রোহিঙ্গাদের আশ্রয়: জাতীয় স্বার্থ নাকি মানবিক বিবেচনা?

ছবির কপিরাইট বিবিসি
Image caption মিয়ানমার সহিংসতা থেকে কক্সবাজারের টেকনাফে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গারা

মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে রোহিঙ্গা মুসলিম জনগোষ্ঠির ওপর নির্যাতনের প্রেক্ষিতে অনেক রোহিঙ্গা সীমান্ত পাড়ি দিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নিচ্ছেন।

যদিও বাংলাদেশ সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে সীমান্ত খুলে দেয়ার বিরুদ্ধে, তবে নানা উপায়ে শরণার্থীরা পৌছুচ্ছেন বাংলাদেশে। তাদের আশ্রয় দেয়া নিয়ে বাংলাদেশে বিতর্কও রয়েছে।

সরকারসহ অনেকেই তাদের জন্য সীমান্ত খোলার বিপক্ষে। কিন্তু অনেকেই মানবিক দিক বিবেচনা করে আশ্রয় দেয়ার পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন, এক্ষেত্রে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে বাংলাদেশি শরণার্থীদের ভারতে আশ্রয় নেয়ার উদাহরণও টানছেন কেউ কেউ।

বাংলাদেশে রোহিঙ্গা শরণার্থীদের উপস্থিতি নিয়ে বিতর্ক নতুন কিছু নয়।

বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর গত ৪৫ বছরে বিভিন্ন সময়ে বার্মা থেকে রোহিঙ্গা শরণার্থীরা বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছেন, নিবন্ধিত এবং অনিবন্ধিত মিলিয়ে সরকারি হিসেবে এই সংখ্যা প্রায় ৫ লাখ।

এবার প্রায় মাস দেড়েক আগে থেকে যখন মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্য থেকে রোহিঙ্গারা নির্যাতনের শিকার হয়ে বাংলাদেশে প্রবেশের চেষ্টা শুরু করেন, তখন থেকেই বাংলাদেশ শক্ত অবস্থান নেয় সীমান্ত দিয়ে রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশে প্রবেশ করতে না দেয়ার।

"সীমান্ত খুলে দেয়ার তো প্রশ্নই ওঠে না। তাহলেতো অনেকেই চলে আসবেন। আমরা সবসময়ই বলে এসেছি যে এরা মায়ানমারের অধিবাসী এবং গত তিন-চারশো বছরের ইতিহাসেও দেখা যায় তারা তখন থেকেই ঐ দেশে বসবাস করছেন"। বিবিসিকে দেয়া সাক্ষাতকারে বলেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা এইচ টি ইমাম।

মি. ইমাম বলছেন, রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানে বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক এবং দ্বিপাক্ষিকভাবে মিয়ানমারের ওপর চাপ সৃষ্টি করার দিকেই আগ্রহী। রোহিঙ্গাদের ঢুকতে না দেয়ার বিষয়ে সরকার যে অবস্থান নিয়েছে তার সমর্থনও আছে অনেকের মধ্যে।

ছবির কপিরাইট বিবিসি
Image caption "সীমান্ত খুলে দেয়ার প্রশ্নই আসে না" - প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা এইচ টি ইমাম

যদিও এর বিপরীত মতও আছে। এরই মধ্যে রোহিঙ্গা শরণার্থীদের জন্য সীমান্ত খুলে দেয়ার আহ্বান জানিয়েছেন বিরোধী দল বিএনপির চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়া।

এর বাইরে ধর্মভিত্তিক কয়েকটি সংগঠনও সংখ্যালঘু এই মুসলিম জনগোষ্ঠিকে বাংলাদেশে আশ্রয় দেয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।

মানবিক কারণে রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দেয়ার পক্ষে সাধারণ মানুষদের অনেকেও মতামত দিচ্ছেন।

বাংলাদেশের নিজস্ব ইতিহাস

নির্যাতনের শিকার রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দেয়ার বিষয়ে উদাহরণ হিসেবে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় ভারতে বাংলাদেশি শরণার্থীদের আশ্রয় নেয়ার বিষয়টি তুলে ধরছেন। এই উদাহরণটি পত্র-পত্রিকার কিছু কলামেও যেমন উঠে এসেছে, তেমনি ফেসবুকের মত সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও এটি তুলে ধরছেন অনেকে।

যদিও এই দুটো ঘটনাকে মেলানোর বিপক্ষে বিশ্লেষকরা।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক এম শাহিদুজ্জামান বলছিলেন, বিষয়টিকে ভূ-রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকেও দেখতে হবে।

"সেটা ছিল ৪০ বছর আগে এবং তখন আন্তর্জাতিক ব্যবস্থায় শরণার্থী গ্রহণ করার সংস্কৃতি মোটেও বাধাগ্রস্ত হতো না। অন্যদিকে একাত্তরে ভারতের জাতীয় স্বার্থও সুস্পষ্টভাবে অনুপ্রাণিত করেছে শরণার্থী গ্রহণ করতে এবং পরে তার সুফল তারা পেয়েছে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে ব্যাপারটি অন্যরকম"। বলেন অধ্যাপক শাহিদুজ্জামান।

দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক নির্মলাংশু মুখার্জি বলছেন, ১৯৭১ সালে লাখ-লাখ বাংলাদেশি শরণার্থীর ভারতে আশ্রয় নেয়া নিয়ে কিছু ব্যতিক্রম ছাড়া ব্যাপক জনসমর্থন ছিল। কারণ, নির্যাতনের হাত থেকে পালিয়ে আসা এই শরণার্থীদের প্রতি মানবিক দৃষ্টিভঙ্গির পাশাপাশি এর সাথে যুক্ত ছিল বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ।

ছবির কপিরাইট গেটি ইমেজেস
Image caption ঢাকায় রোহিঙ্গাদের ওপর নির্যাতনের প্রতিবাদে সমাবেশ

"মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কে ভারতবর্ষে খুবই সাপোর্ট ছিল, কারণ ভারত রাষ্ট্র তখন মুক্তিযুদ্ধে জড়িয়ে পড়েছিল। মুক্তিযুদ্ধের সাথে শরণার্থীদের ব্যাপারটা যুক্ত ছিল বলে সাধারণত: সিভিল সোসাইটি থেকে যে ধরনের নেগেটিভ রিঅ্যাকশন হয়ে থাকে তেমনটা হয়নি, বরং সমর্থনই ছিল"।

অধ্যাপক মুখার্জি বলছেন, এই বিপুল পরিমাণ শরণার্থীদের কারণে ভারতের অর্থনীতিতে যে চাপ সৃষ্টি হচ্ছিল, সেটিও পরবর্তীতে সরকারের পক্ষ থেকে সরাসরি মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেয়ার একটি কারণ হিসেবে উপস্থাপিত হয়েছে।

যুদ্ধে বাংলাদেশের বিজয়ের পর শরণার্থীরা ফিরে যান সদ্যস্বাধীন বাংলাদেশে।

রোহিঙ্গা শরণার্থীরা বাংলাদেশ থেকে আবার নিজ দেশে ফিরে যেতে পারবেন এমন নিশ্চয়তা যেমন নেই, তেমনি পূর্ব-অভিজ্ঞতা থেকে এমন সম্ভাবনাও খুব বেশি দেখছে না বাংলাদেশের কর্তৃপক্ষ।

রোহিঙ্গা নির্মুলের আশঙ্কা

রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দেয়ার আহ্বান জানালেও জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক সংস্থা ইউএনএইচসিআর সতর্ক মনোভাব নিয়েই বিষয়টি দেখছেন।

"বাংলাদেশে সীমান্ত খোলার কথা বলা খুবই কঠিন। তাহলে সেটি রোহিঙ্গাদের এখানে আসতে আরো উৎসাহিত করবে। এতে মিয়ানমার সরকারের রোহিঙ্গা মুসলমানদের নির্মূল করার যে লক্ষ্য সেটি অর্জনে সহায়তা করবে"। বলেন কক্সবাজারে ইউএনইচসিআরের কর্মকর্তা জন ম্যাককিসিক।

ছবির কপিরাইট বিবিসি
Image caption জন ম্যাককিসিক, কক্সবাজারে ইউএনএইচসিআর অফিসের প্রধান কর্মকর্তা

যদিও মানবাধিকার সংস্থাগুলো বারবার বাংলাদেশের প্রতি আহ্বান জানিয়ে আসছে।

এবিষয়ে একাধিকবার বিবৃতি দিয়েছে নিউইয়র্কভিত্তিক মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ।

সংস্থাটির দক্ষিণ এশিয়া পরিচালক মীনাক্ষী গাঙ্গুলি বলছেন, রোহিঙ্গা সমস্যার সমাধান যে মিয়ানমারকেই করতে হবে তারাও সেটা স্বীকার করেন। তবে নির্যাতিতদের রক্ষার জন্য এখন বিষয়টিকে রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে না দেখার জন্য তারা আহ্বান জানাচ্ছেন।

তিনি বলেন, "১৫ থেকে ২৫ বছর হলে নারীরা সেখানে রেপ হচ্ছে। এই অবস্থায় তো পলিটিক্স খেলা যায় না। সরকারকে দেখতে হবে মানুষের কথা"।

অধ্যাপক শাহিদুজ্জামানের মতে, রোহিঙ্গা এবং বাংলাদেশ উভয়ের দীর্ঘমেয়াদী স্বার্থে সীমান্তে কঠোর অবস্থান রাখা উচিত।

"এটা মিয়ানমার সেনাবাহিনীর একটা ফাঁদ। প্রথমে তারা কিছু লোক ঢোকাবে এরপর সীমান্ত খুলে দেয়া হলে এটি বিশাল এক্সোডাসে পরিণত হবে। বর্তমান আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে মিয়ানমার বাকি রোহিঙ্গাদের পুশ করবে"।

অধ্যাপক শাহিদুজ্জামান বলছেন, ইউরোপে সিরীয় শরণার্থী সংকট এবং যুক্তরাষ্ট্রে সরকার পরিবর্তনের ফলে পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে আন্তর্জাতিক মহলও রোহিঙ্গা ইস্যুতে খুব বেশি এগিয়ে আসবে এমন সম্ভাবনাও কম।

ছবির কপিরাইট গেটি ইমেজেস
Image caption কুয়ালালামপুরে মিয়ানমার দূতাবাসের সামনে রোহিঙ্গাদের বিক্ষোভ

প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা এইচ টি ইমাম বলছেন, সীমান্ত খুলে না দেয়ার বিষয়টিকে অমানবিক হিসেবে দেখার সুযোগ নেই, কারণ এর আগেও যারা এসেছে তারাও দীর্ঘদিন যাবত বাংলাদেশে অবস্থান করছে।

শরণার্থী সংকট সর্বাগ্রে একটি মানবিক সংকট এবং এখানে মানবিকতাই যে প্রাধান্য পাওয়া উচিত এনিয়ে দ্বিমত হয়তো কেউ করবে না। কিন্তু মানবিকতার বাইরে কূটনীতি এবং রাজনীতিও যে সবসময়ই শরণার্থীদের ভাগ্য নিয়ন্ত্রণ করেছে সেটিও সত্য।

অধ্যাপক নির্মলাংশু মুখার্জি বলছিলেন, বিষয়টি কখনও কখনও বেদনাদায়ক হলেও এটিই বাস্তবতা।

"রাজনীতিতে সুবিধা হয় যেমন বাংলাদেশ যুদ্ধের সময় হয়েছিল ভারতবর্ষের, তাহলে শরণার্থী বড় সমস্যা নয়। কিন্তু রাষ্ট্রের যদি কোন কায়েমী স্বার্থ সিদ্ধ না হয় তাহলে শরণার্থীরা অবাঞ্ছিত। এটা একটা অমানবিক দৃষ্টিভঙ্গি, কিন্তু এই দৃষ্টিভঙ্গিতেই পৃথিবী চলছে"।