ট্রাম্প-জ্বরে টালমাটাল ইউরোপে এ কিসের পদধ্বনি?

প্রথমে ব্রেক্সিট। তারপর যুক্তরাষ্ট্রে ডোনাল্ড ট্রাম্পের জয়। ইউরোপের দেশে দেশে উগ্র ডানপন্থীদের উত্থান। এক রাজনৈতিক ভূমিকম্প যেন পুরো পশ্চিমা বিশ্বের উদার গণতন্ত্রকে তছনছ করে দিতে উদ্যত। কী ঘটবে এরপর? এ নিয়ে বিবিসির লরেন্স পিটারের বিশ্লেষণ:

ছবির কপিরাইট Getty Images
Image caption জার্মানিতে আবার উত্থান ঘটছে উগ্র জাতীয়তাবাদীদের

গণহারে অভিবাসনের বিরুদ্ধে ক্ষোভ বাড়ছিল বহু বছর ধরে। ২০০৮ সালে অর্থনৈতিক সংকট শুরুর পর এটি যেন নতুন মাত্রা পেল। অনেক রাজনীতিকই এসব ইস্যুতে মানুষের ক্ষোভকে পুঁজি করার চেষ্টা করলেন।

ডোনাল্ড ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনে যা ঘটবে, তাকে বলেছিলেন ব্রেক্সিট প্লাস প্লাস প্লাস। তার বিজয় কি এক রাজনৈতিক সুনামিতে পরিণত হবে? সামনে ইউরোপের বেশ কয়েকটি দেশে নির্বাচন। ট্রাম্পের সুনামির ধাক্কায় কোন দিকে যাবে ইউরোপ?

ছবির কপিরাইট AFP
Image caption ইটালিতে ফাইভ স্টার মুভমেন্টের নেতা বেপে গ্রিলো।

ইটালি: বাঁচা-মরার ভোট

ইটালিতে আগামী ৪ ডিসেম্বর গণভোট হবে সাংবিধানিক সংস্কারের প্রশ্নে। কিন্তু এই গণভোটকে মধ্য-বামপন্থী প্রধানমন্ত্রী মাটিও রেনজির সরকারের জন্য এক বড় পরীক্ষা বলেই মনে করা হচ্ছে।

এই সাংবিধানিক সংস্কারের লক্ষ্য ইটালির সেনেট এবং আঞ্চলিক সরকারের ক্ষমতা খর্ব করা। মিস্টার রেনজি মনে করেন, এতে ইটালিতে সরকারের স্থিতিশীলতা বাড়বে, সরকারের খরচ কমাবে। কিন্তু বিরোধীদের ধারণা এতে আসলে সরকারের হাতে ক্ষমতা অনেক কেন্দ্রীভূত হবে।

কিন্তু জনমত জরিপে বলা হচ্ছে, মিস্টার রেনজি অল্প ব্যবধানে হেরে যেতে পারেন গণভোটে। তাতে করে ইটালির প্রাতিষ্ঠানিক বিরোধী দল ফাইভ স্টার মুভমেন্টের অবস্থানই শক্তিশালী হবে।

ফাইভ স্টার মুভমেন্ট যুক্তরাষ্ট্রে ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিজয়কে তাদের জন্য সুসংবাদ হিসেবেই দেখছে, তারা মনে করছে ইটালির গণমাধ্যম, বুদ্ধিজীবী আর সাংবাদিকদের জন্য এটা অশনি সংকেত।

অস্ট্রিয়া: কট্টর ডানপন্থার বিজয়

যেদিন ইটালিতে ভোট হবে, সেদিনই অস্ট্রিয়ায় ভোটে জিতে ক্ষমতায় চলে আসতে পারে একজন কট্টর ডানপন্থী রাজনীতিক নোরবেট হোফের। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ইউরোপে এরকম ঘটনা এখনো পর্যন্ত ঘটেনি।

গত মে মাসে মাত্র এক শতাংশ ভোটে গ্রীন পার্টির কাছে হেরেছিলেন মিস্টার নোরবেট। কিন্তু সেই নির্বাচনী ফল বাতিল করে দেয় আদালত। সেজন্যে আবার নির্বাচন হবে। সেই নির্বাচনে যদি মিস্টার নোরবেটের ইমিগ্রেশন বিরোধী দল বিজয়ী হয়, ইউরোপের কট্টর ডানপন্থীদের জন্য সেটা হবে এক বিরাট সাফল্য।

নেদারল্যান্ডস: ইসলাম বিদ্বেষী রাজনীতি

ছবির কপিরাইট AFP
Image caption ফ্রান্সের মারিন ল পেন এর সঙ্গে নেদারল্যান্ডসের খ্রীট উইল্ডার্স। দুজনেই কট্টর ডানপন্থী রাজনীতিক।

ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিজয়ের পর নেদারল্যান্ডসের ইসলাম বিদ্বেষী রাজনীতিক খ্রীট উইল্ডার্স তার উল্লাস চেপে রাখতে পারছেন না। ডোনাল্ড ট্রাম্পের অনুকরণে তিনি টুইট করেছেন, "উই উইল মেক নেদারল্যান্ডস গ্রেট এগেইন"।

সামনের বছরের ১৫ই মার্চ নেদারল্যান্ডসে নির্বাচন। মিস্টার উইল্ডার্স বলছেন, তিনি নেদারল্যান্ডসকে তার দেশের জনগণের কাছে ফিরিয়ে দিতে চান। জনমত জরিপে বলা হচ্ছে, নির্বাচনে তার ফ্রীডম পার্টি ২৭ টি আসন জিততে পারে। এর মানে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী মার্ক রাটের উদারপন্থী দলের সঙ্গে তাদের হাড্ডা-হাড্ডি লড়াই হবে।

নতুন ফরাসী বিপ্লব?

ফ্রান্সের রাজনীতি পাল্টে দিচ্ছে মারিন ল পেনের ন্যাশনাল ফ্রন্ট। মে মাসের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে অনায়াসে দ্বিতীয় রাউন্ডে চলে যাবেন বলে মনে করা হচ্ছে। গত ডিসেম্বরের নির্বাচনে তার ন্যাশনাল ফ্রন্ট্ ২৭ শতাংশ ভোট পেয়েছে। যদিও কোন আঞ্চলিক সরকারের নিয়ন্ত্রণই তারা পায়নি।

এর আগে ন্যাশনাল ফ্রন্টের বিজয় ঠেকাতে বামপন্থী আর ডানপন্থী দলগুলো এক কাট্টা হয়েছিল। এবারও তারা সেই কৌশল নিতে পারে।

মারিন ল পেন যুক্তরাষ্ট্রে ডোনাল্ড ট্রাম্পের জয়ের পর টুইট করেছেন, এক নতুন বিশ্ব তৈরি হচ্ছে, বিশ্বে ক্ষমতার ভারসাম্য পাল্টে যাচ্ছে। ফ্রান্সে তার দল একই রকম বিপ্লবের স্বপ্ন দেখছে।

তাদের এই স্বপ্ন একেবারে অবাস্তব নয়। কারণ প্রেসিডেন্ট ফ্রাঁসোয়া অল্যাঁদের সমর্থন এখন একেবারে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে এসেছে।

ছবির কপিরাইট Liberation
Image caption ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিজয়ের পর ফ্রান্সের উদারপন্থী সংবাদপত্র লিবারেশন এর প্রচ্ছদ

জার্মান জাতীয়তাবাদ:

জার্মানিতে পার্লামেন্টারি নির্বাচন সামনের বছরের সেপ্টেম্বরে। সেখানেও উত্থান ঘটছে উগ্র জাতীয়তাবাদী দলগুলোর। দ্য ন্যাশনালিস্ট অল্টারনেটিভ ফর জার্মানি (এএফডি) এরকম একটি দল। আঞ্চলিক নির্বাচনে তারা ইতোমধ্যে এঙ্গেলা মেরকেলের দলের বিরুদ্ধে সাফল্য দেখিয়েছে।

এঙ্গেলা মেরকেল যেভাবে অভিবাসী এবং রাজনৈতিক আশ্রয়প্রার্থীদের জন্য তার দেশের সীমান্ত খুলে দিয়েছিলেন, তা অনেকে পছন্দ করেনি। সেই ক্ষোভকে কাজে লাগাচ্ছে এই দল।

তারা পার্লামেন্ট নির্বাচনে অন্তত দশ শতাংশ আসন জিতবে বলে মনে করা হচ্ছে। ইসলাম বিরোধী এবং অভিবাসন বিরোধী কথা বলে তারা দ্রুত জনপ্রিয় হয়ে উঠছে।