দিল্লির মেয়ে নির্ভয়ার ঘটনা আমাকে ভিতু করে দিয়েছে

দেবশ্রুতি রায়চৌধুরী ছবির কপিরাইট দেবশ্রুতি রায়চৌধুরী

আমি খুব সাহসী ছিলাম। আমার মা বলতেন ''তোর এই আবগদা সাহসই একদিন তোর কাল হবে।''

আবগদা শব্দটার মানে আমার ঠিক জানা ছিল না, মাকে জিজ্ঞেস করলে বলতেন, মাথা মুণ্ডু নেই, কোনও লজিক নেই এমন যা কিছু তাই নাকি আবগদা।

উত্তরটা আমার খুব যে পছন্দ হতো এমন নয়, কিন্তু শব্দটা ভারী পছন্দের হয়ে উঠেছিল অচিরেই। তা আমি আগে খুবই সাহসী ছিলাম। রাস্তাঘাটে অসভ্যতা করে এমন যে কোনও লোককে কলার ধরে মারতে আমার এক সেকেন্ডও লাগত না।

তখন ক্লাস সেভেন। শ্যামবাজারের উত্তরা সিনেমা থেকে কী একটা ছবি দেখে বেরচ্ছি, সঙ্গে যথারীতি মা।

ভিড়ের মধ্যে পেছন থেকে কেউ শরীরে হাত চালাল, সঙ্গে সঙ্গে ফিরে তাকালাম, দাঁত বের করে হাসছিল যে মধ্য কুড়ির ছেলেটা সে আমার থেকে হাত দেড়েক লম্বা প্রায়। তো কী, তার পেটের কাছে শার্টের কাপড়টা চামড়া-সহ খিমচে ধরেছিলাম এমন জোরে সে চিৎকার করে উঠেছিল, হইচই শুরু হয়ে গিয়েছিল চারদিকে।

মা কোনও মতে আমাকে টানতে টানতে বার করে এনেছিলেন ভিড় থেকে। ''তুই কী রে! ওরা কতজন থাকে জানিস? যদি আরও বড় কোনও অসভ্যতা করত?'' তাই বলে ছেড়ে দেব? এই ছিল ১৩ বছরের আমার উত্তর।

এর পরের বড় ঘটনা ১৮-তে।

সল্ট লেকে নাচের ক্লাস থেকে সন্ধ্যেবেলায় বেড়াতে গিয়ে সাইকেল নিয়ে পাশ দিয়ে হুশ করে বেরিয়ে যাওয়া ছেলেটার আচমকা আঘাতে 'উফ' বলে রাস্তায় বসে পড়েই তার পেছনে দৌড়েছি, অন্য বন্ধু আর রাস্তার লোকের সাহায্যে তাকে ধরে পুলিশে দিয়েছি। পুলিশের জেরা সামলেছি।

আমাকে নিয়ে থানায় যাওয়ার সময় মা বলেছেন ''তোর এই আবগদা সাহস তোকে আরও কত ঝামেলায় ফেলে আমি দেখতে চাই।''

আরো পড়তে পারেন: পুরুষতান্ত্রিক মনোভাব নিয়ে দিয়া চক্রবর্তীর কলাম

পরবর্তীকালে কর্মক্ষেত্রে মাতাল পুরুষ কর্মীদের অসভ্যতা, অফিসে বসে ভুলভাল সাইট দেখা বসের কুরুচি নিয়ে খোলা গলায় প্রতিবাদ জানিয়েছি।

অন্য সহকর্মীরা বলেছে, এ মেয়ে নিজেকে কী ভাবে কে জানে! কিংবা সব বিষয়ে ওর বাড়াবাড়ি করাটা স্বভাব।

আর তার পর তো একটা ঘটনার প্রতিবাদ করতে গিয়ে কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে সাড়া না পেয়ে রিজাইন অবধি করেছি সেকালের একটা খুব ভাল চাকরি থেকে।

মা বলেছেন, ''এই আবগদা সাহসটা তোর কাল হবে আমি আগেই বলেছিলাম।''

কিন্তু আজকাল আমি 'লাইফ অফ পাই' দেখতেও ভয় পাই।

ছবিটায় বাঘটাঘ আছে বলে নয়, দিল্লির মেয়ে নির্ভয়া সেই রাতে এই ছবিটা দেখেই তার বন্ধুর সঙ্গে সেই বাসটায় উঠেছিল যে বাসের চালক আর তার সঙ্গীরা তাকে গনধর্ষণ করে তার শরীর এফোঁড় ওফোঁড় করে ঢুকিয়ে দিয়েছিল লোহার রড।

লাইফ অফ পাই বইটা আমার খুব প্রিয়, সিনেমা হওয়ার অনেক আগেই পড়ে ফেলেছিলাম। কিন্তু সিনেমাটা কিছুতেই শান্তি মতো দেখে উঠতে পারিনি। একটা অজানা ভয়ে শরীর শিরশির করে উঠেছে।

ঠিক একই ভাবে বারাসাত, কামদুনি, পার্ক স্ট্রিট এবং আমার শহর, রাজ্য, দেশের আরও অনেক অনেক ঘটনা আমাকে ভিতু করে দিয়েছে আরও। লোকলজ্জার ভয় আমার কোনদিন ছিল না, এখনও নেই। কিন্তু এই ভয়াবহ অত্যাচার আর মৃত্যুর আতঙ্ক আমাকে গ্রাস করেছে আস্তে আস্তে।

ছবির কপিরাইট AFP
Image caption দিল্লিতে নির্ভয়া ধর্ষণ আর হত্যার পর প্রতিবাদ।

আমি বুঝে গিয়েছি, আমি আসলে মোটেও সাহসী নই। ঠিক কতটা দম থাকলে এই অসহনীয় শারীরিক কষ্টকে তুড়ি মারা যায় সেটা বুঝে উঠতে পারিনি কিছুতেই।

আর সেই সঙ্গে এটাও বুঝেছি কেন এরা আজকাল মেয়েদের শরীরটাকে কষ্ট দিয়েই থেমে থাকে না শুধু।

আমার জেন্ডার স্টাডিজ নিয়ে সামান্য যা লেখাপড়া তা বলে— মেয়েদের শারীরিক অত্যাচার করার পেছনে পুরুষের নারীদেহ সম্ভোগের তৃপ্তির পাশাপাশি তাদের ভয় দেখিয়ে দমিয়ে রাখার শ্লাঘাটা সাধারণত খুব বড় একটা ইনসেন্টিভের কাজ করে।

মেয়েদের ক্ষেত্রে এই ভয়ের প্রকোপ বহুমুখী— লোকলজ্জার ভয়ে, পরিবারের সম্মানের ভয়ে, নষ্ট হয়ে যাওয়ার তকমা লেগে যাওয়ার ভয়ে মেয়েরা চুপ করে থাকে, বা বলা ভাল, থাকত।

কিন্তু এখন ধর্ষণের পরেও তারা পুলিশের কাছে গিয়ে নিজে হাতে রিপোর্ট লেখায়, টিভি ক্যামেরার সামনে মুখ ঢেকে রাখার প্রয়োজনও মনে করে না অনেক সময়ে। ভয় তো পায়ই না, উল্টে যেন ভয় দেখায় সেই সব বীরপুঙ্গবদের।

অগত্যা মেরেই ফেলো এদের, কিংবা অ্যাসিডে পুড়িয়ে দাও এদের শরীর। জ্যান্ত লাশ হয়ে ঘুরে বেড়াক। স্রেফ মলেস্টেশন বা রেপ-এ কাজ না হলে একেবারে থার্ড ডিগ্রির দাওয়াই দাও এদের।

ছবির কপিরাইট Reuters
Image caption প্রতিরোধ: গণধর্ষণের বিরুদ্ধে গৌহাটিতে অসমিয়া সাংবাদিকদের প্রতিবাদ।

ফিয়ার ফ্যাক্টর না থাকলে পুরুষতন্ত্রের টিঁকে থাকাই যে মুশকিল।

আমি সব বুঝি তাও আমার ভয় করে— আমার মরতে ভয় করে, অ্যাসিডে পুড়তে ভয় করে। আমার শরীর ফুঁড়ে ঢুকে যাচ্ছে লোহার রড ভাবলে আমি কেঁপে কেঁপে উঠি।

আমার এত দিনকার সযত্নে লালিত আবগদা সাহস ফেল মেরে যায়।

আর আমার মা আমার মাথায় হাত বুলোতে বুলোতে বলেন, ''ভয় পায় না মা, ভয় পেলে ওই আলপ্পেলেগুলো আরও পেয়ে বসবে যে।''

আলপ্পেলে শব্দটা যে কী ভাল!

সম্পর্কিত বিষয়