'সেনাদের দুর্দশার কথা ইন্টারনেটে ছাড়লে কড়া ব্যবস্থা'

ছবির কপিরাইট TAUSEEF MUSTAFA
Image caption কাশ্মিরে টহলরত একজন ভারতীয় সেনা

ভারতে সামরিক ও আধাসামরিক বাহিনীর বেশ কিছু সদস্য তাদের দুর্দশার বিবরণ দিয়ে সোশ্যাল মিডিয়াতে একের পর এক ভিডিও পোস্ট করার পর আজ দেশের সেনাপ্রধান হুঁশিয়ারি দিয়েছেন এর জন্য তাদের বিরুদ্ধে কড়া ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে।

এদিন 'সেনা দিবসে'র অনুষ্ঠানে ভারতীয় সেনাধ্যক্ষ জেনারেল বিপিন রাওয়াত বলেছেন জওয়ানদের অভিযোগ থাকলে তারা সরাসরি তাঁর কাছেও নালিশ জানাতে পারে - কিন্তু সোশ্যাল মিডিয়াতে অভিযোগ করে বাহিনীর মনোবল নষ্ট করার চেষ্টা মেনে নেওয়া হবে না।

গত কয়েকদিনে বিএসএফ, সিআরপিএফ বা সেনাবাহিনীর একাধিক জওয়ান তাদের খারাপ খাবারদাবার, চাকরিতে বৈষম্য বা অফিসারদের নানা অন্যায় হুকুম নিয়ে সোশ্যাল মিডিয়াতে সরব হয়েছেন - আর সেই সব ভিডিও ভারতে তুমুল চাঞ্চল্য সৃষ্টি করেছে।

কাশ্মীরের নিয়ন্ত্রণরেখায় যে ভারতীয় সীমান্তরক্ষীরা মোতায়েন রয়েছেন, তাদের কেমন পাতলা জলের মতো ডাল আর শুকনো পরোটা খেয়ে সীমান্ত পাহারা দিতে হয় - ফেসবুকে বিএসএফ জওয়ান তেজবাহাদুর যাদবের সেই ভিডিও কদিন আগেই গোটা দেশে শোরগোল ফেলে দিয়েছিল।

ছবির কপিরাইট STR
Image caption কাশ্মিরে টহলরত ভারতীয় সেনা দল

শুধু এক চিমটে হলুদ আর নুন-মেশানো ট্যালটেলে ডাল খেয়ে সীমান্তরক্ষীরা কীভাবে রোজ দশ ঘন্টা ডিউটি করবেন, তেজবাহাদুর এ প্রশ্ন তোলার পরই তাকে সদর দফতরে বদলি করে দেওয়া হয়। কিন্তু জওয়ানদের ক্ষোভ তাতে চাপা দেওয়া যায়নি।

এর আটচল্লিশ ঘন্টার মধ্যেই সিআরপিএফ কনস্টেবল জিৎ সিং ইউটিউবে আর একটি ভিডিও পোস্ট করে প্রধানমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করার চেষ্টা করেন এবং বলেন, বেতন-ভাতা-পেনশন-ছুটিছাটা ও সুযোগসুবিধার দিক থেকে কীভাবে সেনা সদস্যদের তুলনায় তারা বঞ্চিত হচ্ছেন।

এতেই শেষ নয়, প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই সোশ্যাল মিডিয়াতে এস পড়ে দেরাদুনের ৪২ ব্রিগেডের জওয়ান জগ প্রতাপ সিংয়ের আর একটি ভিডিও, যাতে তিনি বর্ণনা করেন কীভাবে তাদের দিয়ে অফিসাররা কাপড় কাঁচান, বুট পালিশ করান কিংবা মেমসাহেবরা কুকুর হাঁটান!

এই সব অস্বস্তিকর ভিডিও সামনে আসার পর বেশ কিছু সেনা কর্মকর্তাও পাল্টা কিছু বার্তা সোশ্যাল মিডিয়াতে পোস্ট করতে শুরু করেন এবং জওয়ানরা এভাবে অভিযোগ জানাতে থাকলে বাহিনীর শৃঙ্খলা ভেঙে পড়বে বলেও সতর্ক করে দেন।

ফেসবুক বা হোয়াটসঅ্যাপ দিয়ে একটা সেনাবাহিনী চালানো যায় না বলেও তাদের কেউ কেউ মন্তব্য করেন।

আর এদিন সেনা দিবসের ভাষণে সেনাধ্যক্ষ জেনারেল বিপিন রাওয়াত পরিষ্কার হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন এভাবে অভিযোগ জানানো বন্ধ না-হলে কপালে কড়া শাস্তি জুটবে।

তিনি বলেন, "সম্প্রতি আমাদের কিছু সহকর্মী সোশ্যাল মিডিয়াকে ব্যবহার করে নিজেদের সমস্যার কথা সংবাদমাধ্যমে তুলে ধরছেন। এর বিরূপ প্রভাব পড়ছে ভারতীয় সেনার সেই বীর সেনানীদের ওপর, যারা সীমান্তে শত্রুর বিরুদ্ধে মোতায়েন।"

"জওয়ানদের অভিযোগ জানানোর একটা নির্দিষ্ট প্রক্রিয়া আছে, তদন্তে সন্তুষ্ট না-হলে তারা সরাসরি আমার সঙ্গেও যোগাযোগ করতে পারেন। কিন্তু আপনারা যেটা করছেন সেটা অপরাধ বলে গণ্য হবে, তাতে কড়া শাস্তিও হতে পারে", সাফ জানিয়ে দেন সেনাপ্রধান রাওয়াত।

বাহিনীর সর্বোচ্চ নেতৃত্ব থেকে এই ধরনের হুঁশিয়ারি আসার পর অভিযোগমূলক ভিডিও-র স্রোত বন্ধ হয় কি না, সেটাই এখন দেখার।

তবে বিএসএফের একজন সাবেক ডিআইজি সমীরকুমার মিত্র বিবিসিকে বলছিলেন, অভাব-অভিযোগ জানানোর অনেক রাস্তা থাকা সত্ত্বেও যেভাবে ইদানীং এই সব ভিডিও সামনে আসছে তাতে তিনি বিস্মিত।

মি মিত্র বিএসএফের দৃষ্টান্ত দিয়ে বলছিলেন, "আমাদের অফিসাররা যখনই সীমান্ত চৌকি পরিদর্শনে যান তখনওই জওয়ানদের সঙ্গে কথা বলেন। তা ছাড়া প্রতি মাসেই সৈনিক সম্মেলন হয়, সেখানে প্রতিটি কোম্পানি থেকে প্রতিনিধি পাঠানো হয়। সব চেয়ে বড় কথা, কিছুতেই কিছু না-হলে জওয়ানদের জন্য আইন আদালতের রাস্তাও কিন্তু খোলা আছে!"

"আর এরা বলছে রুটি পুড়ে গেছে। জানেন এই জওয়ানদের গরম খাবার রাত এগারোটা পর্যন্ত সার্ভ করে তারপর বাহিনীর কুক বেচারা শুতে যায়। তারপর সে ভোর চারটেয় উঠে বেড টি দিয়ে আবার সকাল ছ-টার মধ্যে জওয়ানদের কাছে নাস্তা পাঠানোর ব্যবস্থা করে। আপনিই বলুন রুটি পুড়ে গেলে কর্মকর্তাদের কী দোষ?" পাল্টা প্রশ্ন তুলছেন সমীর কুমার মিত্র।

এমন কী, একের পর এক এই সব ভিডিও-র পেছনে কোনও বিরুদ্ধ শক্তির সুপরিকল্পিত নকশা থাকতে পারে বলেও তিনি সন্দেহ করছেন।

তবে ঘটনা হল, স্বাধীন ভারতের সত্তর ভারতের ইতিহাসে কখনও কোনও সাধারণ জওয়ানের অভিযোগ নিয়ে এত তোলপাড় হয়নি, যতটা হয়েছে গত পাঁচ-ছদিনে।

এটা সম্ভব হয়েছে সোশ্যাল মিডিয়ার সুবাদেই, আর ভারতীয় সেনা কর্তৃপক্ষ এখন সেই রাস্তাটা বন্ধ করতেই উঠেপড়ে লেগেছেন।

সম্পর্কিত বিষয়