপনার ডিভাইস মিডিয়া প্লেব্যাক সমর্থন করে না

মাঠে ময়দানে : টি-টোয়েন্টির বাড়াবাড়ি?

টোয়েন্টি টোয়েন্টি ক্রিকেটের বাড়াবাড়ি?

প্রায় আড়াই সপ্তাহ ধরে ধুন্ধুমার ক্রিকেট উৎসবের শেষে কলম্বোর প্রেমাদাসা স্টেডিয়ামে রবিবার আইসিসির টিটোয়েন্টি বিশ্বকাপের ফাইনাল – যা নির্ধারণ করে দেবে খেলাটার সবচেয়ে সংক্ষিপ্ত ও সবচেয়ে বাণিজ্যসফল ফর্ম্যাটের পরবর্তী বিশ্বচ্যাম্পিয়ন।

অদ্ভুত শোনাতে পারে, কিন্তু ঘটনা হল গত পাঁচ বছরের মধ্যে এটা টি-টোয়েন্টির চার নম্বর বিশ্বকাপ ফাইনাল – কোনও খেলার কোনও ফর্ম্যাটে এত ঘন ঘন বিশ্বকাপের কথা কস্মিনকালেও কেউ শোনেনি।

ছবির কপিরাইট BBC World Service
Image caption টোয়েন্টি টোয়েন্টি বিশ্বকাপে সব দলের ক্যাপ্টেনরা

টোয়েন্টি টোয়েন্টি সংস্করণ ক্রিকেটকে একরকম নবজন্ম দিয়েছে, ফাঁকা মাঠ আবার দর্শকে ভরিয়েছে – সে কথা যেমন ঠিক, তেমনি এরকম মুহুর্মুহু বিশ্বকাপ, আর আইপিএলের মতো বার্ষিক উৎসবকে ঘিরে আসলে টিটোয়েন্টির ওভারডোজ চলছে, এই আশঙ্কাটাও কিন্তু অনেকেই প্রকাশ করছেন।

তাহলে কি আইসিসি নিজেরাই তাদের এই সোনার ডিমপাড়া হাঁসের টুঁটি চেপে ধরার উপক্রম করছে?

প্রায় সবগুলো টিটোয়েন্টি বিশ্বকাপই কভার করেছেন ক্রিকেট সাংবাদিক গৌতম ভট্টাচার্য, কলম্বো থেকে তিনি জানিয়েছেন এ প্রসঙ্গে তাঁর অভিমত।

মোরাতুয়ার ক্রিকেট ব্যাট প্রস্তুতকারীদের কাহিনী

কলম্বোর প্রেমাদাসাতে যখন চলছে বিশ্বকাপ ফাইনালের প্রস্তুতি, তখন রাজধানী থেকে একটু দূরে মোরাতুয়ার শহরতলি এলাকায় একদল কারুশিল্পী প্রতিদিনের মতো বানিয়ে যাচ্ছেন ক্রিকেট ব্যাট।

সফট বলে খেলার এই ক্রিকেট ব্যাটগুলো বেশ জনপ্রিয়, আর এই ব্যাট তৈরি করাটা মোরাতুয়াতে অনেকেরই নেশা ও পেশা। কিন্তু মুশকিল হল, তাদের ঘরের দোরগোড়ায় যখন চলছে বিশ্বকাপের আসর – এই ব্যাট প্রস্তুতকারকরা কিন্তু তার ধারেকাছেও ঘেঁষতে পারছেন না!

কলম্বো থেকে সমুদ্রের ধার ঘেঁষে মাত্র এক ঘন্টার ড্রাইভ মোরাতুয়া – আর এই এলাকাটা বিখ্যাত তাদের স্থানীয় এই বাইলা মিউজিক, কারুশিল্প আর ক্রিকেটপ্রেমের জন্য।

ছবির কপিরাইট Getty
Image caption মোরাতুয়ার সবচেয়ে বিখ্যাত ক্রিকেটার দলীপ মেন্ডিস

শ্রীলঙ্কায় ক্রিকেট খেলে বড় হওয়ার স্বপ্ন দেখে যে কিশোর বা তরুণরা, তাদের সবারই প্রায় হাতেখড়ি হয় মোরাতুয়ায় তৈরি এই সফট বলে খেলার ব্যাট দিয়ে। জাতীয় দলের সাবেক ও বর্তমান ক্রিকেটাররা কেউই প্রায় এর ব্যতিক্রম নন।

তবে এই ব্যাটগুলো বানান যারা, বিশ্বকাপের উন্মাদনা থেকে তারা এখন অনেক দূরে – কারণ তাদের প্রায় কারওরই কোনও ম্যাচের টিকিট কেনারই ক্ষমতা নেই।

শ্রীলঙ্কা ক্রিকেট দলের সাবেক অধিনায়ক দালিপ মেন্ডিস নিজে মোরাতুয়ারই লোক, তিনিও বলছিলেন অতি সামান্য আয় সত্ত্বেও এই কারুশিল্পীরা ব্যাট তৈরির রেওয়াজটা বজায় রেখেছেন স্রেফ খেলাটার প্রতি তাদের ভালবাসা থেকেই।

স্থানীয় মেয়র সামানলাল ফার্নান্ডোও স্বীকার করছেন, মোরাতুয়ার ক্রিকেট ব্যাট প্রস্তুতকারকরা খুব সঙ্কটে আছেন – যদিও তার দাবি অবস্থা পাল্টাতে নানা ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে :

তিনি জানাচ্ছেন, এখন থেকে শ্রীলঙ্কার যেখানেই আন্তর্জাতিক ম্যাচ হবে, সেখানে মোরাতুয়ার ব্যাটের একটা প্রদর্শনী বা দোকান থাকবে বলে তাঁরা স্থির করেছেন।

শ্রীলঙ্কার বর্তমান ক্রিকেট দলে অন্তত চারজন সদস্য আছেন, যারা মোরাতুয়ার। এখানকার শিল্পীদের বানানো আসবাব কদর পেয়েছে বাকিংহাম প্রাসাদেও, কিন্তু তাদের ক্রিকেট ব্যাট বানানোর পরম্পরাটা আদৌ বজায় থাকবে কি না – এখন প্রশ্ন সেটাই!

এ যুগের ফুটবলাররা ভাড়াটে সৈন্য?

এভার্টন ক্লাব আর ওয়েলস জাতীয় দলের সাবেক গোলকিপার নেভিল সাউথহল আধুনিক ফুটবলারদের তুলনা করেছেন ভাড়াটে সৈন্যদের সঙ্গে। আশির দশকে বিশ্বের সেরা গোলকিপারদের মধ্যে অগ্রগণ্য ছিলেন সাউথহল, এভার্টনের হয়ে দুটো লিগ খেতাব, দুটো এফ এ কাপ আর ইউরোপীয়ান কাপ উইনার্স কাপ, সবই জিতেছেন তিনি।

সদ্য প্রকাশিত হয়েছে তার আত্মজীবনী দ্য বিন ম্যানস ক্রনিকলস, আর সেখানে তিনি আলোচনা করেছেন ফুটবলের বিবর্তন নিয়ে।

বিবিসি-কে সাউথহল বলছিলেন, এই যুগে ফুটবল যেন শুধু পয়সা কামানোর একটা রাস্তা হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাঁর কথায়, 'আমাদের সময় খেলার পর কিছু পয়সা পেলে শুক্রবার ফিশ অ্যান্ড চিপস জুটত, নইলে কিছুই পেতাম না। আর এখন ষোলো বছর বয়স হওয়ার আগেই একজন ফুটবলার এত পয়সা পাচ্ছে, যা তার বাবা সারা জীবনেও কামায়নি।'

ছবির কপিরাইট Getty
Image caption ওয়েলসের হয়ে সবচেয়ে বেশি আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলেছেন নেভিল সাউথহল

সাউথহল বলছেন, 'এর তো একটা প্রভাব পড়বেই। এত অর্থ আসছে বলেই সম্পূর্ণ অন্য জায়গা থেকে হাঙরের মতো এসে ফুটবলাররা টাকা কামিয়ে নিয়ে সরে পড়ছে – দেশের প্রতি, বা ক্লাবের প্রতি বিন্দুমাত্র দরদ নেই তাদের। আর তাই মানুষও আজকাল ফুটবলারদের ভাড়াটে সেনা বলে মনে করছে।'

পেশাদার ফুটবলার হওয়ার আগে সাউথহল নিজে মিস্ত্রি, সাফাইকর্মী বা এমন কী আবর্জনার বিন পরিষ্কার করার কাজও করেছেন। জীবনের নানা দিক দেখার অভিজ্ঞতা আছে তাঁর, আর সেই ভিত্তিতেই তিনি বলছেন অতিরিক্ত অর্থ ফুটবলের কী ক্ষতি করতে পারে!

তাঁর বক্তব্য, 'পয়সার টোপ ফেরানো সহজ নয়। কিন্তু মুশকিল হল, এতে একটা সময় আপনি মানুষের থেকে ক্রমশ দূরে সরে যেতে থাকেন। আর মানুষই যদি না-থাকে, ফুটবলের ভক্তরাই যদি না-থাকে একদিন ফুটবলার উপলব্ধি করবে সব কিছুই ফাঁকা – ফুটবল অনুরাগীদের বাদ দিলে সে তো কেউই নয়!'

নেভিল সাউথহলের এই বক্তব্যের সঙ্গে আপনি একমত হতেও পারেন, নাও পারেন। কিন্তু ফুটবল নিয়ে যদি ভাবেন, তাহলে ভাবনার খোরাক যে এতে আছে তা নিয়ে কোনও সন্দেহ নেই।

এ সপ্তাহের মাঠে-ময়দানে পরিবেশন করেছেন শুভজ্যোতি ঘোষ