বাংলাদেশে মানসিক স্বাস্থ্যকে কেন এত অবহেলা?

মানসিক অসুস্থতা
Image caption মানসিক অসুস্থতার বেশ কিছু লক্ষ্মণ প্রকাশ পাওয়ায় এই তরুণটিকে হাত বেঁধে নিয়ে আসা হয়েছে মানসিক চিকিৎসকের কাছে।

উষ্কখুষ্ক চেহারা, ধুলা-মলিন পোশাক, দুই হাত পিছমোড়া করে বাঁধা। তরুণটি ইতিউতি ঘুরছে। মাঝে মাঝেই ছুটে পালানোর চেষ্টা করছে। তার মা তাকে আটকে রাখার প্রাণপণ চেষ্টা করছেন।

ঢাকার শেরেবাংলা নগরে অবস্থিত মানসিক স্বাস্থ্য ইন্সটিটিউটের বহির্বিভাগের বারান্দায় এক সকালবেলার চিত্র ছিল এটি।

এখানে এরকম দৃশ্য নতুন নয়।

সকাল থেকেই বহু মানুষ সেখানে লাইন ধরে দাঁড়িয়ে টিকেট কাটেন।

দশ টাকার একটি টিকেট কাটলেই দেখা পাওয়া যায় বহির্বিভাগের ডাক্তারের।

কর্মকর্তারা বলছেন, এই হাসপাতালটির বহির্বিভাগে প্রতিদিন তিন শতাধিক মানুষ আসে চিকিৎসাসেবা নিতে।

তবে এদের সবার অবস্থাই যে হাত বাঁধা এই তরুণটির মতো, তা নয়, বেশীরভাগকেই আর দশজন সাধারণ মানুষ থেকে আলাদা করা যাবে না।

হাসপাতালের ভর্তি থাকা রোগীদের ওয়ার্ডে ঢুকতেই বড়সড় তালা মারা একটি ফটক। রয়েছেন একাধিক দ্বাররক্ষীও।

Image caption বাংলাদেশে মানসিক চিকিৎসার জন্য দুটি মোটে বিশেষায়িত হাসপাতালের একটি এটি।

যথাযথ কর্তৃপক্ষের অনুমতি নিয়ে একটি ওয়ার্ডে ঢুকে দেখা গেল বেশ কিছু মানুষ আড্ডা দিচ্ছে।

এদের মধ্যে কে রোগী আর কে রোগীর স্বজন, আলাদা করবার উপায় নেই।

একজন মোটে বিছানায় শুয়ে ঘুমাচ্ছে।

কথাবার্তা বলে জানা গেলো, আড্ডায় অংশ নেয়া হাসিখুশি মানুষদের অধিকাংশই এই ওয়ার্ডের রোগী।

এদের প্রত্যেকেরই রয়েছে আলাদা আলাদা গল্প, কেউবা প্রেমে ব্যর্থ, কেউ ঋণগ্রস্ত হয়ে আত্মহত্যা-প্রবণ, কেউবা মাদক সেবন করতে করতে হারিয়ে ফেলেছেন মানসিক ভারসাম্য।

বহু রোগী, সামান্য সুযোগ:

Image caption ঢাকার মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের বহির্বিভাগে প্রতিদিন তিন শতাধিক মানুষ চিকিৎসাসেবা নিতে আসেন।

বাংলাদেশে ২০০৯ সালে ও ২০০৫ সালে সর্বশেষ যে জাতীয় সমীক্ষা দুটি হয়েছে তার ফলাফল অনুযায়ী দেশটির মোট জনগোষ্ঠীর প্রতি পাঁচ জনের মধ্যে অন্তত একজন কোন না কোন মানসিক সমস্যায় আক্রান্ত যার চিকিৎসা হওয়া প্রয়োজন।

অথচ মোট দুটি বিশেষায়িত মানসিক হাসপাতাল সহ সব মিলিয়ে দেশটিতে রয়েছে মোটে ৮শর মত শয্যা, ২শর সামান্য বেশী মানসিক চিকিৎসক আর ৫০ জনের মতো ক্লিনিক্যাল সাইকোলজিস্ট, বলছেন জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইন্সটিটিউট ও হাসপাতালের সহকারী অধ্যাপক ডাক্তার হেলাল উদ্দিন আহমেদ।

বাজেটেও বরাদ্দ নেই বললেই চলে।

ড. আহমেদ বলছেন, ২০০৫ সালের জাতীয় বাজেট পর্যালোচনা করে দেখা যাচ্ছে দেশটির স্বাস্থ্য খাতে প্রতি ১শ টাকা বরাদ্দের মধ্যে মানসিক স্বাস্থ্য খাতের জন্য থাকে মোটে ৪৪ পয়সা।

এগুলোকে মানসিক স্বাস্থ্য সুরক্ষার ক্ষেত্রে বাধা হিসেবে উল্লেখ করছেন ড. আহমেদ।

Image caption ড. হেলাল উদ্দিন আহমেদ

তবে তার চোখে বড় বাধা হল অসচেতনতা এবং সামাজিক ধ্যান ধারণার কারণে রোগ গোপন রাখার চেষ্টা।

সংক্ষিপ্ত একটি এলাকা জুড়ে চালানো এক জরিপে দেখা গেছে এসব সমস্যার কারণে একজন রোগী তার রোগের লক্ষ্মণ প্রকাশ হবার পর থেকে চিকিৎসকের দ্বারস্থ হওয়া পর্যন্ত ৬ বছর সময় লেগে যাচ্ছে।

কেন গোপন রাখার প্রবণতা?

নাম পরিচয় প্রকাশে অনিচ্ছুক এক দম্পতি বিবিসি বাংলার সাথে আলাপকালে জানিয়েছেন, তাদের লেখাপড়ায় অনিচ্ছুক কৈশোরোত্তীর্ণ ছেলেটিকে নিয়ে তারা ডাক্তারের শরণাপন্ন হয়েছিলেন।

এটাকে তারা একটি মানসিক সমস্যা বলে মনে করেন, কিন্তু তারা একথা সবার কাছ থেকে গোপন রেখেছেন।

কেন গোপন রেখেছেন জানতে চাইলে ছেলেটির বাবা বলেন, "তার ভবিষ্যতের কথা ভেবে। জানলে তো মানুষ তাকে বলবে মানসিক রোগী। এতে তার ভবিষ্যৎ ক্ষতিগ্রস্ত হবে"।

এই লুকিয়ে রাখার চেষ্টার ফলে সমস্যা আরো ঘনীভূত হওয়া ছাড়া আর কোন উপকার হয় না, বলছেন ড. আহমেদ।

Image caption সারা বাংলাদেশের সব হাসপাতাল মিলে মানসিক রোগীদের জন্য বিছানা রয়েছে মোটে ৮শ'র কিছু বেশী।

কোনটি সঠিক চিকিৎসা?

একসময় মানসিক রোগের জন্য নানা অপচিকিৎসার আশ্রয় নিত বাংলাদেশের মানুষ।

দেশটিতে পীর, ফকির, ওঝা, কবিরাজদের এখনো অনেক ক্ষেত্রেই জনপ্রিয়তা রয়েছে।

এমনকি ঢাকাতেও মানুষকে এ ধরণের চিকিৎসা নিতে দেখা যাচ্ছে।

যদিও মানুষ জনের মধ্যে সচেতনতা বাড়ার সাথে সাথে অপচিকিৎসার প্রকোপ কিছুটা হলেও কমেছে, কিন্তু ডাক্তারের দ্বারস্থ হলেই যে মানসিক রোগের সমাধান হবে সেটাও মনে করছেন না কোন কোন ক্লিনিক্যাল সাইকোলজিস্ট।

জনপ্রিয় মনোবিদ মেহতাব খানম বলছেন, রোগীর রোগটা কি ঔষধ দিয়ে ঠিক করার উপযোগী না কি তাকে কাউন্সেলিংয়ের মাধ্যমে সুস্থ করে তুলতে হবে সেটা আগে ঠিক করতে হবে।

যদি কাউন্সেলিংয়ের মাধ্যমে ঠিক করার মতো রোগ হয় তবে তার গন্তব্য মানসিক চিকিৎসক অর্থাৎ সাইকিয়াট্রিস্ট হওয়া উচিত নয়, তার গন্তব্য হওয়া উচিত মনোবিদ বা ক্লিনিক্যাল সাইকোলজিস্ট, বলছেন প্রফেসর খানম।

প্রফেসর খানম বেসরকারি ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল সাইকো-সোশ্যাল কাউন্সিলরদের সাথে একটি সাপ্তাহিক বৈঠক করছিলেন।

এই কাউন্সিলররা মূলত বিশ্ববিদ্যালয়টির ছাত্র ও শিক্ষক কর্মচারীদের মানসিক সুস্থতার দিকে নজর রাখার কাজ করেন।

Image caption ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল সাইকো-সোশ্যাল কাউন্সিলরদের সাথে একটি সাপ্তাহিক বৈঠক করছিলেন জনপ্রিয় মনোবিদ প্রফেসর মেহতাব খানম।

এখানকার একজন কাউন্সিলর শমি সুহৃদ বলছেন, অনেক সময় মানুষ নিজের মানসিক সমস্যার ব্যাপারটি বুঝতে পারেন না।

এক্ষেত্রে তার আশপাশের মানুষ, পরিবারের সদস্যদের উচিৎ তাকে সাহায্য করা এবং তাকে যথাযথ চিকিৎসকের শরণাপন্ন করা।

অবশ্য ঢাকার মানসিক স্বাস্থ্য ইন্সটিটিউটে এমন কিছু মানুষের দেখা মেলে যারা নিজে থেকেই সমস্যা চিহ্নিত করে চিকিৎসকের শরণাপন্ন হয়েছেন।

সম্পর্কিত বিষয়