আপনার ডিভাইস মিডিয়া প্লেব্যাক সমর্থন করে না

ইতিহাসের সাক্ষী

Image caption মোরদেকাই ভানুনু

১৯৮৬ সালের কথা। ইসরাইলের একজন পারমাণবিক প্রকৌশলী মোরডেকাই ভানুনু তার দেশেরই গোপন পারমাণবিক কর্মসুচির কথা ফাঁস করে দিয়েছিলেন।

তা প্রকাশিত হয়েছিল ব্রিটিশ সংবাদপত্র সানডে টাইমসে। যে সাংবাদিক ওই খবর প্রকাশের কাজে সহায়তা করেছিলেন, তার নাম পিটার হাউন্যাম।

ভানুনু সেই রিপোর্টারকে বলেছিলেন, ইসরাইল গোপনে ১০০ থেকে ২০০টি পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করেছে। শুধু তাই নয়, তারা এখন পৃথিবীর ৬ষ্ঠ বৃহত্তম পারমাণবিক অস্ত্রধারী শক্তি, এবং তারা যে এই সক্ষমতা অর্জন করতে পেরেছে তা কেউ ঘুণাক্ষরেও জানতে পারে নি।

ভানুনুর পুরো নাম মোরডেকাই ভানুনু। তিনি একজন মরক্কান ইহুদি। ইসরাইলের গোপন পারমাণবিক কর্মসূচিতে একজন টেকনিশিয়ান হিসেবে কাজ করতেন।

১৯৮৬-র আগস্ট মাসে অস্ট্রেলিয়ার সিডনিতে এক হোটেলে পিটার হাউন্যামের পরিচয় হয় ভানুনুর সাথে। প্রথম দিকে কেউ কাউকে বিশ্বাস করতে পারেন নি।

পিটার হাউন্যাম বলছিলেন, "আমি যখন ভানুনুকে প্রথম দেখলাম – ছোটখাটো লোকটি, মাথায় হালকা টাক পড়েছে, চেহারায় তেমন কোন আত্মবিশ্বাসী ভাব নেই, খুবই সাধারণ পোশাক পরা। তাকে দেখলে ঠিক পরমাণু বিজ্ঞানী বলে মনে হবে না। তার সাথে আমি হাত মেলালাম। কিন্তু আমাকে অনেকটা সময় ব্যয় করতে হলো তাকে আশ্বস্ত করতে এবং এটা বোঝাতে যে আমি কোন মতলব নিয়ে আসি নি। প্রথম সেই সাক্ষাতের পুরো সময়টা জুড়েই তিনি একটা অস্বস্তির মধ্যে ছিলেন বলে মনে হয়েছিল। কিন্তু, ডিমোনায় ইসরাইলি পরমাণু গবেষণা কেন্দ্রে তিনি যা দেখেছেন – তা পৃথিবীকে জানানোর যে সিদ্ধান্ত তিনি নিয়েছিলেন – সে ব্যাপারে তিনি ছিলেন অবিচল।"

ডিমোনার পরমাণু কেন্দ্রটি অবস্থিত ইসরাইলের নেগেভ মরুভূমিতে। জেরুসালেমের দক্ষিণে ২০০ কিলোমিটারেরও কম দূরে।

ইসরাইল সব সময়ই বলে আসছিল যে সেখানে পারমাণবিক বিদ্যুত উৎপাদন ছাড়া অন্য কোনকিছুই করা হচ্ছে না। আন্তর্জাতিক পরিদর্শকরা সেখানে কি হচ্ছে তা দেখতে যেতে চাইলে তাতে বাধা দেয়া হয়েছে। মোরডেকাই ভানুনু সেখানে কাজ করেছেন ৯ বছরেরও বেশি সময় ধরে।

"সেখানে তার কাজ ছিল একটি বিশাল রাসায়নিক প্ল্যান্ট চালানো। সেখানে পারমাণবিক চুল্লি থেকে তেজষ্ক্রিয়তা-হারানো জ্বালানির দন্ডগুলো বের করে নিয়ে, তাকে রাসায়নিক উপায়ে ভাঙা হতো। তার ভেতর থেকে বিশুদ্ধ প্লুটোনিয়ামের অংশটুকু আলাদা করা হতো – যাতে তা পারমাণবিক অস্ত্রে ব্যবহার করা যা্য়। এগুলো ভাগ ভাগ করে পরমাণু অস্ত্রে বসানোর জন্য নিয়ে যাওয়া হতো কারখানার ভূগর্ভস্ত একটা অংশে।"

হাউনাম বলছিলেন, তারা কাছে ভানুনু বর্ণনা করেছেন যে কিভাবে এই অস্ত্র তৈরি দেখে, এবং ফিলিস্তিনিদের প্রতি ইসরাইলী আচরণ দেখে তিনি দেশটির ও্রপর বীতশ্রদ্ধ হয়ে পড়েছিলেন। ১৯৮৫ সালে তাকে ডিমোনা কেন্দ্র থেকে বরখাস্ত করা হয়। কিন্তু তার আগেই তিনি সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছেন বিশ্বের কাছে ইসরাইলি পরমাণু কর্মসূচির খবর ফাঁস করে দেবার।

"তিনি আমার কাছে বর্ণনা করেছেন কিভাবে সেই কেন্দ্রের ভেতরে তিনি একটা ক্যামেরা নিয়ে গেলেন – তার চমকপ্রদ গল্প। ক্যামেরাটা যখন তিনি প্রথম কারখানার ভেতরে নিয়ে যান, তখন তাতে কোন ফিল্ম ছিল না। এর পরের বার তিনি তার মোজার ভেতরে ভরে ফিল্ম নিয়ে গেলেন। তার পর গোপনে তুলতে শুরু করলেন ছবি, কখনো গভীর রাতে, কখনো বা খুব ভোরে।"

ভানুনুর দেয়া তথ্যগুলো পিটার হাউন্যাম যাচাই করতেন সিডনি পাবলিক লাইব্রেরিতে গিয়ে। সেখানে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির প্রক্রিয়া সম্পর্কে তথ্য জানার চেষ্টা করতেন। সেখানে যতটুকুই জানতে পারলেন, তাতে নিশ্চিতভাবেই তিনি উপলব্ধি করলেন যে মি. ভানুনু যা বলছেন – তা সঠিক।

মি. ভানুনু প্রকৃতই বিশ্বাস করতেন যে, এ ব্যাপারটা ফাঁস করে দিলে ইসরাইলের ওপর এ কর্মসুচি বন্ধ করে দেবার জন্য আন্তজাতিক চাপ সৃষ্টি করা সম্ভব হবে।

লন্ডন থেকে সানডে টাইমসের সম্পাদকরা পিটার হাউন্যাম-কে বললেন, এই রিপোর্ট-এর সত্যসত্য যাচাই করার জন্য তিনি যেন ভানুনুকে লন্ডনে নিয়ে আসেন। কিন্তু এর ঝুঁকি ছিল প্রচন্ড । কারণ ভানুনু তখন নিশ্চিত হয়ে গেছেন যে ইসরাইলের গুপ্তচর সংস্থা মোসাদ তার পেছনে লেগেছে।

"আমরা হিলটন হোটেলের ক্যাফেতে বসে ছিলাম। আমরা শুনলাম কাছেই আরেকটা টেবিলে দুজন লোক হিব্রুতে কথা বলছে। সাথে সাথে ভানুনুর মুখটা শুকিয়ে গেল। তিনি খুবই দুশ্চিন্তাগ্রস্ত হয়ে পড়লেন। আমি তাকে বললাম এটা একটা আন্তর্জাতিক হোটেল, তাই এখানে ইসরাইলি ব্যবসায়ীদের দেখতে পাওয়াটা খুবই স্বাভাবিক। কিন্তু তিনি বললেন, দেখুন - মোসাদকে ছোট করে দেখবেন না।

তবে মি ভানুনু তার উদ্বেগ সত্বেও যুক্তরাজ্যে যেতে রাজি হলেন। সানডে টাইমস তাকে লন্ডনের বাইরে গ্রামীণ এলাকায় একটি হোটেলে রাখলো, যাতে কেউ টের না পায়। তাদের লক্ষ্য ছিল, রিপোর্টটি বের না হওয়া পর্যন্ত তাকে বিপদমুক্ত রাখা, এবং প্রকাশের পর তাকে টিভি ক্যামেরার সামনে হাজির করা। কিন্তু ভানুনু ক্রমশই অস্থির হয়ে উঠছিলেন।

"আমরা হোটেলটি থেকে খবর পাচ্ছিলাম যে তার ভালো লাগছে না, তিনি হাঁপিয়ে উঠছেন । ফলে তাকে লন্ডনের কেন্দ্রস্থলে কোভেন্ট গার্ডেনে অন্য একটা হোটেলে থাকতে দেয়া হলো। আগের হোটেলে থাকার সময় তার ওপর যে নিয়ন্ত্রণ ছিল – তা এখানে অনেকটা শিথিল করা হলো। তিনি বাইরেও বেরুতে শুরু করলেন। একদিন তিনি আমাদের অফিসে এলেন। গাড়ির বুটের ভেতরে করে তাকে আনা হলো। আমরা জানতে পারলাম, ঠিক তার আগের শনি-রোববার – তার সাথে একজন মহিলার আলাপ হয়েছে। বেশ কয়েকবার তাদের দেখা হয়েছে, এবং তারা একসাথে সিনেমাও দেখতে গেছেন। আমি জিজ্ঞেস করলাম, আপনি নিশ্চিত জানেন তো যে এই মহিলাটি অন্যরকম কেউ নয়? তিনি বললেন, না না সে একজন আমেরিকান টুরিস্ট। বেড়াতে এসেছে, আমার সাথে আলাপ হয়েছে। আমি বললাম, কিন্তু আপনাকে তো সাবধানে থাকতে হবে, এভাবে তো কারো সাথে দেখা করা আপনার উচিত নয়। তিনি বললেন, না না এটা তেমন কিছু নয়, এতে কোন সমস্যা হবে না।"

পিটার ভাবলেন, এই মহিলাটি কে - তা তার একবার জেনে নেয়া উচিত। পিটার প্রস্তাব দিলেন, সেদিনই সন্ধ্যেবেলা তারা তিনজন এক সাথে সন্ধ্যেবেলা রেস্টুরেন্টে খাওয়াদাওয়া করবেন। ভানুনু প্রথমে রাজি হলেও পরে তার মত পাল্টালেন।

উদ্বিগ্ন পিটার দুয়েকদিন পর তাকে আবার হোটেলে ফোন করলেন।

"সকাল এগারোটার দিকে আমি তাকে পেলাম। তার কুশল জিজ্ঞেস করলাম। তিনি বললেন, আমি কয়েকদিনের জন্য উত্তর ইংল্যান্ডে বেড়াতে যাচ্ছি, কোন অসুবিধে হবে না। আমি তাকে বললাম, দেখুন, আপনি যাই করুন না কেন, প্রতিদিনি আমাকে অন্তত দুবার ফোন করবেন। যাতে আমি জানতে পারি যে আপনি নিরাপদে আছেন। সেটাই তার সাথে আমার শেষ কথা।"

ভানুনু নিখোঁজ হয়ে গেলেন। কিন্তু সানডে টাইমস তার রিপোর্ট ঠিকই প্রকাশ করলো। যদিও তাদের রিপোর্টের আসল চরিত্রকে সবার সামনে হাজির করতে না পারায়, এর অভিঘাত যতখানি হবার তা হলো না। ইসরাইল এ নিয়ে কোন মন্তব্য করতে অস্বীকার করলো।

পিটার হাউন্যাম জানতে পারলেন যে ভানুনু সেই সপ্তাহের শুরুতেই লন্ডনের সেই হোটেল ছেড়ে চলে গেছেন। তার পর তার আর কোন খবর জানা যায় নি। এক মাস পর ইসরাইল সরকার গ্রেফতারের কথা ঘোষণা করলো। জানালো, মি. ভানুনুকে ব্রিটেনের মাটিতে অপহরণ করা হয়েছে বলে যে গুজব ছড়িয়েছে, তা একেবারেই ভিত্তিহীন।

পিটার বলছিলেন, "ইসরাইলের ওই সরকারি ঘোষণার কথা যখন জানলাম, তখন আমি অফিসে। তাতে বলা হলো, পারমাণবিক ক্ষেত্রে দেশদ্রোহিতার অপরাধে ভানুনুর বিচার করা হবে। এর জন্য তার মৃত্যুদন্ডও হতে পারতো। আমার মনটা খুবই খারাপ হয়ে গেলো। আমরা তখন জানতামই না যে তার ভাগ্যে কি ঘটেছে, এবং কি ভাবে তাকে ধরা হয়েছিল। এটা ছিল পুরোপুরি রহস্যাবৃত।"

পরে জানা গিয়েছিল – যে মহিলাটির সাথে লন্ডনে ভানুনুর বন্ধুত্ব হয়েছিল , তিনি ছিলেন আসলে মোসাদের এজেন্ট। তিনিই তাকে ইটালিতে বেড়াতে যেতে রাজি করিয়েছিলেন। সেখানে তাকে ওষুধ দিয়ে সংজ্ঞাহীন করে গোপনে ইসরাইলে নিয়ে আসা হয়। ১৯৮৮ সালেল মার্চে ভানুনুকে ১৮ বছরের কারাদন্ডে দন্ডিত করা হয়।

তাকে মুক্তি দেয়া হয় ২০০৪ সালে, এই শর্তে যে তিনি কখনো সাংবাদিকদের সাথে কথা বলবেন না, বা দেশের বাইরে যেতে পারবেন না। কিন্তু এসব দিয়ে তাকে দমানো যায়নি। তিনি তার কাজের জন্য অনুতপ্তও্র হন নি।

ভানুনু বলেন, "যারা আমাকে বিশ্বাসঘাতক বলেছেন, তাদের উদ্দেশ্যে আমি বলছি, আমি যা করেছি তার জন্য আমি গর্বিত এবং আনন্দিত। আমি যা করেছি তা করতে পেরে আমি খুবই সন্তুষ্ট। ওই রিপোর্ট প্রকাশের পরই ঘটনা শেষ। আমার কাছে আর কোন গোপন তথ্য নেই।"

তবে পিটার বলছিলেন, ভানুনুর মধ্যে একটা কিছু আছে - যাকে ঠিক বাগ মানানো যায় না। সে জন্য এখনো তিনি ইসরাইলে বড় বড় খবরের জন্ম দিয়ে চলেছেন।

মোরদেহাই ভানুনুকে এর পরও অনেকবার গ্রেফতার করা হয়েছে। কারামুক্তির শর্ত লঙ্ঘন করার দায়ে ২০১০ সালে তাকে আরো এক দফা জেলে পাঠানো হয় - তিন মাসের জন্য। এখন তিনি বাস করেন পূর্ব জেরুসালেমে।

ইসরাইল কখনো আনুষ্ঠানিকভাবে তাদের পরমাণু কর্মসূচির অস্তিত্ব স্বীকার করে নি।