বাংলাদেশে কারিগরি শিক্ষা:শিক্ষার্থীরা কতটা আগ্রহী হচ্ছে?

  • ৬ জানুয়ারি ২০১৭
ছবির কপিরাইট BBC BANGLA
Image caption কারিগরি শিক্ষায় শিক্ষার্থী বাড়ছে।

বাংলাদেশে গত এক দশকে বহু কারিগরি কলেজ এবং প্রশিক্ষণ কেন্দ্র গড়ে উঠেছে। প্রতি বছর দেশটিতে যে লক্ষ-লক্ষ তরুণ চাকরীর বাজরে আসছে, তাদের কর্মসংস্থানের জন্য কারিগরি শিক্ষা একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হতে পারে বলে মনে করেন অনেকে। কিন্তু এসব কারিগরি শিক্ষাকেন্দ্র শিক্ষার্থীরা কতটা আগ্রহী হচ্ছে? প্রতিষ্ঠানগুলো শিক্ষার্থীদের কতটা টানতে পারছে?

বিষয়টি দেখতে আমি গিয়েছিলাম ঢাকার দারুস সালাম এলাকায় বাংলাদেশ-কোরিয়া কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র। এ প্রশিক্ষণ কেন্দ্র ক্যাম্পাস বিশাল এলাকাজুড়ে অবস্থিত। বিভিন্ন কোর্সে ভর্তির আবেদন ফরম সংগ্রহ করতে দীর্ঘ লাইন দেখা যাচ্ছে। বেশিরভাগই বয়সে তরুণ।

এখানেই ভর্তি হয়েছেন সুমন কুমার বৈদ্য। একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে তিনি বিবিএ পড়ছেন। কিন্তু তারপরেও এ কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র তিনি একটি কোর্স করতে চান। বলছিলেন বিবিএ পড়ার পরেও তিনি কেন এখানে আসলেন ...

সুমন কুমার বৈদ্য বলছিলেন, " আমার মতো অনেকে বিবিএ ডিগ্রি নিয়ে বসে আছে। এ রকম ভুরি-ভুরি ছাত্র আছে। আমি গার্মেন্টসে কোয়ালিটি কন্ট্রোলে কাজ করতে চাই। আমি একটা কাজ শিখতে চাই যাতে আমাকে বেকার বসে থাকতে না হয়।"

সুমন কুমার জানালেন, তার মতো অনেকেই আছে এ কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র ভর্তি হতে চায়। কিন্তু সামাজিকভাবে এ পড়াশুনাকে মূল্যায়ন করা হয়না বলেই অনেকে 'মেধাবী শিক্ষার্থীরা' এখানে আসতে চায়না।

ছবির কপিরাইট BBC BANGLA
Image caption ঢাকা পলিটেকনিকের কয়েকজন শিক্ষার্থী

কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র ভর্তি হতে এসেছেন মমিনুল ইসলাম। একটি ঢাকার একটি সরকারী কলেজে অনার্স শেষ বর্ষের ছাত্র তিনি। মি: ইসলাম বলছিলেন, চার বছর ধরে অনার্স পড়ার পরে তিনি অনুধাবন করলেন কারিগরি শিক্ষা নেয়াটা তার জন্য জরুরী। বলছিলেন, কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে কী ধরনের প্রশিক্ষণ দেয়া হয় সেটি তার মতো অনেকেই জানে না।

মমিনুল ইসলাম বলেন, " এটা যে একটা টেকনিক্যাল সেটা দেখেছি। কিন্তু এখানে কী হয়, সেটা আমার জানা ছিলনা। আমি ভেবেছিলাম এটা ভাষা শিক্ষার একটা কেন্দ্র। "

সরকারী হিসেবে বাংলাদেশে এখন প্রায় আট হাজারের মতো কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র আছে। এর নব্বই শতাংশই হচ্ছে বেসরকারি। এসব প্রতিষ্ঠানে চার বছর মেয়াদী থেকে শুরু করে তিনমাস মেয়াদী পর্যন্ত নানা ধরনের কারিগরি কোর্স পড়ানো হয় কিংবা প্রশিক্ষণ দেয়া হয়। বাংলাদেশে স্কুল গুলোতে ৬ষ্ঠ থেকে দশম শ্রেণি পর্যন্ত 'কর্ম-জীবনমুখী শিক্ষা' নামে একটি বই পড়ানো হয়। এ বইয়ের অন্যতম লেখক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইন্সটিটিউট-এর অধ্যাপক মজিবুর রহমান। গবেষণা করতে গিয়ে তিনি দেখেছেন, কারিগরি শিক্ষার প্রতি সমাজের অনেকেরই এক ধরনের নেতিবাচক মনোভাব আছে ।

ছবির কপিরাইট BBC BANGLA
Image caption মজিবুর রহমান, শিক্ষক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

অধ্যাপক রহমান বলেন, " সামাজিকভাবে ধরে নেয়া হয় যারা পড়াশুনায় ভালো নয় তারা টেকনিক্যাল এডুকেশনে আসবে। সমাজের দৃষ্টিভঙ্গির কারণে এটা হচ্ছে।"

সরকারী পরিসংখ্যানে দেখা যাচ্ছে, ২০১৬ সালে দেশে প্রায় আট হাজার কারিগরি শিক্ষা কেন্দ্রে প্রায় ১১ লাখ শিক্ষার্থী ভর্তি হয়েছে। দেশের স্কুল-কলেজ -মাদ্রাসা এবং কারিগরি শিক্ষা মিলিয়ে যত শিক্ষার্থী আছে তার প্রায় ১৩ শতাংশ টেকনিক্যাল প্রতিষ্ঠানগুলোতে ভর্তি হয়েছে। অর্থাৎ বাকি ৮৭ শতাংশ শিক্ষার্থী অন্য প্রতিষ্ঠানে পড়াশুনা করছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, বাস্তবতায় এটি অন্তত দ্বিগুণ হওয়া ছিল। কিন্তু বাংলাদেশে কর্মক্ষেত্রের বাজারে কারিগরি প্রশিক্ষণপ্রাপ্তদের চাহিদা এবং জোগান কতটা রয়েছে সে বিষয়ে পরিষ্কার কোন চিত্র নেই। বলছিলেন, বাংলাদেশে কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তরের সাবেক মহাপরিচালক মো: শাহজাহান মিয়া।

শাহজাহান মিয়া বলেন, " আমাদের দেশে প্রতিবছর ২০ লক্ষ মানুষ চাকরীর বাজারে আসছে। কিন্তু টেকনিক্যাল খাতে লোকবলের চাহিদা কতটা সেটা আমরা এখনো নির্ণয় করতে পারি নাই।"

তিনি মনে করেন কারিগরি সেক্টরে কর্মসংস্থান এবং শিক্ষা নিয়ে একটি পূর্ণাঙ্গ গবেষণা হওয়া উচিত।

ছবির কপিরাইট BBC BANGLA
Image caption মো: শাহজাহান মিয়া

কারিগরি শিক্ষা নিয়ে জানতে আমি গিয়েছিলাম ঢাকার পলিটেকনিক ইন্সটিটিউটে। দেশের সবচেয়ে পুরনো পলিটেকনিক ইন্সটিটিউট এটি। এখানে এসএসসি পাশ করেই অনেকে ভর্তি হয় চার বছর মেয়াদি বিভিন্ন কোর্সে। তবে ছাত্রদের তুলনায় ছাত্রীদের সংখ্যা খুবই কম।

এখানে মেয়ে শিক্ষার্থীদের সাথে কথা বলে জানা গেল, কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র কলেজগুলোতে মেয়েরা খুব একটা পড়তে চায় না । যারা পড়ছেন, তাদের মধ্যে কেউ-কেউ বাধ্য হয়ে ।

একজন ছাত্রী বলছিলেন, " আমার তেমন কোন ইচ্ছা ছিলনা। কিন্তু আমার আপু পড়াতে আমাকে ভর্তি করানো হলো। সব মেয়েরা টেকনিক্যাল লাইনে পড়তে চায় না। অধিকাংশ মেয়েরা জেনারেল লাইনে পড়ে ডিগ্রি অর্জন করতে চায়।"

বাংলাদেশে অনেক কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র গড়ে উঠেছ যার মূল লক্ষ্য হচ্ছে, বিদেশে দক্ষ কর্মী পাঠানো। যারা বিদেশে কর্মী হিসেবে যেতে চায় তাদের অনেকেই এ ধরনের প্রশিক্ষণ নিচ্ছেন। ঢাকায় বাংলাদেশ-কোরিয়া টেকনিক্যাল সেন্টারের অধ্যক্ষ সাখাওয়াত আলী বলছিলেন, তাদের প্রতিষ্ঠানে যারা প্রশিক্ষণ নিচ্ছেন তারা কোথায় যায়?

মি: আলী জানালেন, " বিশ্বের ১০০টির বেশি দেশে আমাদের কর্মীরা যাচ্ছে। এখান থেকে প্রশিক্ষণ নিয়ে অনেকে বিদেশে গেছে। আমাদের মূল টার্গেট বিদেশে দক্ষ শ্রমিক পাঠানো।"

ছবির কপিরাইট BBC BANGLA
Image caption সাখাওয়াত আলী, অধ্যক্ষ, বাংলাদেশ-কোরিয়া টেকনিক্যাল সেন্টার

বাংলাদেশে কারিগরি শিক্ষা বোর্ড বলছে, গত বছরের পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করে তারা দেখছেন, এ খাতে শিক্ষার্থীদের সংখ্যা দ্রুত গতিতে বাড়ছে। সরকারী পরিসংখ্যান অনুযায়ী, পাঁচ বছর আগে কারিগরি শিক্ষায় প্রতিবছর শিক্ষার্থী ভর্তির হার ছিল ৫ শতাংশ। এখন সেটি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৩ শতাংশ। কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান মো: মোস্তাফিজুর রহমান বলছেন, দেশের চাহিদা অনুযায়ী প্রশিক্ষিত জনবল গড়ে তোলার জন্য কারিগরি শিক্ষা পদ্ধতির আধুনিকায়ন হয়েছে ।

মি: রহমান বলেন, " আমাদের যে কর্মী দরকার, ইঞ্জিনিয়ার দরকার সেটা আমরা প্রোডিউস করতে পারছি কিনা। আমাদের এসব প্রতিষ্ঠানে পড়াশুনা করে দেশের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে চাকরী করছে। শিক্ষার্থীদের চাহিদা অনুযায়ী কোর্স নির্ধারণ করা হচ্ছে ।"

সরকার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে, ২০২০ সালের মধ্যে কলেজ পর্যায়ের মোট শিক্ষার্থীদের মধ্যে ২০ শতাংশ আসবে কারিগরি কলেজ বা প্রশিক্ষণ কেন্দ্র থেকে। কিন্তু একই সাথে কারিগরি শিক্ষার প্রতি সামাজিক মনোভাব বদলালে আরো অনেকে কারিগরি আসতে উৎসাহিত হবে বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা।