'উচ্ছেদ-আগুন-লুটের প্রতিবাদে' সাঁওতাল বিক্ষোভ

Image caption বিক্ষোভকারীদের মানববন্ধন

বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলীয় জেলা গাইবান্ধায় ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী সাঁওতালদের দেড় হাজারের মতো বাড়িঘরে অগ্নিসংযোগ এবং লুটপাটের প্রতিবাদে কয়েকশ সাঁওতাল আজ দিনাজপুরে বিক্ষোভ করেছে।

সাঁওতালদের অভিযোগ, গাইবান্ধার একটি চিনিকল এলাকা থেকে তাদের বাড়ি-ঘরে অগ্নিসংযোগ করে উচ্ছেদ করা হয়েছে এবং এ সময় পুলিশের গুলিতে দু'জন নিহত হয়েছে।

তবে গুলি চালানোর অভিযোগ অস্বীকার করে প্রশাসন বলছে পুলিশের উপর হামলার জবাবে তারা শক্তি প্রয়োগ করছে ঠিকই কিন্তু গুলি চালায়নি। স্থানীয় প্রশাসন আরো বলছে যে ওই জমিতে সাঁওতালদের থাকার কোন অধিকার নেই।

স্থানীয় সাঁওতালরা দাবী করছে, পুলিশের উপস্থিতিতে তাদের বাড়ি-ঘরে অগ্নিসংযোগ এবং লুটপাট চালানো হয়েছে। এসব বাড়ি-ঘর ছন, খড়ি, খড় এবং বাঁশ দিয়ে তৈরি।

দিনাজপুরের সাংবাদিক আজহারুল আজাদ জুয়েল মঙ্গলবার সে এলাকা ঘুরে দেখেছেন। তিনি জানিয়েছেন, অগ্নিসংযোগের মাত্রা ব্যাপক এবং এখনো সেটির চিহ্ন রয়েছে।

মি: জুয়েল বলেন, "ঐ ঘরগুলোতে যে আগুন লাগানো হয়েছিল, সেটার ছাইয়ের স্তুপ এখনো আছে। সবগুলো ঘর পুড়িয়ে দেয়া হয়েছে। কিছু কিছু ঘরের জায়গা লাঙ্গল দিয়ে চাষ করে দেয়া হয়েছে।"

১৯৫৬ গাইবান্ধার মহিমাগঞ্জ চিনি কলের জন্য প্রায় দুই হাজার একর জমি অধিগ্রহণ করে তৎকালীন সরকার। সেখানে তখন ২০টি গ্রামের মধ্যে ১৫টিতে সাঁওতালদের বসবাস ছিল। বাকি পাঁচটি গ্রামে বাঙালীদের বসবাস ছিল।

Image caption বিক্ষোভকারীদের মানববন্ধন

কিন্তু ২০০৪ সালে চিনিকলটি বন্ধ হয়ে গেলে সাঁওতালরা সে জমিতে আবারো ফেরত আসার চেষ্টা করে।

১৯৫৬ সালের জমি অধিগ্রহণের কাগজ-পত্র দেখেছেন দিনাজপুরের আইনজীবি মাইকেল মালো। তিনি বলেন, জমি অধিগ্রহণের চুক্তিতে কিছু শর্ত অন্তর্ভূক্ত ছিল। এর মধ্যে একটি হচ্ছে, অধিগ্রহণ করা জমিতে আখ চাষ ছাড়া অন্য কোন কিছু করা যাবেনা । যদি এখানে আখ চাষ ব্যতীত অন্য কিছু করা হয় তাহলে সে জমি পূর্বের অবস্থায় ফেরত নেবার শর্ত অন্তর্ভূক্ত ছিল বলে উল্লেখ করছেন মাইকেল মালো।

মি: মালো বলেন, "এটা কিন্তু সুগার মিলের জন্য জমি অধিগ্রহণ করা হয়েছিল। শর্তের মধ্যে আছে এ জমি কোন সময় আখ চাষ ছাড়া অন্য কোন কাজে ব্যবহার করা যাবে না।"

২০০৪ সালে চিনিকল বন্ধ হয়ে যাবার পর সেখানকার জমি অন্য কাজে ব্যবহার করা হচ্ছে বলে মি: মালো জানান। সে যুক্তির ভিত্তিতেই সাঁওতালরা তাদের পূর্ব-পুরুষের জমিতে ফিরে আসার চেষ্টা করে।

এক পর্যায়ে চলতি বছরের জুন-জুলাই মাসের দিকে তারা সেখানে বসতি গড়ে তোলে।

কিন্তু গাইবান্ধার জেলা প্রশাসক আব্দুস সামাদ জানিয়েছেন, ১৯৫৬ সালে পর্যাপ্ত ক্ষতিপূরণ দিয়ে সে জমি অধিগ্রহণ করা হয়েছিল। সেজন্য এখানে সাঁওতালদের ফিরে আসার কোন সুযোগ নেই।

মি: সামাদ বলেন, "তখন জমির মূল্য, ঘর-বাড়ির মূল্য, গাছ-পালার মূল্য এবং অন্য জায়গায় সরে যাবার খরচ অন্তর্ভূক্ত করে ক্ষতিপূরণ দেয়া হয়। যেহেতু ক্ষতিপূরণ দেয়া হয়েছে, সেজন্য আইন অনুযায়ী তাদের দাবী থাকার কোন সুযোগ নেই।"

জেলা প্রশাসক জানান, যে কারণে অধিগ্রহণ করা হয়েছে সে উদ্দেশ্যে জমি ব্যবহার না হলে রাষ্ট্র ইচ্ছা করলে ভিন্নভাবে এটি ব্যবহার করতে পারে।

সাঁওতালদের নেতারা বলছেন, ১৯৫৬ সালের পর তখনকার পরিবারগুলো উত্তরাঞ্চলের বিভিন্ন জেলায় ছড়িয়ে যায়। কিন্তু গত জুন-জুলাই মাসে তারা আবারো গাইবান্ধায় আসে।

Image caption বিক্ষোভকারীদের মানববন্ধন

সাঁওতালদের অন্যতম নেতৃস্থানীয় ব্যক্তি রবীন্দ্রনাথ সরেন বলছেন, বাড়ি-ঘরে অগ্নিসংযোগের পর সাঁওতাল পরিবারগুলো এখন দুর্ভোগে আছে।

কতগুলো বাড়িতে ভাংচুর এবং অগ্নি সংযোগ করা হয়েছে সেটি নিয়ে প্রশাসন এবং সাঁওতালদের মাঝে পরস্পর-বিরোধী বক্তব্য রয়েছে। সাঁওতালরা যদিও বলছে প্রায় দেড় হাজার কিন্তু প্রশাসন বলছে এ সংখ্যা কয়েক'শ।

সংঘর্ষের সূত্রপাত কেন হয়েছিল সেটি নিয়েও রয়েছে পাল্টাপাল্টি বক্তব্য। পুলিশ বলছে, সাঁওতালরা আখ কাটতে বাধা দিয়ে পুলিশের উপর তীর-ধনুক নিয়ে আক্রমণ করেছে।

অন্যদিকে সাঁওতালরা বলছে, সে জমি থেকে তাদের উচ্ছেদের জন্য প্রশাসন অনেকদিন ধরেই চেষ্টা করছে।

এদিকে সে এলাকায় যাতে পাল্টা কোন সংঘাত তৈরি না হয় সেজন্য নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে। একই সাথে আলোচনার মাধ্যমে সংকট সমাধানের চেষ্টা হচ্ছে বলে প্রশাসন জানিয়েছে।

সম্পর্কিত বিষয়