বাংলাদেশে যুদ্ধাপরাধের বিচারের কী মূল্যায়ন করছেন ভুক্তভোগীরা

এই প্রতিবেদন দেখতে পাবেন আজ বৃহস্পতিবার রাত ৯.৩৫ মিনিটে চ্যানেল আইতে বিবিসি বাংলার প্রবাহ অনুষ্ঠানে

Image caption বাংলাদেশে যুদ্ধাপরাধের বিচার নিয়ে সন্তুষ্ট ভুক্তভোগী পরিবার গুলো

যুদ্ধাপরাধের বিচারে দুটি আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের রায়ে এখন পর্যন্ত ছয় জনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়েছে বাংলাদেশে। মৃত্যুদণ্ডের রায় হওয়া আরো ২২ জনের মামলা উচ্চ আদালতে চুড়ান্ত নিষ্পত্তির অপেক্ষায় রয়েছে।

৭১-এ মানবতাবিরোধী অপরাধে সাজাপ্রাপ্তরা বাংলাদেশে শীর্ষস্থানীয় রাজাকার ও যুদ্ধাপরাধী হিসেবে পরিচিত ছিল। বিচারের এ পর্যায়ে ভুক্তভোগীরা সন্তোষ প্রকাশ করছেন। কিন্তু সব যুদ্ধাপরাধীর বিচারের শেষ না হওয়া পর্যন্ত এই কার্যক্রম চলমান রাখার জোরালো দাবি রয়েছে।

ফাঁসি কার্যকর হওয়া মুহাম্মদ কামারুজ্জামানের অন্যতম অপরাধ ১৯৭১ সালে জুলাই মাসে শেরপুর জেলার সোহাগপুরে ১৪৪ জন হত্যা ও নারী নির্যাতনের পরামর্শদাতা হিসেবে। শেরপুর জেলার ভারত সীমান্তবর্তী জায়গাটি পরিচিত বিধবা পল্লী নামে । ওইদিন যে ৬৪ জন নারী বিধবা হন তাদের মধ্যে এখনো ২৯ জন জীবিত আছেন।

এদের একজন সমলা বেওয়া হারিয়েছেন তার স্বামী এবং সন্তান। তিনি বলছিলেন, "কামারুজ্জামানের বিচার হইছে হেইডাতো আমরা হুনছি, এহন কাদির ডাকতর যে রইছে, আরো যে বদররা রইছে এডির বিচার হইলে আমগো আত্মাডাতো আগুনডা কিছুডা নিববো।"

বিধবা পল্লীর একটি গণকবরে ৬৯ জনের নামের তালিকা রয়েছে। এ জায়গায় জালাল উদ্দীন তার পরিবারের সাত জনকে মাটিচাপা দিয়েছিলেন। জালাল উদ্দীন বলেন, "আমাদের সোহাগপুরে বিধবারা, শহীদ পরিবারের সন্তানরা খুশী হইছেন। কিন্তু আরো যারা স্থানীয় রাজাকার, আলবদররা আছে তাদের বিচারডা সম্পন্ন হইলে সবাই শান্তি পাবে।"

বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে বিজয়ের ঠিক আগে প্রায় দুই হাজার শিক্ষাবিদ, সাংবাদিক, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বকে হত্যা করা হয়। পাকিস্তানিদের বাঙালী সহযোগী আলবদর বাহিনী এ হত্যায় যুক্ত ছিল।

অন্য আরো অভিযোগের সাথে বুদ্ধিজীবী হত্যায় নেতৃত্বের দায়ে শাস্তি হয়েছে আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ ও মতিউর রহমান নিজামীর।

Image caption মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়েছে জামায়াত নেতা মতিউর রহমান নিজামীর

৭১-এ ডিসেম্বর মাসে আলবদর সদস্যদের হাতে অপহৃত সাংবাদিক সিরাজ উদ্দিন হোসেনের পূত্র জাহিদ রেজা নূর বলেন, "একটা সময়তো মনে হয়েছিল যে যুদ্ধাপরাধীদের আর বিচারই হবে না। একাত্তরে যারা সবচাইতে বেশি অপরাধ করেছে, মানবতাবিরোধী অপরাধ করেছে, তাদের একে একে ফাঁসি হলো, এবং তাদেরও ফাঁসি হলো একসময় আমরা যাদেরকে মন্ত্রীও হতে দেখেছি এই বাংলাদেশে।"

মিস্টার নূর মনে করেন যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনালের কার্যক্রম চলমান থাকতে হবে। কেননা, "যাদের ব্যাপারে মানুষ এখনো একটা যন্ত্রণা বোধ করে, যারা ভীষণ রকম নৃশংস হয়েছে, তখনকার সাড়ে সাত কোটি মানুষের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছে এবং খুন করেছে, ধর্ষণ করেছে বাড়িঘর পুড়িয়ে দিয়েছে তাদেরকেও এ বিচারের আওতায় আনা উচিৎ বলে মনে করি। পরবর্তী প্রজন্ম যেন বলতে পারে যে ১৯৭১ সালে যারা অন্যায় করেছে, যারা অপরাধ করেছে তাদের কোনো ক্ষমা নেই" ।

বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর থেকেই ব্যক্তিগত উদ্যোগে যুদ্ধাপরাধের দালিলিক প্রমাণ সংগ্রহ, সংরক্ষণ এবং গবেষণা করছেন ডা. এম এ হাসান। ৭১-এ স্বজন হারানো এই মুক্তিযোদ্ধা ওয়ার ক্রাইমস ফ্যাক্টস ফাইন্ডিং কমিটির আহবায়ক।

১৯৯৯ থেকে ২০০৮ সাল পর্যন্ত ওই সংগঠন যুদ্ধাপরাধে অভিযুক্ত ১,৭৭৫ জনের তালিকা প্রস্তুত করেছে। এর মধ্যে প্রধান অপরাধী পাকিস্তানী সৈন্য ৩৬৯ জন, যার ১৪৫ জন শীর্ষ অপরাধী। এছাড়া বাঙালী সহযোগী রাজাকার-আলবদর, শান্তি কমিটির আছে ১,৩২৮ জন ও বিহারী হিসেবে পরিচিত দালাল ৭৮ জন।

Image caption আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদের ফাঁসি কার্যকর হয়েছে

মিস্টার হাসান বলেন, "অন গ্রাউন্ড যাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধাপরাধ, মানবতাবিরোধী অপরাধ, গণহত্যার প্রমাণ রয়েছে তাদের ইন অ্যাবসেনশিয়া হলেও বিচার হওয়া উচিৎ। আমি আমার ভাইকেসহ হাজার হাজার ভুক্তভোগীদের জানি যাদেরকে হত্যা করেছিল বিহারী মুজাহিদ, মিলিশিয়া এবং ইস্ট পাকিস্তান সিভিল আর্মস ফোর্সের সদস্যরা। সেই বিহারী অবাঙালি সদস্যদের কিন্তু একজনকেও আমরা বিচার করতে পারিনি।"

তিনি বলেন, এদের একটা বড় তালিকা আমরা দিয়েছিলাম যাদের বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ দাঁড় করানো হয়নি বা সেটি তদন্ত বা বিচারের উদ্যোগ নেয়া হয়নি।

পাকিস্তানি যুদ্ধাপরাধীদের বিচার বাংলাদেশের ট্রাইব্যুনাল থেকেই সম্ভব বলে উল্লেখ করেন এম এ হাসান।

Image caption মৃত্যুদণ্ড হয়েছে বিএনপি নেতা সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর

তিনি বলেন, "এদের বিচার না হলে আমরা এই সুযোগ করে দিচ্ছি পাকিস্তানিদের বলার জন্য যে একাত্তরে তারা কোনো অপরাধ করেনি। যেটা অপরাধ করেছে, যা কিছু হয়েছে বাঙালিদের দুটি পলিটিক্যাল গ্রুপের মধ্যে। আমরা কিন্তু সেই পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর সদস্যদের বিচার করছি না, তাদের যারা সহায়ক। যারা আমাদের বুদ্ধিজীবীদের সাথে মিলে মিশে গেছে, তাদেরকেও আমরা বিচার করছিনা।"

মিস্টার হাসান বলেন, আন্তর্জাতিক আইনে গণহত্যা এবং যুদ্ধাপরাধ ক্ষমার অযোগ্য। কাউকে কোনো রাষ্ট্র বা ব্যক্তি এ অপরাধ থেকে ছাড় দিতে পারেনা।

তিনি বলেন, "আমাদের আইনগুলো যথেষ্ট সমৃদ্ধ অ্যান্ড ভেরি মাচ কনসিসটেন্ট উইথ ইন্টারন্যাশনাল ক্রিমিনাল কোর্টের যে সমস্ত আইন রয়েছে। এরকম একটা বিচারের জন্য রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের প্রয়োজন এবং রাজনৈতিক সমর্থন প্রয়োজন।"

কিন্তু বিচারটি সকল প্রভাব থেকে মুক্ত রাখতে হবে এবং সেইসাথে আকাঙ্ক্ষাটি হতে হবে সম্পূর্ণ মানবিক এবং সভ্যতার যে মূল্যবোধ আছে তার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ - বলেন মিস্টার হাসান।