ইতিহাসের সাক্ষী
আপনার ডিভাইস মিডিয়া প্লেব্যাক সমর্থন করে না

১৯৯৬ সালের ঐতিহাসিক গঙ্গা চুক্তি স্বাক্ষর কীভাবে হয়েছিল?

ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে গঙ্গা নদীর জল ভাগাভাগি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছিল ঠিক কুড়ি বছর আগে।

১৯৯৬ সালের ১২ ডিসেম্বর দিল্লিতে ভারতের প্রধানমন্ত্রী এইচ ডি দেবেগৗড়া ও বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এই ঐতিহাসিক চুক্তিতে স্বাক্ষর করেন।

দুই প্রধানমন্ত্রীই তখন সবেমাত্র প্রথমবার দেশের ক্ষমতায় এসেছেন - তারপরও বহু বছরের এই অমীমাংসিত বিষয়টি অসম্ভব দ্রুততার সঙ্গে নিষ্পত্তি হয়েছিল তাদের আমলেই।

কীভাবে নেওয়া হয়েছিল সেই কূটনৈতিক প্রস্তুতি, প্রধানমন্ত্রী দেবেগৌড়াই বা কীভাবে পড়াশুনো শুরু করেছিলেন গঙ্গার সমস্যা নিয়ে? চুক্তি সম্পাদনে কী ভূমিকা ছিল পশ্চিমবঙ্গের তদানীন্তন মুখ্যমন্ত্রী জ্যোতি বসুর?

গঙ্গা-চুক্তির বিশতম বর্ষপূর্তির প্রাক্কালে আমরা ফিরে তাকিয়েছি সেই ঘটনাক্রমের দিকেই।

দুদেশেই তখন নবীন সরকার

১৯৭১য়ে স্বাধীন বাংলাদেশের জন্মলগ্ন থেকেই গঙ্গার জল নিয়ে প্রতিবেশী ভারতের সঙ্গে তাদের মনোমালিন্য চলে আসছিল, সীমান্তের কাছে ভারতের ফারাক্কা বাঁধ তাকে শুধু আরও তিক্ত করে তোলে।

১৯৯৬ সালের জুন মাসে একই সঙ্গে দুটো দেশেই ক্ষমতার পালাবদল হল - দিল্লিতে এল একটি যুক্তফ্রন্ট বা তথাকথিত তৃতীয় শক্তির সরকার, আর ঢাকায় একুশ বছর বাদে ক্ষমতায় ফিরল আওয়ামী লীগ।

ছবির কপিরাইট H D Deve Gowda
Image caption এইচ ডি দেবেগৌড়া

আর তার পর মাত্র ছমাস ঘুরতে না-ঘুরতেই দেখা গেল, দুই প্রধানমন্ত্রী এইচ ডি দেবেগৌড়া ও শেখ হাসিনা দিল্লির হায়দ্রাবাদ হাউসে বসে গঙ্গা-চুক্তিতে সই করছেন - তার আগের পঁচিশ বছরে যা কখনও ভাবাই যায়নি।

কূটনীতিক সালমন হায়দার তখন ছিলেন ভারতের পররাষ্ট্রসচিব। তিনি বলছিলেন, "এই মাপের একটা চুক্তি তখনই সই হতে পারে যখন দুপক্ষ থেকেই রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও নেতৃত্বের আগ্রহ তৈরি হয় - আর তখন দক্ষিণ এশিয়াতে সেই বিরল শর্তটাই পূরণ হয়েছিল, ছিলেন তার সঙ্গে মানানসই ব্যক্তিত্বরা।"

"গঙ্গাচুক্তির মতো একটা জটিল বিষয় নিয়ে এগোতে গেলে রাজনৈতিক সাহস লাগে, শেখ হাসিনার পূর্বসূরীরা তা দেখাতে না-পারলেও তিনি কিন্তু পেরেছিলেন - এবং হ্যাঁ, ভারতের দিক থেকেও তাতে উপযুক্ত সাড়া মিলেছিল।"

কিন্তু দীর্ঘ কংগ্রেস আমলে যে চুক্তি করা সম্ভব হয়নি, ভারতের কয়েকটি আঞ্চলিক ও বামপন্থী দলের জোটে তৈরি নবীন যুক্তফ্রন্ট সরকার কীভাবে সেটা সম্ভব করে ফেলল? সিপিআইএম এমপি মহম্মদ সেলিম মনে করেন, এর কৃতিত্ব প্রধানত জ্যোতি বসুর।

তিনি বলছিলেন, "যুক্তফ্রন্ট সরকারে কিন্তু বামপন্থীদের বড় ভূমিকা ছিল। সিপিএম সরকারে না-গেলেও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ছিলেন সিপিআইয়ের। আর সেই সরকারে জ্যোতি বসু-সুরজিতের মতো নেতাদের প্রভাব ছিল সাঙ্ঘাতিক। সেই জ্যোতিবাবু যখন ঠিক করলেন কলকাতা বন্দরের স্বার্থরক্ষা করেও গঙ্গা নিয়ে চুক্তি করা উচিত - তখন প্রধানমন্ত্রী দেবেগৌড়া নিজের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের চেয়েও তাঁর মতামতকে বেশি গুরুত্ব দিলেন।"

মুখ্যমন্ত্রী জ্যোতি বসুর ভূমিকা

ছবির কপিরাইট Getty Images
Image caption ভারতের রাজনীতিকরা মনে করেন গঙ্গাচুক্তি সম্পাদনের মূল কৃতিত্ব পশ্চিমবঙ্গের তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী জ্যোতি বসুর।

তখনকার তরুণ পার্লামেন্টারিয়ান মহম্মদ সেলিমের কথায় একশোভাগ সায় দিয়ে সে সময়কার প্রধানমন্ত্রী এইচ ডি দেবেগৌড়াও বিবিসিকে বলছিলেন, এই চুক্তির জন্য তিনি জ্যোতি বসুর কাছেই ঋণী।

তাঁর কথায়, "প্রয়াত জ্যোতি বসু তখন আন্তরিক সহযোগিতা করেছিলেন বলেই কিন্তু আমি এত বছরের পুরনো একটা সমস্যা সমাধান করতে পেরেছিলাম।"

"আর দেখুন, গত কুড়ি বছরে ভারত আর বাংলাদেশের মধ্যে গঙ্গা নিয়ে কোনও সমস্যা হয়নি - চুক্তি মসৃণভাবে চলছে, জল ভাগাভাগি নিয়ে দুদেশের মানুষই খুশি। আজ পর্যন্ত সব ঠিকঠাক চলছে, আমি নিশ্চিত আগামীতেও চলবে", বলেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী মিঃ দেবেগৌড়া ।

এটা ঠিকই, তিরিশ বছর মেয়াদী এই চুক্তি দুই-তৃতীয়াংশ পথ পেরিয়ে এসেছে বড় কোনও বিঘ্ন ছাড়াই। কিন্তু চুক্তির খসড়া যখন তৈরি হচ্ছে, তখন কিন্তু গোটা প্রক্রিয়ায় জটিলতা ও অন্যান্য বাধা কিছু কম ছিল না, বলছিলেন সালমন হায়দার।

তিনি জানাচ্ছেন, "টেকনিক্যাল বাধাবিপত্তি ছিল প্রচুর। মনে রাখতে হবে, গঙ্গার জল ভাগাভাগির কথা প্রথম বলেছিল ব্রিটিশরা তিরিশের দশকে - হুগলীতে জলের প্রবাহ বাড়িয়ে কলকাতা বন্দরকে বাঁচানোর প্রস্তাব ছিল তাদেরই। স্বাধীনতার পরেও অনেকেই বলতেন, ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে কাশ্মীরের পরে সবচেয়ে বড় সমস্যা হল এই গঙ্গা!"

ছবির কপিরাইট Getty Images
Image caption গঙ্গার জল ভাগাভাগির কথা প্রথম বলেছিল ব্রিটিশরা তিরিশের দশকে - হুগলীতে জলের প্রবাহ বাড়িয়ে কলকাতা বন্দরকে বাঁচানোর প্রস্তাব ছিল তাদেরই।

কিন্তু সেই সব বাধাই দূর করা সম্ভব হয়েছিল বর্ষীয়ান স্টেটসম্যান জ্যোতি বসুর রাজনৈতিক উদারতা ও দূরদর্শিতার মাধ্যমে - বলছিলেন তার ঘনিষ্ঠ মহম্মদ সেলিম।

তিনি বলছিলেন, "জ্যোতিবাবু বুঝেছিলেন ঘরের পাশে বাংলাদেশ ক্ষুধার্ত থাকলে কিছুতেই আমাদের ভাল হতে পারে না। তাদের খাদ্যে স্বয়ম্ভর হতে হবে, আর তার জন্য বাংলাদেশের চাই গঙ্গার পানি। নাব্যতা যেমন গঙ্গার রাখতে হবে, তেমনি পদ্মারও রাখতে হবে। সেই জন্যই রাজনৈতিক সঙ্কীর্ণতার ঊর্ধ্বে উঠে তিনি এই চুক্তির জন্য সওয়াল করেছিলেন ও অন্য নেতাদেরও তা বোঝাতে পেরেছিলেন।"

"অনেক সময় এমন ক্ষেত্রে নিজের দেশের লোকেরাই আপনার প্রতি বিরূপ হয়ে যেতে পারেন। বিরোধীরা তো তখন এমনও প্রচার করেছিল, জ্যোতিবাবু অবসরের পর বাংলাদেশে চলে যাবেন, তাই এখন এত দরদ দেখাচ্ছেন। এসবে তিনি কখনও কান দেননি, কারণ তিনি জানতেন কোনটা ভাল আর কোনটা মন্দ।"

জল নিয়ে দেবেগৌড়ার পড়াশুনো

প্রধানমন্ত্রী দেবেগৌড়া নিজেও ততদিনে পড়াশুনো শুরু করে দিয়েছেন জল ভাগাভাগি নিয়ে। তিনি বলছিলেন কর্নাটকে বিরোধী নেতা ও সেচমন্ত্রী হিসেবে কাবেরী ইস্যুটা তার ভালই জানা ছিল, ফলে গঙ্গা যে তাকে টানবে তাতে আর আশ্চর্য কী?

বিবিসিকে তিনি বলছিলেন, "এতে কোনও রহস্য নেই। আমি যখন যে দায়িত্বটা পেয়েছি, তখনই চেষ্টা করেছি সেখানে অমীমাংসিত বিষয়গুলো নিষ্পত্তি করার।"

"কর্নাটকে থাকার সময় কাবেরী নিয়ে তিক্ততার অভিজ্ঞতা ছিলই, আর প্রধানমন্ত্রী হয়েই আমি দেশের ভেতরের আর আন্তর্জাতিক জল-সমস্যাগুলোর দিকে নজর দিই, সেগুলো নিয়ে পড়াশুনো শুরু করি। ফলে শুধু বাংলাদেশের সঙ্গে গঙ্গা ইস্যুই নয়, আমি কিন্তু আমার সময়কালে নর্মদার ভাগাভাগি আর তেহরি বাঁধ সমস্যারও সন্তোষজনক সমাধান করতে পেরেছিলাম।"

চুক্তি যখন ধীরে ধীরে বাস্তবে রূপ নিচ্ছে, তখন দিল্লিতে সক্রিয় ভূমিকায় ছিলেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী আই কে গুজরাল। আর কলকাতায় থেকেও পুরো প্রক্রিয়াটায় প্রচ্ছন্ন প্রভাব বিস্তার করে যাচ্ছিলেন মুখ্যমন্ত্রী জ্যোতি বসু।

ছবির কপিরাইট Salman Haidar
Image caption ভারতের সাবেক পররাষ্ট্র সচিব সালমান হায়দার

সালমন হায়দার বলছিলেন, "মনে রাখতে হবে জ্যোতি বসু নিজে কিন্তু পূর্ববঙ্গের লোক ছিলেন। এর কিছুদিন আগেই তিনি বাংলাদেশ সফরে যান, ফিরে এসে আমাকে ওঁনার স্বভাবসিদ্ধ আবেগবর্জিত ভঙ্গীতে বলেছিলেন ওখানে ঘুরে এসে ওনার খুব ভাল লেগেছে। নিজের গ্রামের বাড়িতে গিয়ে খুব আদরযত্ন পেয়েছেন।"

"তারপরেই তিনি সরাসরি বলে বসেন, কলকাতা বন্দরের স্বার্থের সঙ্গে আপস না-করে যদি গঙ্গা নিয়ে কিছু করা যায়, তাহলে কিন্তু আমাদের সেটা করা উচিত।" জানাচ্ছেন মি হায়দার।

পররাষ্ট্রসচিব নিজে চুক্তির খসড়া তৈরির কাজে যুক্ত ছিলেন, জ্যোতি বসুর কথা থেকে তার বুঝতে অসুবিধা হয়নি তখনকার দেশের নেতৃত্ব ঠিক কী চাইছেন।

হায়দ্রাবাদ হাউস, ১২ ডিসেম্বর ১৯৯৬

ফলে মাত্র কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই প্রস্তুতির সব কাজ সমাধা হল, ডিসেম্বরে দিল্লির হালকা শীতে, এক বৃহস্পতিবারের দুপুরে সই হয়ে গেল সেই ঐতিহাসিক চুক্তি।

মি দেবেগৌড়া বলছিলেন, "সেদিনের স্মৃতি এখনও পরিষ্কার মনে আছে - তবে দিনতারিখ এখন আর অত খেয়াল নেই, আপনারাই মনে করিয়ে দিলেন। শেখ হাসিনা দিল্লিতে এসেছিলেন চুক্তিতে সই করতে, তিনদিন ছিলেন।"

"কিছুদিন পরে আমি যখন তার আমন্ত্রণে বাংলাদেশে গেলাম, আমি জানিনা ভারতের আর কোনও নেতা কখনও রেড কার্পেটে অমন সাদর অভ্যর্থনা কখনও পেয়েছেন কি না। বাংলাদেশের মানুষ আমায় ভালবাসা উজাড় করে দিয়েছিলেন। তারা আজও আমায় ওই কারণে স্বীকৃতি দেন, নিশ্চয় আগামীতেও দেবেন", বলছিলেন আপ্লুত প্রবীণ নেতা।

সেই ১২ ডিসেম্বরের রাতেই বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সম্মানে রাষ্ট্রীয় নৈশভোজের আয়োজন করা হয়েছিল। সেই ব্যাঙ্কোয়েটের স্মৃতিচারণ করছিলেন তখনকার তরুণ এমপি মহম্মদ সেলিম।

ছবির কপিরাইট Mohammed Selim
Image caption মহম্মদ সেলিম

"সে দিনের ডিনারে আমি ছিলাম, বসেছিলাম শেখ হাসিনার খুব কাছেই। সে এক দারুণ বন্ধুত্বের মেজাজ, খানিকক্ষণ বাদেই চুটিয়ে বাংলায় গল্প শুরু হয়ে গেল। জ্যোতিবাবু এমনিতে খুব গম্ভীর মানুষ, তিনিও কিন্তু সেই আড্ডায় যোগ দিলেন।"

"ছিলেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী গুজরালও। তার বিখ্যাত সেই ডকট্রিন, ভারত বড় দেশ - কাজেই রেষারেষি নয়, আমাদেরই আগ বাড়িয়ে বন্ধুত্বের হাত বাড়াতে হবে - তখন সেই নীতিরই জয়জয়কার। তবে গুজরাল বলুন বা দেবেগৌড়া, সেদিন সবার নেতা ছিলেন একজনই, আর তিনি জ্যোতি বসু।"

"বিশ্বাস করবেন না, ব্যাঙ্কোয়েটের আসরে দুপক্ষের লোকজনই এগিয়ে এসে তাঁকে বারবার বলে যাচ্ছিলেন - আপনি ছিলেন বলেই কিন্তু আজ এই চুক্তিটা সম্ভব হল।" বলতে বলতে এখনও আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েন মহম্মদ সেলিম।

সিন্ধু আর গঙ্গা চুক্তি

ভারতের পশ্চিম সীমান্তে সিন্ধু আর পূর্বে গঙ্গা - দুই নদীর জল নিয়ে দুটি আলাদা চুক্তি রয়েছে যথাক্রমে পাকিস্তান আর বাংলাদেশের সঙ্গে।

কূটনীতিক সালমন হায়দার দুই চুক্তির তুলনামূলক বিশ্লেষণ করে বলেছেন, "সিন্ধুচুক্তি সই হয়েছিল বিশ্ব ব্যাঙ্কের মধ্যস্থতায় - যখন আকাশে যুদ্ধের ঘনঘটা। গঙ্গাচুক্তিতে কাউকে মধ্যস্থ করতে হয়নি, চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছিল দারুণ সম্প্রীতির আবহে।"

"দুপক্ষ হয়তো তাদের জলের ভাগ নিয়ে পুরো সন্তুষ্ট হতে পারেনি - কিন্তু রাজনৈতিক সদিচ্ছা আর আগ্রহই পুষিয়ে দিয়েছিল সেই সামান্য না-পাওয়ার ঘাটতি।"

আর ঠিক এই কারণেই তিনি বলছেন গঙ্গা-চুক্তি এক অসাধারণ ইতিহাসের অংশ।

ইতিহাসের সাক্ষীর এই পর্বটি পরিবেশনা করেছেন শুভজ্যোতি ঘোষ।

সম্পর্কিত বিষয়