ইসরায়েলের নেতাদের মধ্যে শিমন পেরেজ কেন ব্যতিক্রম?

ছবির কপিরাইট AP
Image caption শিমন পেরেজ ৯৩ বছর বয়সে মারা গেছেন।

নোবেল শান্তি পুরস্কার বিজয়ী ইসরায়েলের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও প্রেসিডেন্ট শিমন পেরেজ ৯৩ বছর বয়সে মারা গেছেন। তেল আবিবের একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান। দুই সপ্তাহ আগে মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণজনিত সমস্যা নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন তিনি।

১৯৪৮ সালে ইসরায়েল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে যে সমস্ত রাজনীতিকদের অবদান গুরুত্বপূর্ণ, তাদের সর্বশেষ উত্তরসূরী শিমন পেরেজ।

যদিও তার জীবনের ৭০ বছরই কেটেছে সরকারি দায়িত্ব পালন করে, তবুও কিছু কিছু ক্ষেত্রে তার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকার কথা উল্লেখ করা যেতে পারে।

১৯৯৩ সালে ইসরায়েল ও ফিলিস্তিনের মধ্যকার অসলো শান্তি চুক্তির অন্যতম উদ্যোক্তা ছিলেন তিনি। সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটন, ফিলিস্তিনী নেতা ইয়াসির আরাফাত এবং ইসরাইলের আরেকজন নেতা ইৎযহাক রাবিনের উপস্থিতিতে যারা ওই চুক্তিতে স্বাক্ষর করেন, তিনি ছিলেন তাদের একজন।

ওয়াশিংটনে হোয়াইট হাউজ লনে ওই চুক্তি স্বাক্ষর অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, "আমরা প্রাচীন এক ভূমিতে বাস করি। আর যেহেতু আমার ভূমি সীমাবদ্ধ তাই আমাদের মিলন হতে হবে মহান।"

ছবির কপিরাইট AP
Image caption ইসরায়েল ও ফিলিস্তিনের মধ্যে শান্তির লক্ষ্য নিয়ে ১৯৯৩ সালে অসলো চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়

তিনি ফিলিস্তিনের উদ্দেশ্যে আারও বলেন, যেহেতু আমরা প্রতিশ্রুতিবদ্ধ, তাই একটি চিরস্থায়ী ব্যবস্থা নিতে চাই আমরা। সেইসাথে প্রতিবেশী সবার জন্য শান্তি প্রতিষ্ঠা করতে চাই"।

শান্তির জন্য একজন আশাবাদী এবং স্পষ্টবাদী ইসরায়েলি দূত হিসেবে তাকে স্মরণ করার জন্য আন্তর্জাতিক বিশ্বের সামনে শিমন পেরেজের এই বক্তৃতাই হয়তো জ্বলজ্বলে নিদর্শন।

যদিও মধ্যপ্রাচ্যে ইসরায়েল তার আরব প্রতিবেশীদের সাথে মুক্ত সীমান্তে জলপথ এবং ব্যবসা-বাণিজ্য নিয়ে বিরোধহীন সহাবস্থান করবে - সে কথাই বলে এসেছেন মিস্টার পেরেজে, আবার একই সময়ে ইসরায়েল যেন সমরাস্ত্রে শক্তিশালী হয়ে উঠতে পারে সেজন্যও তিনি সর্বাত্মক ব্যবস্থা নিয়েছেন।

তার কর্মজীবনের শুরুর দিকে তিনি বিদেশী অস্ত্র বিক্রেতাদের সাথে মধ্যস্থতাকারী একজন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি হয়ে উঠেন। সেইসাথে ইসরায়েলের পারমানবিক ক্ষমতা অর্জনের ক্ষেত্রে গোপন মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকায়ও ছিলেন তিনি।

যখন তাকে অসলো চুক্তির জন্য নোবেল পুরস্কারে ভূষিত করা হলো, তখন তিনি দার্শনিকসুলভ ভাবে ইসরায়েলের সামরিক শক্তি সম্পর্কে বলেছিলেন, "যুদ্ধই আমাদের লড়াই করতে বাধ্য করেছে। ইসরায়েলের প্রতিরক্ষা বাহিনীকে ধন্যবাদ কারণ সবগুলোতেই আমরা জয়ী হয়েছি। কিন্তু সবচেয়ে বড় যে বিজয় তা আমরা পাইনি। সেটা হলো বিজয় অর্জনের প্রয়োজনীয়তা থেকে মুক্তিলাভ।"

ছবির কপিরাইট Getty Images
Image caption ইসরাইলের শক্তিশালী সশস্ত্র বাহিনী গড়ে তোলার পেছনে মিস্টার পেরেজের ভূমিকা খুবই গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হয়।

তিনি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে জোর দিয়ে যেভাবে শান্তি প্রতিষ্ঠার কথা বলতেন, ঘরোয়া রাজনীতিতে সেটা ততটা সাফল্যের সাথে দেখা যায়নি।

তিনি কখনই কোনও নির্বাচনে সরাসরি জয় পাননি। কিন্তু দু'দফা প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। ১৯৯৫ সালে ডানপন্থীদের হাতে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইৎজহাক রাবিনের হত্যাকান্ডের পরও দায়িত্ব পালন করেন তিনি।

সেইসময়কার তার একটি উক্তি ছিল যেন ইসরায়েলের মানষদের অনুভূতি - "তুমি যে কারো শরীরকে হত্যা করতে পারো। কিন্তু শান্তির জন্য মহৎ চিন্তাকে হত্যা করতে পারবে না"।

মি. রাবিনের হত্যাকান্ডের ২০তম বার্ষিকীতেও তিনি এই বক্তব্য উচ্চারণ করেন। যদিও ফিলিস্তিনের সাথে ওই শান্তি আলোাচনার আয়োজকদের কর্মকান্ডকে ডানপন্থীরা 'প্রপঞ্চ' বলে সমালোচনা করে আসছে।

তার দীর্ঘ কর্মজীবনে এমন কোনও মন্ত্রণালয় নেই যার দায়িত্ব তিনি পালন করেননি। এবং জাতীয় ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণএমন কোনও অধ্যায় নেই যেখানে তিনি কোন না কোন ভূমিকা রাখেননি।

ছবির কপিরাইট Getty Images
Image caption ১৯৭৬ সালে উগান্ডা থেকে যখন ইসরাইলের বিমান ছিনতাই হয় মি. পেরেজ (মাঝে) তখন প্রতিরক্ষা মন্ত্রী ছিলেন

তবে শিমন পেরেজের রাজনৈতিক জীবন যত দীর্ঘ হতে থাকে, সময়ের সাথে সাথে ততই তিনি অবস্থান পাল্টাতে থাকেন।

ফিলিস্তিনি অধ্যূষিত এলাকায় ইহুদি বসতি স্থাপন কার্যক্রম যখন শুরু হয়, তখন তিনিও সরকারের একজন সদস্য ছিলেন। ওই উদ্যোগকে মনে করা হয় শান্তি চুক্তির প্রতিবন্ধকতা হিসেবে।

১৯৯৬ সালে লেবানিজ জঙ্গি গ্রুপ হেজবুল্লাহ রকেট হামলা চালালে তিনি তত্ত্বাবধায়ক প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ইসরায়েলি সেনাবাহিনীকে পাল্টা হামলার নির্দেশ দেন। টানা ১৬ দিনের অভিযানে বহু বেসামরিক লেবানিজ প্রাণ হারায়। জাতিসংঘের আশ্রয় শিবিরে বাস্তুচ্যুত বহু মানুষ ইসরাইলি শেলের আঘাতে প্রাণ হারালে তখন তা ব্যাপক নিন্দার ঝড় তোলে।

তার ক্যারিয়ারের আরেকটি উল্লেখযোগ্য দিক হচ্ছে, ২০১৩ সালে তিনি যখন নব্বই বছর পূর্ণ করেন তখন মি পেরেজই ছিলেন বিশ্বের সবচেয়ে বেশি বয়সী রাষ্ট্রপ্রধান।

এই খবর নিয়ে আরো তথ্য