ইরাকী শরণার্থী আর মেসিডোনিয়ান সীমান্ত রক্ষীর প্রেম

মেসিডোনিয়ার এই কর্দমাক্ত পথে ইউরোপের দিকে যাচ্ছিল হাজার হাজার শরণার্থী ছবির কপিরাইট AFP
Image caption মেসিডোনিয়ার এই কর্দমাক্ত পথে ইউরোপের দিকে যাচ্ছিল হাজার হাজার শরণার্থী

বৃষ্টিভেজা যে দিনটিতে ববি ডোডেভস্কি প্রথম তাঁর ভবিষ্যতের স্ত্রীর দেখা পেয়েছিলেন, সেদিন তার কাজে যাওয়ার কথা ছিল না। ববি ডোডেভস্কি মেসিডোনিয়ার সীমান্ত রক্ষী বাহিনীর একজন সদস্য। অন্য এক সহকর্মীর পরিবর্তে সেদিন তার ডিউটি পড়েছিল সীমান্তে।

সেদিন যে হাজার হাজার শরণার্থী মেসিডোনিয়ার সীমান্ত অতিক্রম করার চেষ্টা করছিল, তাদের মাঝে ছিলেন ইরাক থেকে পালিয়ে আসা এক শরণার্থী নোরা আরকাভাজি।

বিশ বছর বয়সী নোরা আরকাভাজি ইরাকের ডিয়ালা প্রদেশ ছাড়েন ২০১৬ সালের শুরুতে। তখন সেখানে প্রচন্ড সহিংসতা চলছে। পরিবারের অন্য সদস্যদের সঙ্গে নোরা ইরাক থেকে তুরস্ক, সেখান থেকে নৌকায় গ্রীসের লেসবস দ্বীপ হয়ে মেসিডোনিয়ার সীমান্তে পৌঁছান। বহু শরণার্থী তখন এই একই পথ ধরে ইউরোপে ঢোকার চেষ্টা করছে।

যখন তারা সীমান্তে অপেক্ষা করছে তাদের মেসিডোনিয়ার ওপর দিয়ে সার্বিয়ায় যেতে দেয়া হবে কীনা, তখন নোরার দেখা হলো মিস্টার ডোডেভস্কির সঙ্গে।

ডোডেভস্কির মনে হলো নোরার চোখে এমন কিছু আছে, যেখানে লেখা রয়েছে তার নিয়তি।

ইউরোপে ঢুকতে চাওয়া শরণার্থীদের মুখের ওপর তখন একের পর এক দরোজা বন্ধ করে দিচ্ছে বিভিন্ন দেশ।

নোরার স্বপ্ন ছিল, তারা জার্মানিতে যাবে, সেখানে পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের সঙ্গে মিলে বসবাস করবে।

ছবির কপিরাইট AFP
Image caption প্রথম দেখার চার মাস পরেই গত জুলাইতে বিয়ে করেন নোরা আর ববি ডোডেভস্কি

নোরা ছয়টি ভাষায় পারদর্শী। যখন মেসিডোনিয়ার সীমান্তে তারা আটকে আছে, তখন নোরাকে পাঠানো হলো ডোডেভস্কির কাছে। কারণ নোরা ভালো ইংরেজী বলতে পারে।

দুজনের মধ্যে প্রথম দেখাতেই যে প্রেমের মতো কিছু ঘটে গেছে, সেটা টের পেয়ে গেলেন ডোডেভস্কির এক মহিলা সহকর্মী। তিনি ডোডেভস্কিকে ঠাট্টা করে বলছিলেন, "তুমি তো মনে হয় কাজে মন বসাতে পারছো না। তোমার মগজটা মনে হয় কেউ চুরি করে নিয়ে গেছে।"

ডোডেভস্কির এখন স্বীকার করতে লজ্জা নেই প্রথম দেখাতেই তিনি আসলে নোরার প্রেমে পড়ে গিয়েছিলেন।

মেসিডোনিয়ার এক ট্রানজিট ক্যাম্পে নোরা রেড ক্রসের স্বেচ্ছাসেবী হিসেবে কাজ শুরু করলেন। সেখানে কাজের ফাঁকে ফাঁকে ডোডেভস্কির সঙ্গে প্রণয়ের সম্পর্ক গভীরতর হতে থাকলো।

ডোডেভস্কি নোরাকে নিয়ে গেলেন কাছের শহরের বাজারে। নিয়ে গেলেন নিজের মায়ের কাছে। অন্যদিকে ডোডেভস্কি যেভাবে শরণার্থী শিশুদের সঙ্গে খেলায় মেতে উঠতেন, তা মুগ্ধতা ছড়াতো নোরার চোখে।

তারপর এপ্রিলে এক রেস্টুরেন্টে খেতে খেতে ডোডেভস্কি নোরাকে বিয়ের প্রস্তাব দিলেন।

নোরা বার বার বলছিলেন, তুমি কি আমার সঙ্গে রসিকতা করছো।

ডোডেভস্কি দশ বার করে বিয়ের প্রস্তাব দিয়ে জানালেন, এটা মোটেই রসিকতা নয়।

ছবির কপিরাইট AFP
Image caption নোরা এবং ববি দম্পতি তাদের দুজনের প্রথম সন্তানের অপেক্ষায় আছেন

উত্তর মেসিডোনিয়ার শহর কুমানোভোতে দুজনের বিয়ে হলো। ডোডেভস্কি অর্থোডক্স খ্রীষ্টান চার্চের অনুসারী। অন্যদিকে নোরা হচ্ছেন কুর্দি মুসলিম। কিন্তু ধর্ম কোন বাধা হলো না প্রেম আর বিয়েতে। বিয়ের অনুষ্ঠানে আমন্ত্রিত অতিথির সংখ্যা ছিল বিশ জন।

নোরার পরিবারের অন্যান্য সদস্যরা শেষ পর্যন্ত জার্মানিতে ঢুকতে পেরেছিলেন। কিন্তু প্রেমের ফাঁদে আটকে পড়ে নোরা রয়ে গেলেন মেসিডোনিয়াতেই। সেখানে ডোডেভস্কির আগের তিন সন্তান সহ তাদের পাঁচ জনের সুখের সংসার।

তবে শীঘ্রই তাদের সঙ্গে যোগ দিতে আসছেন পরিবারের ষষ্ঠ সদস্য।

"আমি এখন সন্তান সম্ভবা, চার মাস চলছে", হাসতে হাসতে জানালেন নোরা।