সে এক দারুণ সময় ছিল আমার জন্যে: সৈয়দ শামসুল হক

ছবির কপিরাইট BBC BANGLA
Image caption সৈয়দ শামসুল হক লন্ডনের লেস্টার স্কয়ারে উইলিয়াম শেক্সপীয়রের এই ভাস্কর্যের সামনে দাঁড়িয়ে এই ছবিটি তুলেছিলেন

সৈয়দ শামসুল হক লন্ডনে বিবিসির বাংলা বিভাগে ৭ বছর কাজ করেছেন প্রযোজক হিসেবে। বিবিসি বাংলার ৭০ বছর উপলক্ষে ২০১১ সালে প্রকাশিত স্মরণিকায় তার এই লেখাটি ছাপা হয়েছিলো। ২৭শে সেপ্টেম্বর ২০১৬ তারিখে ঢাকায় তিনি মারা গেছেন

সে এক দারুণ সময় ছিল আমার জন্যে৷ একাত্তরের নভেম্বরে লন্ডনে পৌঁছই শরণার্থী হয়ে। আমার ধারণা ছিলো মুক্তিযুদ্ধ দীর্ঘদিন ধরে চলবে, হয়তো বছর তিনেক লেগে যাবে। শরীর ভেঙে পড়েছিল বন্দী স্বদেশে। ভেবেছিলাম, শরীর খানিকটা ঠিক হলেই ভারতে ফিরে আসবো, সরাসরি যুদ্ধে অংশ গ্রহণ করবো।

লন্ডনে আসবার পরপরই বন্ধুরা আমাকে বিবিসিতে নিয়ে এলেন আর সেখানে পরদিন থেকেই খবর ও খবর-ভাষ্য প্রচারে লেগে গেলাম। প্রায় প্রতিদিনই বেতারে কণ্ঠ দিচ্ছি আর, স্বজন প্রিয়জন আর সিলেট অঞ্চলের অজানা অনেক মানুষের কল্যাণে থাকা খাওয়া চলছিলো। তাদের সেই অনুগ্রহ আর যত্নের কথা সারাজীবন আমি ভুলবো না।

এরই মধ্যে যুদ্ধের খবর স্থানীয় লন্ডনবাসীদের জানাবার জন্যে প্রতিদিন রেডিও লন্ডন থেকেও সংবাদ প্রচারিত হতে লাগল সন্ধ্যেবেলায়। সে বেতার প্রচারেও নিয়মিত অংশ নিচ্ছি। দেশের সঙ্গে যোগাযোগ নেই। স্বজনেরা, আমার স্ত্রী পুত্রকন্যা কেমন আছে, কোনো খবর পাচ্ছি না। সেই সময়টার কথা মনে করলে আজও আমার মন উৎকণ্ঠিত হয়ে ওঠে৷

এরই মধ্যে বিজয় এলো মুক্তিযুদ্ধে। একাত্তরের ষোলোই ডিসেম্বর পাকিস্তান বাহিনী ঢাকায় আত্মসমর্পণ করলো মিত্রবাহিনী অর্থাৎ সম্মিলিত ভারতীয় সেনা ও মুক্তিবাহিনীর কাছে। আমার বেতার-জীবনের শ্রেষ্ঠ মুহূর্ত : আত্মসর্মপণের খবরটি আমি পাঠ করেছিলাম সেদিন বিবিসি বাংলা খবরে।

ছবির কপিরাইট BBC BANGLA
Image caption সৈয়দ শামসুল হক (১৯৩৫-২০১৬)

দেশ তো স্বাধীন হলো, বিবিসি সিদ্ধান্ত নিলো বাংলা সম্প্রচারের সময় বৃদ্ধি করবে। আর, আমাকেও বিবিসি প্রস্তাব করলো যেন বেতার-সম্প্রচারক হিসেবে যোগদান করি। যোগ দিলাম বাহাত্তর সালের তেসরা আগস্ট তারিখে। আমাদের অংশ নিতে হতো খবর পাঠ ছাড়াও বিভিন্ন অনুষ্ঠানমালায়। তার একটি অনুষ্ঠান শিল্পসাহিত্য সম্পর্কে - তার দায়িত্ব দেয়া হলো আমাকে। অনুষ্ঠানের নামটিও আমাকে দিতে হলো - শিল্পপ্রাঙ্গণ৷ প্রতি সপ্তাহে শুক্রবারে পনেরো মিনিটের জন্যে সে অনুষ্ঠান।

তখন বাংলা বিভাগের দায়িত্বে ছিলেন এভান চার্লটন। এই মানুষটির কাছে আমি নানা কারণে কৃতজ্ঞ, সে কথা আরেকদিন বলা যাবে। আমাকে চাকুরিতে নেবার প্রস্তাবটিও ছিলো তাঁরই। সম্প্রসারিত বাংলা বিভাগের দায়িত্বে এলেন জন ক্ল্যাপহ্যাম। একদিন তিনিই আমাকে বললেন শিল্পপ্রাঙ্গণ অনুষ্ঠানে আমি যেন ধারাবাহিক নাট্যপ্রচার শুরু করি। তারই পরামর্শে হোমারের মহাকাব্য থেকে আমি বেছে নিই ট্রয়ের যুদ্ধ শেষে অডিসিয়সের ইথাকায় তাঁর দেশে ফিরে আসার কাহিনিটি। আমার এই নির্বাচনের পেছনে ভাবনা ছিলো বাংলাদেশে শরণার্থী মানুষদের ফিরে আসবার একটি সমান্তরাল ভাবনা সৃজন। তেরো পর্বে করেছিলাম সে নাটক। এছাড়াও পরে পরে আরো কয়েকটি ধারাবাহিক নাটক আমি রচনা প্রযোজনা করি শিল্পপ্রাঙ্গণ অনুষ্ঠানে। পিলগ্রিমস প্রগ্রেস, টেস অব দি ডার্বেভেল, ম্যাকবেথ। এ ছাড়াও প্রতি সপ্তাহে ইংরেজি সাহিত্যের বিভিন্ন দিক ও নতুন ভাবনাচিন্তাগুলোও স্থান পেতো এ অনুষ্ঠানে। আমার নিয়মিত অনুষ্ঠানে যাঁরা সেদিন অংশ নিতেন তাঁদের মধ্যে বিশেষ করে মনে পড়ে নাজির আহমদ, আশুতোষ বন্দোপাধ্যায়, নরেশ বন্দোপাধ্যায়, নিমাই চট্টোপাধ্যায়, নুরুল ইসলাম, আতিউর রহমান আর বিবাহিত হয়ে সদ্য লন্ডনে আগত মানসী বড়ুয়ার কথা। আমি বিবিসি থেকে দেশে ফিরে আসবার সময়, উনিশশ' আটাত্তর সালে শিল্পপ্রাঙ্গণের দায়িত্ব গ্রহণ করেন নিমাই চট্টোপাধ্যায়। এবং আমার বলতে দ্বিধা নেই, শিল্পপ্রাঙ্গণ অনুষ্ঠানটিকে আরো প্রাণবন্ত ও প্রাসঙ্গিক করে তোলেন নিমাই চট্টোপাধ্যায়। আজ তিনি প্রয়াত। তাঁর মতো সাহিত্যবিশারদ ও জ্ঞানী মানুষ আমি খুব কমই পেয়েছি আমার বন্ধু হিসেবে।

সেই সত্তর দশকে লন্ডনে শিল্পপ্রাঙ্গণ অনুষ্ঠান এবং বিশেষ করে নাটক করবার মতো বাঙালিজন খুব কমই পাওয়া যেত। যাঁরা ছিলেন, তাঁদের গড়েপিটে নিয়ে যে অনুষ্ঠানগুলো করি তার জন্যে আজও আমি গর্ব অনুভব করি। অনেকের মধ্যে অজিত বন্দোপাধ্যায়, নরেশ বন্দোপাধ্যায়, নুরুস সোবহান, এঁদের কথা বিশেষ করে মনে পড়ে। কী ধৈর্য ধরেই না তাঁরা আমার নির্দেশ মেনে কাজ করেছেন। আরো কত জন, যাঁদের কথা এই দূরত্বে আর আলাদা করে মনে পড়ছে না। কিন্তু তাঁরা ছিলেন প্রত্যেকেই নিবেদিত প্রাণ শিল্পী।

শিল্পপ্রাঙ্গণ অনুষ্ঠানে যে ক'টি সাক্ষাৎকার আমি প্রচার করি, তা বেতার-প্রচারের ইতিহাসে উজ্জ্বল হয়ে আছে। কবি জসিমুদ্দিন, কবীর চৌধুরী, উৎপল দত্ত, শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন - এঁরা বিভিন্ন সময়ে লন্ডন সফরে আসেন, শিল্পপ্রাঙ্গণে তাঁদের সাক্ষাৎকারগুলো যদি আজও বিবিসি আর্কাইভে যদি থেকে থাকে। জানিনা আছে কিনা। বিশেষ করে জয়নুল আবেদিনের সাক্ষাৎকারটি। এসেছিলেন তিনি গলায় ক্যানসার নিয়ে, চিকিৎসার জন্যে। জীবনের ও শিল্পের বিষয় অনেক গুরুত্বপূর্ণ কথা তিনি বলেছিলেন সেদিন।

আর মনে পড়ে হেদার বন্ডের কথা, যিনি আমার সবগুলো নাটকেরই ধারক ও সম্পাদক হিসেবে কাজ করেন। তিনি আজ আমাদের মাঝে আর নেই। তাঁর সঙ্গে কাজ করে যেমন আনন্দ পেয়েছি তেমনি অনেক কিছু শিখেওছি তাঁর কাছে।

সাতটি বছর একটানা কাজ করেছি বিবিসি বাংলা বিভাগে। সে শুধু আমার চাকুরি করাই ছিলো না। শুধু অর্থ উপার্জনই ছিল না। ছিল, দেখা ও শোনার এক মহাপার্বণ। আমি সমৃদ্ধ হয়েছি অনেকদিক থেকে। তার ভেতরে একটি তো এই যে, আমি নাট্যরচনায় উদ্বুদ্ধ হয়েছি। আজ আমার নাট্যরচনায় যদি কিছু সুকৃতি থেকে থাকে তবে তার পেছনে রয়েছে বিবিসি বাংলাবিভাগে নাটক করবার অভিজ্ঞতা। সে কী কেবল বেতার মারফতেই? তা নয়৷ দর্শক সমুখেও একাধিক নাটক করেছি লন্ডনে বিবিসির বাংলা বিভাগের বিশেষ শ্রোতা-দর্শক সমাবেশে অনুষ্ঠানে।

অনেক দিন পার হয়ে গেছে। অনেক কথা ভুলে গিয়েছি। কিন্তু যে আনন্দ এবং অভিজ্ঞতা পেয়েছি বিবিসতে কাজ করে, তা আমাকে আমি করে তুলতে বিরাট একটি ভূমিকা রেখেছে৷ এই কথাটি বলতে পেরে খুব ভালো লাগছে।

কবি ও নাট্যকার

(বিবিসি বাংলা বিভাগে প্রযোজক ১৯৭২-১৯৭৮)