ইতিহাসের সাক্ষী
আপনার ডিভাইস মিডিয়া প্লেব্যাক সমর্থন করে না

ব্যাঙ্ক ডাকাত ও নারী জিম্মির মধ্যে সখ্যতা

১৯৭৩ সালের অগাস্ট মাসের ঘটনা। সুইডেনে এক ব্যাঙ্ক ডাকাতির ঘটনায় ডাকাতরা পণবন্দী করেছিল ব্যাঙ্কের চারজন কর্মচারীকে।

বন্দিদশায় জিম্মিদের সঙ্গে ডাকাতদের একটা মানসিক বন্ধন গড়ে উঠেছিল যেটা পরে পরিচিত হয় স্টকহোম সিনড্রম বা স্টকহোম উপসর্গ নামে। যদিও এক বন্দিনী পরে তার এক বইয়ে এধরনের কোনো মানসিক অবস্থার কথা উড়িয়ে দিয়েছেন।

জিম্মি নাটকের শুরু ১৯৭৩ সালে ২৩শে অগাস্ট-এর সকালে।

সুইডেনে স্টকহোম শহরের একেবারে কেন্দ্রে স্ভেরিগাস ক্রেডিট ব্যাঙ্ক তখন সবে তাদের দরজা খুলেছে। একজন লোক দরজা ঠেলে ব্যাঙ্কে ঢুকল - হাতের সুটকেস থেকে একটা সাবমেশিনগান বের করে লোকটি ছাদের দেওয়াল তাক করে গুলি ছুঁড়ল।

ব্যাংকের কর্মচারী ক্রিস্টিন এনমার্ক তখন দিনের কাজ শুরু করেছেন। বলছিলেন তিনি দারুণ ভয় পেয়ে মাটিতে শুয়ে পড়েছিলেন।

"ঐ ব্যাঙ্ক ডাকাত আমার টেবিলের পেছন থেকে এসে আমাকে আর দুজন সহকর্মীকে বেছে নিয়ে আমাদের উঠে দাঁড়ানোর নির্দেশ দিল। আমার মাথাটা তখন কেমন যেন ফাঁকা হয়ে গেল- মনে হল আমি বাস্তব জগতের বাইরে কোথাও আছি-আমার চরম দুঃস্বপ্নেও আমি কোনোদিন কল্পনা করি নি এমন কিছু ঘটতে পারে।"

ক্রিস্টিন এনমার্কের বয়স তখন মাত্র ২৩।

আপাদমস্তক অস্ত্রসজ্জিত ঐ ডাকাত ইয়ান ওলসন একজন সশস্ত্র পুলিশ অফিসারকে গুলি চালিয়ে আহত করল। তারপর তিনজন বন্দীর হাতপা বেঁধে দাবিল তাকে বিশাল অঙ্কের অর্থ এবং একটা গাড়ি দিতে হবে, এছাড়াও আরেকজন দাগী আসামীকে জেল থেকে এনে তার কাছে হাজির করতে হবে।

ওই অন্য অপরাধী -ক্লার্ক উলোফসন ছিল সুইডেনের কুখ্যাত দাগী আসামী এবং বলা হত সে চরম বিপদজনক এক ব্যক্তি।

পরিস্থিতি সামাল দিতে পুলিশ তাকে নিয়ে এল ঘটনাস্থলে। এসেই ওই ডাকাতি পরিচালনার দায়িত্ব নিল ক্লার্ক ।

প্রথমেই ইয়ানের নির্দেশে তিনজন মহিলার বাঁধন খুলে দেওয়া হল। এরপর গুদামঘরে লুকিয়ে থাকা একজন তরুণকে ধরে এনে ওই তিন মহিলার সঙ্গে রাখা হল।

পুলিশ এবং ক্লার্কের মধ্যে একটা সমঝোতা হল যে ক্লার্কই গোটা ব্যাপারটা নিয়ে আলোচনা তদ্বির চালাবে।

সব কিছুই তার হাতে। কাজেই ক্রিস্টিন বলছেন তার উপর ভরসা করে বাঁচার পথ খুঁজতে শুরু করলেন তারা।

"কিছু চাইতে হলে যে ক্লার্কের কাছেই যেতে হবে এটা পরিস্কার হয়ে গেল। ওই অবস্থায় মানুষ হাতের কাছে খড়কুটো যা পায় তাই ধরেই বাঁচার চেষ্টা করে। কাজেই আমাদের স্বার্থেই তাকে সম্মান দিতে হবে এটা বুঝে গেলাম।"

ক্লার্ক ক্রিস্টিনের প্রতি দয়া দেখিয়ে বলেছিল তার যাতে কিছু না হয় সেটা সে দেখবে। ক্রিস্টিন বলছেন এটা শুধু একজনের উপর নির্ভর করতে পারা নয়- তার থেকেও বেশি।

"আমি বুঝতে পেরেছিলাম ইয়ানের হাত থেকে সে আমাকে রক্ষা করবে। যদি পণবন্দীদের কারো ক্ষতি করার কথা সে ভাবে - সেখানে আমাকে বাদ দেবে। কারণ ও জানে ক্লার্ক আমাকে পছন্দ করে।"

ক্রিস্টিনার কখনও মনে হয় নি ক্লার্ক তার প্রতি দৈহিক আকর্ষণের কারণে তাকে রক্ষা করতে চেয়েছিল।

তিনি বলেছেন ক্লার্ক তার শরীর কখনই স্পর্শ করেনি। তার কথায় "আমাদের পরস্পরের প্রতি একটা মমতা তৈরি হয়েছিল - একে অপরকে সান্ত্বনা দেওয়ার একটা ব্যাপার গড়ে উঠেছিল।"

দ্বিতীয় দিনের মধ্যেই ক্লার্কের প্রতি ক্রিস্টিন-এর শ্রদ্ধাবোধ এতই বেড়ে ওঠে যে ক্রিস্টিন এমনকী সুইডেনের প্রধানমন্ত্রী উলোফ পামার-এর কাছে দুই অপরাধীর মুক্তির জন্য তদ্বির করতেও পিছপা হন নি।

ক্লার্ক ক্রিস্টিনকে টেলিফোন নম্বর দিয়ে বলেছিল প্রধানমন্ত্রীকে ফোন করতে।

তাদের ফোনের আলাপ পুলিশ রেকর্ড করেছিল। যেখানে প্রধানমন্ত্রীর কাছে ক্রিস্টিন অনুরোধ জানিয়েছিলেন দুই অপহরণকারীকে যেন মুক্তি দেওয়া হয়।

প্রধানমন্ত্রী যখন কেন তাদের ছাড়া উচিত নয় সেটা ক্রিস্টিনকে বোঝানোর চেষ্টা করেন, তখন রীতিমত উত্তেজিত হয়ে অপহরণকারীদের পক্ষই নিয়েছিলেন ক্রিস্টিন।

এমনকী বাইরের দুনিয়ার ওপর রাগ, ক্ষোভ আর হতাশার বহি:প্রকাশ দেখিয়ে ক্রিস্টিন সুইডিশ বেতারে কড়া একটি বিবৃতিও দেন। পুলিশ সম্পর্কে গালাগালসূচক মন্তব্যও করেন।

নিজের জীবন বাঁচানোর জন্য যে কৌশল নিয়েছিলেন তিনি অর্থাৎ একজন অপহরণকারীর সঙ্গে বন্ধুত্ব জমানো - সেটা ক্রিস্টিনের মধ্যে অদ্ভুত একটা পরিবর্তন আনে। যদিও ক্রিস্টেন তার আচরণের এই পরিবর্তন তখন নিজে বুঝতে পারে নি।

বন্দী অবস্থায় ডাকাত ইয়ান পুরুষ পণবন্দী স্ভেনকে গুলি করার হুমকি দিলে ক্রিস্টিন তাকে কাপুরুষ বলে তিরস্কার করে বলেন ওরা তো তোমাকে প্রাণে মারছে না - শুধু পায়ে গুলি করবে- ভয় পাচ্ছ কেন?

ছবির কপিরাইট AFP
Image caption জেল পালানো ইয়ান ওলসন ব্যাঙ্ক কর্মীদের জিম্মি করার পর ঘোষণা করে 'পার্টির সবে শুরু'। প্রায় ছয়দিন পণবন্দীদের ব্যাঙ্কের ভল্টে আটকে রাখে সে ও তার সহযোগী।

ইয়ান পুলিশকে দেখাতে চাইছিল যে সে কোনো ছেলেখেলা করছে না- সে খুবই সিরিয়াস এবং বিপদজনক। তাই স্ভেনকে সে বলেছিল তার পায়ে গুলি করবে। কিন্তু তাতে তার আঘাত তেমন গুরুতর হবে না। কিন্তু স্বভাবতই সে ভয় পেয়ে গিয়েছিল।

সৌভাগ্যবশত ইয়ান তার পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করে নি। এমনকী স্ভেনও স্বীকার করে যে তাকে যারা বন্দী করেছিল তাদের প্রতি তারও একটা কৃতজ্ঞতাবোধ গড়ে উঠছিল । তাকেও নিজেকে জোর করে বোঝাতে হচ্ছিল ওরা সহিংস অপরাধী- ওরা ওর বন্ধু নয়।

পণবন্দীদের ওই ব্যাঙ্কের ভল্টের ভেতর আটক করে রাখা হয়েছিল পুরো ছয়দিন।

শেষ পর্যন্ত পুলিশ ভল্টের ছাদ ভেঙে ভেতরে ঢোকার সিদ্ধান্ত নেয়। কাঁদানে গ্যাস ছুঁড়ে অপহরণকারীদের নিরস্ত্র করার চেষ্টা করে। যদিও ইয়ান হুমকি দিয়েছিল পুলিশ অভিযান চালালে পণবন্দীদের তারা হত্যা করবে।

পুলিশের উদ্ধার অভিযান নিয়েও ক্ষুব্ধ মন্তব্য করেছিলেন ক্রিস্টিন।

শেষপর্যন্ত অপরাধীরা আত্মসমর্পণ করে। তারা এবং তাদের হাতে জিম্মি চারজন অক্ষত অবস্থায় বেরিয়ে আসে।

ইয়ান ওলসনকে দশ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয় এবং তাকে সহযোগিতা করার দায়ে ক্লার্ক উলোফসনের জেল হয় ছয় বছরের ।

চল্লিশ বছরেরও বেশি সময় পর ক্রিস্টিন এখনও ক্লার্ককে তার বন্ধু বলে ডাকে। তাকে চিঠি লেখে। তবে এখনও তাকে ক্রিস্টিন জিজ্ঞেস করে উঠতে পারে নি কেন সে সেদিন তাদের জিম্মি করেছিল- কেন ওই অপহরণে অংশ নিয়েছিল।

পরে মনস্তত্ববিদরা জিম্মিদের মানসিক অবস্থার মূল্যায়ন করে আটককারীদের সঙ্গে জিম্মিদের বন্ধুত্ব গড়ে তোলার এই মানসিকতার নাম দেন স্টকহোম সিনড্রম।

ক্রিস্টিন এনমার্ক অবশ্য তার বন্দী অবস্থার অভিজ্ঞতা নিয়ে লেখা বইএ এমন কোনো মানসিক অবস্থার কথা উড়িয়ে দেন।

সম্পর্কিত বিষয়