যেখানে নারী উত্যক্তকারীই সিনেমার নায়ক!

  • ৫ ফেব্রুয়ারি ২০১৭
রোকেয়া লিটা ছবির কপিরাইট রোকেয়া লিটা

বাংলাদেশ ও ভারত উভয় রাষ্ট্রেই ধর্ষণ বা গণ ধর্ষণ বা ইভ টিজিং নিয়মিত ঘটনা। বাংলাদেশে এক শ্রেণীর পুরুষ নারীকে উত্যক্ত করার কারণ হিসেবে নারীর পোশাককে দায়ী করে থাকে।

যেহেতু বাংলাদেশে মুসলমানের সংখ্যা বেশি, তাই তাদের যুক্তিকে জোরালো করার জন্য তারা ধর্মীয় বিধিনিষেধ যোগ করার চেষ্টা করে। কিন্তু ভারতে তো হিন্দু সম্প্রদায়ের সংখ্যাগরিষ্ঠতা রয়েছে, আর হিন্দু ধর্মে হিজাব বা পর্দাকে বাধ্যতামূলক করা হয়নি। তাহলে ভারতে কী সমস্যা?

ভারতে কেন এতো নারী ধর্ষিত হচ্ছে, কেন এতো গণ ধর্ষণের ঘটনা ঘটছে? ভারতের ধর্ষকদের কি অজুহাত?

কিছুদিন আগে আমার এক ভারতীয় বান্ধবীকে এই প্রশ্নগুলোই করেছিলাম। উত্তরে আমার বান্ধবী বললো, সেখানেও একই সমস্যা। মেয়েদের পোশাককেই ধর্ষণ বা যৌন হয়রানির কারণ হিসেবে দেখা হয়।

আমার ভারতীয় বান্ধবীটির কথার সত্যতা মিললো, দক্ষিণ ভারতের এক মন্ত্রীর বক্তব্যে। ব্যাঙ্গালোরে ইংরেজি নববর্ষের প্রথম প্রহরে যৌন হামলার ঘটনার পর তিনি বলেছেন, মেয়েরা 'পশ্চিমাদের মতো' পোশাক পরার কারণেই এই ঘটনা ঘটেছে। বিস্তারিত জানতে এখানে ক্লিক করুন।

ছবির কপিরাইট .
Image caption নারীদের পশ্চিমা পোশাককে আক্রমণের জন্য দায়ী করে মন্ত্রীর মন্তব্য ভারতীয় সংবাদ মাধ্যমে বড় শিরোনাম হয়।

ঘুরে-ফিরে দোষটা বারবার পোশাকের ঘাড়েই গিয়ে পড়ছে। দোষ যদি পোশাকের হবে, তবে অন্যান্য দেশে তো মেয়েরা আরও সংক্ষিপ্ত পোশাক পরে বেড়াচ্ছে, কই সে সব দেশে তো এতো বেশি নারীরা যৌন নির্যাতনের শিকার হচ্ছে না!

আমি গত দশ মাস যাবত সিঙ্গাপুরে বাস করছি। এখানকার মেয়েরা বাংলাদেশ ও ভারতীয় মেয়েদের চেয়ে অনেক সংক্ষিপ্ত পোশাক পরে চলাফেরা করে। দিনে কি রাতে, রাস্তায় বের হলেই দেখতে পাবেন একটা টি-শার্ট আর একটা হাফ-প্যান্ট পরে মেয়েরা একা একা ঘুরে বেড়াচ্ছে, কেউ তাদের উত্যক্ত করা তো দূরের কথা, খারাপ দৃষ্টিতে তাকানোরও সাহস করে না!

বাংলাদেশী বা ভারতীয় পুরুষদের যেমন দুটি করে চোখ রয়েছে, সিঙ্গাপোরিয়ান পুরুষদেরও তেমনি দুটি চোখ, তারা ভিন্ন গ্রহের প্রাণী নয়। হঠাৎ দু-একটা ধর্ষণের কথা শুনলেও, কই কখনও তো গণ ধর্ষণের কথা শুনি না সিঙ্গাপুরে!

তাহলে সমস্যাটা কোথায়? নারীর সংক্ষিপ্ত পোশাক যদি ধর্ষণ বা যৌন নির্যাতনের কারণ হতো, তবে সিঙ্গাপুরের মেয়েদের এতোটা নিরাপদে থাকার কথা নয়!

অজুহাতের যেহেতু কোনো অভাব নেই, অনেকে বলতে পারেন সিঙ্গাপুরের সংস্কৃতি আর ভারত-বাংলাদেশের সংস্কৃতি এক নয়। অনেকে বলতে পারেন, সিঙ্গাপুরের পুরুষরা মেয়েদের সংক্ষিপ্ত পোশাকে দেখে অভ্যস্ত, তাই তারা উত্তেজিত হয় না।

ছবির কপিরাইট .
Image caption রোকেয়া লিটার নতুন বই 'পুরুষ'।

সেটি আদৌ সত্যি নয়, সিঙ্গাপুরে আমি যে পরিমাণ হিজাব পরিহিতা নারী দেখি বাংলাদেশেও ততটা দেখি না। কারণ, সিঙ্গাপুরে সব ধর্মের মানুষই বাস করে। অমুসলিম নারীরা যেমন সংক্ষিপ্ত পোশাক পড়ে বেড়ায়, তেমনি আবার অনেক মুসলিম নারী হিজাব পরে বেড়াচ্ছে, আরেকটি অংশ আবার শাড়ি বা সালোয়ার-কামিজ পড়ে বেড়ায়।

কাজেই হিজাব বা সংক্ষিপ্ত পোশাক, সব অবস্থাতেই নারীদের দেখে অভ্যস্ত এখানকার পুরুষরা।

সমস্যা যে নারীর পোশাক নয়, তা মোটামুটি স্পষ্ট। সমস্যা অন্য কোথাও। (আরো দেখতে পারেন, এক বছরে বাংলাদেশে এক হাজারের বেশি ধর্ষণ )

সিঙ্গাপুরে কোনো মেয়ে ধর্ষিত হলে মানুষ ধর্ষকের বিচার চায়, আর ভারত-বাংলাদেশে নারী ধর্ষিত হলে, তাদের পোশাককে দায়ী করে ধর্ষকের সমর্থক থেকে নীতি নির্ধারকরা সবাই। এখানেই শেষ নয়।

ভারত বা বাংলাদেশে ধর্ষণ বা ইভ টিজিংকে রীতিমত প্রোমোট করা হয়, যেটি অন্য কোথাও হয় বলে আমার জানা নেই। এটি নাটক-সিনেমার মাধ্যমে এমনভাবে আমাদের সমাজে গেঁথে গেছে যে, এর শিকড় উপড়ে ফেলা যাচ্ছে না।

অবাক হচ্ছেন আমার কথা শুনে? ধরুন, আপনি টেলিভিশনে একটি সাবানের বিজ্ঞাপন দিচ্ছেন, আপনার সাবানের বিক্রি বেড়ে যাচ্ছে। আপনি নাটক-সিনেমায় নায়ক-নায়িকার প্রেম দেখাচ্ছেন, কিশোর-কিশোরীরা সেসব দেখে প্রেম করা শিখছে।

তাহলে আপনি যদি, নাটক, সিনেমায় বা কোনো মিউজিক ভিডিওতে রাস্তা-ঘাটে নায়িকাকে বিরক্ত করার দৃশ্য অসাধারণ কোরিওগ্রাফির মাধ্যমে, জনপ্রিয় শিল্পীদের গাওয়া মিউজিকের তালে তালে ফুটিয়ে তোলার চেষ্টা করেন, তবে সাধারণ মানুষ কেন এসব দেখে ধর্ষণ বা ইভ টিজিং-এর প্রতি আকর্ষণ বোধ করবে না?

ছবির কপিরাইট Munir uz Zaman/AFP/Getty
Image caption দেয়াল পোস্টারে বাংলাদেশী সিনেমার প্রচার।

বাংলাদেশ ও ভারতের সিনেমাগুলোতে দেখা যায়, নায়িকা যখন নায়ককে পাত্তা দেয় না, তখন একজন নায়ক তার একপাল বন্ধু নিয়ে নায়িকার পেছনে ছুটছে, বিরক্ত করছে, নায়িকাকে ধাক্কা দিচ্ছে, তার শরীরে হাত দিচ্ছে, নাচ-গান করছে, নায়িকা একা বিরক্ত হচ্ছে বটে, কিন্তু দর্শক সারিতে বসে থাকা মানুষগুলো তা দেখে মজা পাচ্ছে, শিস দিচ্ছে, হাতে তালি দিচ্ছে।

কারণ, কিছুক্ষণ পরেই দেখা যাবে যে ওই উত্যক্তকারীই আসলে সিনেমার নায়ক।

সিনেমায় কেউ খুন করলে বা চুরি করলে, তার শাস্তি হওয়া দেখায় ঠিকই, কিন্তু নায়ক যে নায়িকাকে উত্যক্ত করলো, তার কোনো শাস্তি নেই, কারণ সে তো নায়ক! সেন্সর বোর্ডও নায়িকাকে এভাবে রাস্তা-ঘাটে বিরক্ত করার দৃশ্যগুলো খারাপ চোখে দেখে না।

সিনেমা শেখায়, দলবল নিয়ে নাচগান করে নায়িকাকে বিরক্ত করেই প্রেম করতে হয়! সিনেমার নায়ক মানে তো দর্শকের কাছে সে রোল মডেল, আর প্রতিটি মানুষই তার নিজের জীবনের নায়ক হয়ে উঠতে চায়।

সিনেমার নায়করা যদি এভাবে নায়িকাকে উত্যক্ত করে প্রেম আদায় করে,তবে বাস্তবের নায়করা কেন তাদের অনুসরণ করবে না? দর্শকরা যদি এসব সিনেমা দেখে তাদের ব্যক্তি জীবনে প্রয়োগ করে তাহলে কী হবে?

সিনেমার নায়িকা তো উত্যক্তকারীর প্রেমে পড়ে যায় ঠিকই, কিন্তু বাস্তব জীবনের নায়িকারা হয়ে ওঠে একেকজন তনু, রিশা, নার্গিস অথবা ভারতের নির্ভয়া।

আমার তো মনে হয়, সিনেমায় এসব গানের দৃশ্য দেখতে দেখতেই ইভ টিজিং বা রাস্তা-ঘাটে মেয়েদের উত্যক্ত করা যে একটা অপরাধ, সেই বোধটাই আর জন্ম নিচ্ছে না বিপথগামী তরুণদের মনে।

আচ্ছা, ইংলিশ সিনেমায় যে এমন মসালাদার নাচ-গান নেই, তো ইংলিশ সিনেমা চলছে না? অবশ্যই চলছে। আমি এখন পর্যন্ত যতগুলো ইংরেজি সিনেমা দেখেছি, সেগুলোর একটাতেও দেখিনি যে, নায়িকাকে কোনো উত্যক্তকারী রাস্তায় বিরক্ত করছে এবং তারপর আবার নায়িকা ওই উত্যক্তকারীর প্রেমেই পড়ছে!

ইংলিশ সিনেমাগুলোতে অনেক সময় খুব খোলামেলা দৃশ্য দেখায়, কিন্তু সেখানে যা কিছু হয়, সবই পারস্পরিক সম্মতির ভিত্তিতে হয়। কেউ কাউকে জোর করে প্রেম আদায় করার চেষ্টা করে না।

সত্যি বলতে কী, নায়িকাকে প্রেমে রাজি করানোর জন্য তার পেছনে পেছনে ঘুরে ঘুরে নাচ-গান করার মত এতো সময়ও নেই ইংলিশ সিনেমার নায়কদের। ইংলিশ সিনেমার নায়করা বেশ ব্যক্তিত্ববান, জোর করে প্রেম করার পক্ষে নয় তারা।

আমাদের সমাজের পুরুষরা ব্যক্তি জীবনে একেকজন ইংলিশ সিনেমার নায়ক হয়ে উঠুক, আত্মসম্মান গড়ে তুলুক। মেয়েদের পেছনে ঘুরে ঘুরে প্রেম আদায় করার চেষ্টা না করে, নিজের ব্যক্তিত্ব দিয়ে মেয়েদেরকেই তাদের কাছে টানুক। তাহলে আর নারীর পোশাকের অজুহাত দিয়ে ধর্ষকে পরিণত হবে না তারা।

সম্পর্কিত বিষয়