মুসলিম যুবককে হত্যার মামলায় অভিযুক্তদের জামিন দেয়া নিয়ে বিতর্ক

ছবির কপিরাইট Getty Images
Image caption মুম্বাইর একটি আদালতের সামনে পুলিশ (ফাইল ছবি)

ভারতে এক মুসলিম যুবককে পিটিয়ে মারার ঘটনায় অভিযুক্ত তিনজন ব্যক্তিকে মুম্বাই হাইকোর্ট যে যুক্তিতে জামিন মঞ্জুর করেছে, তা নিয়ে তীব্র হইচই শুরু হয়েছে।

হাইকোর্ট বলেছে, ওই তিনজনকে 'ধর্মীয় উসকানি দিয়ে প্ররোচিত করা হয়েছিল এবং তার ভিত্তিতেই তারা ওই হত্যাকাণ্ড ঘটিয়ে ফেলে'।

ধর্মীয় প্ররোচনার সাফাই দিয়ে অভিযুক্তদের জামিন মেলায় তা দেশে সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষ ছড়াবে বলেই অনেক অ্যাক্টিভিস্ট মনে করছেন।

তবে আইনি বিশেষজ্ঞরা আবার কেউ কেউ বলছেন মামলার চূড়ান্ত রায়টাই আসল - কীসের ভিত্তিতে জামিন হল তাতে অত গুরুত্ব দেওয়ার কিছু নেই।

২০১৪ সালের ২রা জুন পুনে-তে ২৮ বছরের মহসিন শেখ যখন বাইকে চেপে রাতের খাবার খেতে যাচ্ছিলেন, তখন একদল লোক হকিস্টিক, ক্রিকেট ব্যাট ও পাথর নিয়ে তার ওপর হামলা চালায় ও পিটিয়ে মেরে ফেলে।

ফেসবুকে মহসিন শিবাজী মহারাজ ও শিবসেনার প্রয়াত নেতা বাল ঠ্যাকারে-কে অপমান করেছেন, এই যুক্তিতেই তার ওপর আক্রমণ চালিয়েছিল হিন্দু রাষ্ট্র সেনা নামে একটি সংগঠন।

হত্যায় অভিযুক্ত ২১জনের মধ্যে তিনজন গত সপ্তাহে মুম্বাই হাইকোর্টে জামিন পেয়ে গেছেন - কিন্তু তার পরই তা নিয়ে শুরু হয়েছে তীব্র প্রতিবাদ।

দিল্লির জামিয়া মিলিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক নেত্রী মনীষা শেঠি বলছেন, "এ যেন বিদ্বেষমূলক অপরাধের ওপর আইনি সিলমোহর দিয়ে দেওয়া - অন্য ধর্মের লোককে খুন করলে দোষের কিছু নেই। হামলাকারীদের সঙ্গে নিহতের কোনও ব্যক্তিগত শত্রুতা ছিল না, তাই জামিন দিতে হবে এটা কেমন যুক্তি?"

ছবির কপিরাইট Getty Images
Image caption মুম্বাইতে কারাগারের সামনে পুলিশ প্রহরা (ফাইল ছবি)

"কই, ইসলামী ছাত্র সংগঠন সিমি-র সদস্যরা তো কখনও জামিন পায় না? ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের ওপর হামলা হলে সেটা তত দোষের কিছু নয় - এটা তো চরম বিকৃতি!", বলছিলেন তিনি।

তবে আচমকা কোনও গভীর প্ররোচনার বশে কেউ কোনও অপরাধ করে ফেললে তার ভিত্তিতে আত্মপক্ষ সমর্থন করা যেতেই পারে - এবং সেটা ধর্মীয় কারণেও হতে পারে, বলছিলেন সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী ও বিজেপির লিগাল সেলের বিক্রমজিৎ ব্যানার্জি।

তার কথায়, "ধরুন আপনাকে রাস্তায় মা-বাবা তুলে কেউ কিছু বলল, আপনি রেগে দিগ্বিদিকশূন্য হয়ে তাকে মেরে বসলেন ও সে মারা গেল। এখন এই প্ররোচনা যদি প্রবল ও আকস্মিক হয় - অর্থাৎ আপনি ভেবেচিন্তে বদলা নেওয়ার জন্য কিছু করেননি, হঠাৎ প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছেন - সেটা আপনার ডিফেন্স কিন্তু হতেই পারে। আর ধর্মও এর আওতায় আসতে পারে।"

মানবাধিকার সংগঠন কমন কজের আইনজীবী মীরা ভাটিয়া আবার মনে করছেন - জামিনের আদেশকে অত গুরুত্ব না-দিয়ে এই মামলায় চূড়ান্ত রায়ের জন্য অপেক্ষা করাই ঠিক হবে।

তিনি বলছেন, "জামিন হল একটা অন্তর্বর্তী আদেশ - পরে হাইকোর্ট যে কোনও সময় তাদের আত্মসমর্পণ করতে বলতেই পারে। ভারতে নানাভাবে নানা কারণে জামিন দেওয়া হয়ে থাকে, ফলে আমি এর মধ্যে এত হইচই করার কিছু দেখছি না।"

হত্যা পরিকল্পিত নয়, বরং প্ররোচনার বশে করা - এটা প্রমাণিত হলে শাস্তি যে কম হয়ে থাকে, সে কথা বলছেন সুপ্রিম কোর্টের সাবেক বিচারপতি অশোক গাঙ্গুলিও। কিন্তু মামলার তিন বছর পর অভিযুক্তদের জামিন মেলায় তিনিও বিস্মিত নন।

জাস্টিস গাঙ্গুলি বলছিলেন, "তিন বছরেও মামলার রায় হয়নি - তখন জামিন দেওয়া হয়েছে এতে অন্যায় কোথায়? বিচার শেষ না-হলে অভিযুক্তরা কতদিন জেলে থাকবেন? আর ধর্মীয় ব্যাপারে আমি কিছু বলতে পারব না, কিন্তু এটা ঠিকই যদি দেখা যায় কেউ প্ররোচিত হয়ে কোনও অন্যায় করেছে তাহলে শাস্তিটা একটু লঘুই হয়!"

মহসিন শেখের পরিবার অবশ্য মনে করছে, হাইকোর্টের জামিনের আদেশেই এই ইঙ্গিত আছে যে প্রকাশ্য রাজপথে একজনকে পিটিয়ে মারার পরও খুনিরা রেহাই পেয়ে যাবে স্রেফ ধর্মীয় প্ররোচনার অজুহাত দিয়ে।

ফলে এই আদেশের বিরুদ্ধে তারা এখনই সুপ্রিম কোর্টে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন।