এখনো যেখানে টাইপ রাইটারের খটাখট শব্দ

Image caption আদালতের পাশে এক টিনশেডে কাজ করছেন টাইপিস্ট মোহাম্মদ আইয়ুব

ঢাকার আদালত পাড়ায় একসময় ঝড় উঠতো টাইপ রাইটারের খটাখট শব্দে। দলিল-পত্র থেকে যেকোন নথিপত্র লিখতে দৌড়ুতে হতো টাইপিস্টদের কাছে, অপেক্ষা করতে হতো দীর্ঘসময়।

প্রযুক্তির উন্নয়নের সাথে সাথে টাইপ রাইটারের প্রয়োজনীয়তা এখন অনেক কমে গেছে। তবু এখনো অনেকে ধরে রেখেছেন পুরনো সেই পেশা।

ঢাকার জেলা আদালতের পেছনদিকে একটি টিনশেডে আপনমনে কাজ করছিলেন সাইদুর রহমান। ১৯৭৬ সাল থেকে আদালতপাড়ায় টাইপিস্ট হিসেবে কাজ করছেন।

"পেশাদার হিসেবে যখন কাজে ঢুকি তখন কাজটা ভাল লেগেছে, রুজিও ভালো ছিল। আর্থিকভাবে আমার যা প্রয়োজন তার থেকে ভাল হতো"। বলেন মি. রহমান।

Image caption টাইপ রাইটারের জায়গা দখল করে নিয়েছে কম্পিউটার

টিনশেডের ভেতরের খটাখট শব্দের সাথে হয়তো এই যুগের শিশু-কিশোরদের অনেকেই পরিচিত নন।

ভেতরে কিছু কম্পিউটার নিয়ে কয়েকজন বসেছেন ঠিকই, কিন্তু কম্পিউটার কি-বোর্ডের মৃদু শব্দ ছাপিয়ে গোটা সাতেক টাইপ রাইটারের যে শব্দ শোনা যাচ্ছে তার সামনে যারা বসে আছেন তারা প্রায় সবাই পঞ্চাশোর্ধ।

পনের বছর আগেও এই পেশায় ত্রিশ জনের বেশি কাজ করতেন। এখন টাইপ রাইটারের টাইপিস্টের সংখ্যা হাতেগোনা কয়েকজন। সাঈদুর রহমান নিজের ছেলেকে কম্পিউটার কিনে দিয়েছেন, তবে নিজের মায়া এখনো টাইপ-রাইটার ঘিরে।

Image caption তিন দশক যাবত টাইপিস্ট হিসেবে কাজ করছেন সাইদুর রহমান

যন্ত্র পুরনো হলেও, টাইপ রাইটারের প্রয়োজনীয়তা এখনো ফুরিয়ে যায়নি। এখনো আদালতের কিছু নোটিস এবং নথিপত্র আছে, যা টাইপ রাইটার ছাড়া কম্পিউটারে করানো সম্ভব নয়।

"অনেক ফর্ম আছে যেগুলো কম্পিউটারে টাইপ করলে সেগুলো কোর্টে গ্রহণযোগ্য হয় না। এছাড়া কিছু নোটিস আছে, সিআরও ফর্ম আছে যেগুলো টাইপরাইটার ছাড়া আমাদের করা সম্ভব না"। জরুরী একটি নোটিস টাইপ করাতে এসে বললেন আইনজীবী আজমল হোসেন ।

মি. হোসেনের কাজ যিনি করছিলেন তিনি প্রায় ষাটোর্ব্ধ মোহাম্মদ আইয়ুব।

Image caption কাজ করাতে এসেছেন আইনজীবী আজমল হোসেন

"এখানে না আসলে আমার পেটের ভাত হজম হয় না। যদিও আগে অবস্থা খুব ভালো ছিল, সারাদিনে ৫০০ থেকে ৭০০ টাকা পাইতাম। এখন একদিন কাজ থাকলে তিনদিন থাকে না। ২৫০-৩০০ টাকা পাই তাতে সংসার চলে না"। বলেন মি. আইয়ুব।

যেসব যন্ত্রে এখানে কাজ হচ্ছে সেগুলো ৮০ বা ৯০ এর দশকে কেনা। নতুন টাইপ রাইটার এখন আর কিনতে পাওয়া যায় না। যেগুলো আছে সেগুলোই মেরামত করে চলছে কাজ।

টাইপ রাইটার মেরামত করতে পারেন এমন এখনো যে দুয়েকজন আছেন তার মধ্যে একজন ইস্রাফিল শেখ। তিনি বলছিলেন, এক সময় টাইপ রাইটার মেরামতের কাজ করতে গিয়ে সারাদেশ ঘুরে বেরিয়েছেন। কিন্তু এখন আর টাইপ রাইটার বিক্রির কোন প্রতিষ্ঠান নেই আর এই কাজ জানেন এমন জীবিত মানুষও খুব কম।

Image caption শেষ প্রজন্মের টাইপ রাইটার মেরামতকারী ইস্রাফিল শেখ

টাইপ রাইটারের দিন যে আর ফিরে আসবে না সেটি নিশ্চিত, তবে সাঈদুর রহমান মনে করেন, টাইপ রাইটার টিকে থাকবে আরো কিছুদিন।

"আমার পেশা তাই মায়া ছাড়তে পারি নাই। মেশিনের সাথে, জায়গার সাথে, মনের সাথে একটা স্থায়ী সম্পর্ক হয়ে গেছে। আল্লাহ যে কয়দিন বাঁচায়ে রাখে সেই কয়দিন এভাবেই থাকার আশা রাখি। বাকিটা আল্লাহর ইচ্ছা"। পুরনো টাইপরাইটারটি মুছতে মুছতে বলেন সাঈদুর রহমান।