ইতিহাসের সাক্ষী
আপনার ডিভাইস মিডিয়া প্লেব্যাক সমর্থন করে না

চীনে মাও জেদং-এর সাংস্কৃতিক বিপ্লবের স্মৃতি

১৯৬৬ সালে চীনে মাও জেদং শুরু করেছিলেন সাংস্কৃতিক বিপ্লব। এতে তার সহযোগী ছিলেন লক্ষ লক্ষ তরুণ - যাদের নিয়ে গড়ে উঠেছিল রেড গার্ড নামের এক বাহিনী।

তারই এক সদস্য বিবিসির লুসি বার্নসকে বলেছেন সেই বিপ্লবের সময় তারা কি করেছিলেন ।

তিনি বলছিলেন, "জন্ম থেকেই আমাদের শেখানো হয়েছে যে তিনি হচ্ছেন একজন মহান নেতা। আমরা মনে করতাম, তিনি একজন ঈশ্বর।"

সাংস্কৃতিক বিপ্লব যখন শুরু হয় তখন সো ইয়ংএর তখন বয়েস ছিল মাত্র ২০। চেয়ারম্যান মাও এর ব্যাপারে তিনি ছিলেন সম্পূর্ণ নিবেদিতপ্রাণ।

"তিনি পুরো দেশকে এবং দেশের মানুষকে মুক্ত করেছেন। তিনি গরীব মানুষকে উদ্ধার করেছেন। তাই তিনি আমাকে যা-ই করতে বলবেন, তার জন্য আমি আমার সমস্ত শক্তি এমনকি আমার জীবন দিয়ে দিতে রাজী ছিলাম।"

মাও্র সিদ্ধান্ত নিলেন তার পক্ষে তরুণদের সমবেত করতে। কমিউনিস্ট পার্টিকে পরিশুদ্ধ করতে তার এই বিরাট অভিযানে তারাই হবে তার আসল শক্তি। মাও তাদের নাম দিলেন রেড গার্ড।

"এটা হবে এক নতুন বিপ্লব - এক সাংস্কৃতিক বিপ্লব। যে বিপ্লব ঘটবে মানুষের চিন্তায়। এর লক্ষ্য হচ্ছে মানুষের মনে যে সব পুরোনো ধ্যানধারণা আর অভ্যাস ছিল - সেগুলো সম্পূর্ণ উচ্ছেদ করা। মাও বিশ্বাস করতেন, এগুলো কমিউনিজমের পথে অগ্রযাত্রাকে ব্যাহত করতে পারে।"

ছবির কপিরাইট JT Vintage / Glasshouse Images
Image caption তিয়ান আন মেন স্কোয়ারে লাল বই হাতে রেড গার্ডরা

সো বলছিলেন, "আমি এতে যোগ দিলাম - কারণ এটা একটা গৌরবজনক ব্যাপার ছিল। শুধু মাত্র ভালো শ্রেণীর লোকেরাই এতে যোগ দিতে পারতো। এই 'গুড ক্লাস' মানে হলো শ্রমিক, কৃষক, ও বিপ্লবীরা। আর খারাপ শ্রেণী মানে হলো - বুর্জোয়া, জমিদার বা বিপ্লব বিরোধীরা।"

আনুষ্ঠানিকভাবে রেড গার্ড তখনো প্রতিষ্ঠিত হয় নি। তার আগেই বেজিংএর ছাত্রদের কাছে এটা হাজির হলো কমিউনিস্ট বিপ্লবের প্রতি তাদের বিশ্বস্ততা প্রমাণের একটি সুযোগ হিসেবে।

খুব শিগগীরই সারা দেশে এই আন্দোলন ছড়িয়ে পড়লো। ছাত্ররা এমনকি স্কুলের বাচ্চারাও হাতে লাল রঙের ব্যান্ড পরতে শুরু করলো তাদের আনুগত্য প্রকাশ করার জন্য। তাদের বেজিং-এ আমন্ত্রণও জানানো হলো স্বয়ং মাওয়ের সামনে বিশাল সমাবেশে অংশ নেবার জন্য।

"আমরা অনেক আগে ঘুম থেকে উঠলাম। বাইরে তখনো অন্ধকার। আমরা বড় রাস্তার পাশে একটা গলিতে ঢুকলাম। সেখানে আমরা বাকি রাতটা অপেক্ষা করলাম। কারণ সকালে আমরা তিয়ান-আন-মেন স্কোয়ারের ভেতর দিয়ে পদযাত্রা করে যাবো - আমাদের মহান নেতাকে দেখার জন্য।"

"মাও সেখানে ছিলেন তার আরো কয়েকজন কমরেডকে নিয়ে। সারা জীবন আপনি এই মহান নেতার জন্য দেশের জন্য কাজ করেছেন। আর আজ সেই মহান নেতা আমাদের স্বাগত জানাচ্ছেন, আমাদের কাছে দেখা দিচ্ছেন।"

কিন্তু তাদের বিপ্লবী উদ্দীপনা প্রদর্শন ছাড়া রেড গার্ডএর কাজটা ঠিক কি হবে তা কিন্তু তখনও স্পষ্ট ছিল না।

"আমরা কি করবো - এ ব্যাপারে কোন স্পষ্ট নির্দেশনা ছিল না। কিন্তু আমরা নিজে নিজেই ব্যাপারটা বুঝতে পারলাম। কারণ এতদিন কমিউনিস্ট চীনে থাকার পর এটা স্পষ্টই বোঝা যাচ্ছিল যে তারা পুরোনো সংস্কৃতিকে, কনফুসিয়াসের মতাদর্শকে ধ্বংস করে দেবার কথা বলছে । তাই সব রেডগার্ড ছাত্ররাই পার্টির প্রতি তাদের আনুগত্য প্রকাশ করার জন্য ওই ক্ষেত্রেই লক্ষ্যবস্তু ঠিক করলো।"

তাদের ভাষায় যা-ই পশ্চাৎপদ, বা ক্ষয়িষ্ণু - তার বিরুদ্ধেই রেড গার্ডরা এক সন্ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করলো। তারা লোকের বাড়িঘরে ঢুকে আসবাবপত্র ভেঙে দিতে লাগলো। যেসব প্রসাধনী বিক্রি করে এমন দোকানও ভেঙে দিতে লাগলো তারা। করো চুল বেশি লম্বা মনে হলে তাকে ধরে চুল কেটে দেয়া হতে লাগলো।

ছবির কপিরাইট JEAN VINCENT
Image caption রেড গার্ডের সদস্যরা

চারটি পুরোনো জিনিসের বিরুদ্ধে শুরু হলো তাদের অভিযান । পুরোনো অভ্যাস, পুরোনো ধ্যান ধারণা। পুরোনো ঐতিহ্য আর পুরোনো সংস্কৃতি। পুরোনো যে কোন কিছুই আক্রান্ত হলো।

আপনি যদি পুরোনো আমলের কোন সামগ্রী পান - যে কোন আসবাব, আপনার যদি মনে হয় যে এটা আধুনিক নয়- আপনি ধরে নিলেন যে সেটা পুরোনো।যদি এমন কোন কাপড় চোপড়ও পাওয়া যায় - যা খুব বেশি রকমের সুন্দর - বেশি রংচঙে - আপনি বলে দিলেন, এটাও পুরোনো। এ ক্ষেত্রে রেডগার্ডের তরুণরা যা বলবে তাই।

সবচেয়ে বড় লক্ষ্য বস্তু ছিলেন ভূস্বামীরা। এরা ছিলেন এক সময়কার ধনী এলিট।

"কিন্তু সাংস্কৃতিক বিপ্লবের সময়টায় এই ভূস্বামীরা আর ধনী ছিলেন না। তারা ধনী ছিলেন ১৯৪৯ সালের আগে।কিন্তু আমরা ভাবলাম, তাদের বাড়িতে গেলে পুরোনো জিনিস পাওয়া যাবে। আমার মনে আছে, একটি পরিবার আতংকিত হয়ে পড়েছিল। তারা বললো - তোমরা যা নিতে চাও, নিয়ে যাও। কোন বাধাই দেয় নি তারা।"

ছবির কপিরাইট Universal History Archive
Image caption রেড গার্ডদের সমাবেশ

সু-র মতো রেডগার্ডদের জন্য এই আন্দোলন ছিল খুবই উত্তেজনাকর। হঠাৎ তারা উপলব্ধি করলো তারাই যেন দেশ চালাচ্ছে। তারা দেশের সব জায়গায় যেতে পারছে। তারা যা বলছে সবাই তা করতে বাধ্য হচ্ছে।

যারা তাদের কথা শুনছিল না। তাদের জন্য প্রকাশ্যে অপমান করা হতে লাগলো। তাদের ভুল ধরিয়ে দেয়া হতে লাগলো। পুরো চীন জুড়ে রেডগার্ডরা এই কর্মসূচি চালু করলো - এর শিকার হলেন স্থানীয় কর্মকর্তারা এমন কি ছাত্ররাও। তাদের প্রকাশ্যে তিরস্কার করা হতো, কখনো কখনো শারীরিকভাবেও লাঞ্ছিত করা হতো।

"আমার কাজ ছিল শুধু সেখানে বসে থাকা এবং নানা রকমের শ্লোগান দেয়া। তবে কখনোই তা শারীরিক লাঞ্ছনার পর্যায়ে যায় নি।"

এই রকম গণ অপমান কর্মসূচির একটা বড় লক্ষ্য ছিল শিক্ষকরা। সারা চীন জুড়ে ক্লাসরুম আর লেকচার হলে শিক্ষকদের গালাগালি এবং অপমান করতো ছাত্ররা। তাদের পরিয়ে দেয়া হতো গাধার টুপি, বা তাদের ভুল স্বীকারের চিহ্ন । কাউকে কাউকে কলমের কালি খাইয়ে দেয়া হতো, বা মাথার চুল কামিয়ে দেয়া হতো। কারো কারো গায়ে থুথু ছিটানো হতো। অনেককে আবার মারধরও করা হতো। কিছু ক্ষেত্রে মেরে ফেলার ঘটনাও ঘটেছে।

"অল্প কিছু ছাত্র ছিল - যারা সত্যি খারাপ লোক ছিল। আমি তাদেরকে দেখেছি। এদের কেউ কেউ খুব পড়াশোনা করতো, কিন্তু হয়তো শিক্ষকের সমালোচনার শিকার হয়েছিল, তারা সাংস্কৃতিক বিপ্লবের সময় সেটার প্রতিশোধ নিয়েছে। "

এদের কথায়, শিক্ষকরা ছিল বুর্জোয়া বুদ্ধিজীবী তাই তাদের বিশ্বাস করা যাবে না।

"আমার একজন মহিলা শিক্ষক ছিলেন তাকে আমি খুব ভালোবাসতাম। তিনি খুব ভালো ছিলেন। তিনি সুন্দর সুন্দর পোশাক পরতেন। তার চেহারার যত্ন নিতেন। একজন তরুণ তার বেডরুমে ঢুকলো। তার সঙ্গে আরো ছেলেমেয়ে ছিল। একটি মেয়ে তার চুল কেটে দিল। আমি যখন সেখানে গেছি তখন অনেক দেরি হয়ে গেছে। তার চুল তখন কেটে দেয়া হয়েছে।

তাকে এভাবে অপমান করা হলো - কিন্তু আমি কিছুই করতে পারলাম না। তাকে উদ্ধার করতে পারলাম না। সে যে কি লজ্জা, কি বলবো। "

"১৯৬৭ সালের শেষের দিকে আমি ভাবতে শুরু করলাম যে এটা আমরা কি করছি। আমি উপলব্ধি করলাম যে পরিস্থিতি মাও-এর নিয়ন্ত্রণে নেই। সাংস্কৃতিক বিপ্লব নিয়ন্ত্রণ করার কোন উপায়ও তার হাতে নেই। "

ছবির কপিরাইট Krause, Johansen
Image caption মাও জে দং, তিয়ান আনমেন স্কোয়ারে রেডগার্ডদের সমাবেশে

মাও সাংস্কৃতিক বিপ্লব শুরু করেছিলেন পার্টির শোধনের জন্য। কিন্তু রেড গার্ডকে নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে পড়লো। যে কেউ তাদের শিকার হতে পারতো।

"আমার মনে হলো, যদি কোন ভাবে আমার বাবার পারিবারিক পরিচয় প্রকাশ পায় - তাহলে আমার নিজের জীবনের কি হবে। আমাদের ভাগ্য যে আমরা দক্ষিণ চীনের বাসিন্দা ছিলাম। তাই আমাদের সামনে একটা বিকল্প ছিল : পালিয়ে হংকং চলে যাওয়া।"

সু ১৯৬৮ সালে হংকং পালিয়ে গেলেন। সেখানে তার সাথে কিচু আমেরিকান শিক্ষাবিদের পরিচয় হলো। তারা রেডগার্ডের সদস্য হিসেবে সুর অভিজ্ঞকতা নিয়ে একটি বই বের করলেন। সু ভবিষ্যত পরিকল্পনার ব্যাপারেও সাহায্য করলেন তারা।

"আমি সমাজ বিজ্ঞান পড়লাম , তার পর পলিটিকাল সায়েন্স পড়তে বার্কলি বিশ্ব বিদ্যালয়ে গেলাম। এখানে আমি আমার পরিবার ছেলেমেয়ে নাতিনাতনী নিয়ে বসবাস করছি। এখানে আমি তারা কেরিয়ার গড়েছি, ব্যবসা শুরু করেছি। আমার অর্ধনে এখন ১০০র বেশি লোক কাজ করে।"

সু এখন থাকেন সান প্রান্সিসকোর কাছে। এখানে তিনি একটি সফল কম্পিউটিং কোম্পানি চালান। কিন্তু এখনো তার মনে পগে রেড গার্ড হিসেবে তার অতীত জীবনের কথা।

"আমার বয়েস এখন ৭০। সেই রেড গার্ড প্রজন্মের বয়েসও এখন ৭০এর কোঠায়। আমি আশা করি যে তারা তাদের কৃতকর্মের কথা নতুন করে ভাববে, অনুশোচনা বোধ করবে। যাতে এই সাংস্কৃতিক বিপ্লেবর মতো মানবিক ট্রাজেডি আর কখনো না ঘটে।"

সম্পর্কিত বিষয়