কাশ্মীরে সেনা অভিযানে বাধা দিলে গুলি : সেনাপ্রধান

শ্রীনগরে সেনা টহল ছবির কপিরাইট Getty Images
Image caption সেনাবাহিনীর কাজে বাধা সৃষ্টি করলে অস্ত্র ব্যবহারের হুমকি দিয়েছেন ভারতের সেনাপ্রধান

ভারত-শাসিত কাশ্মীরে যে সব বেসামরিক লোক সেনাবাহিনীর জঙ্গী-দমন অভিযানে বাধা দিচ্ছেন, তাদের বিরুদ্ধে কড়া ব্যবস্থা নেওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়ে বিতর্ক সৃষ্টি করেছেন দেশের সেনাপ্রধান জেনারেল বিপিন রাওয়াত।

কাশ্মীরে যারা জঙ্গীদের পালাতে সাহায্য করছেন, কিংবা পাকিস্তান ও আইএস-এর পতাকা প্রদর্শন করছেন তাদের বিরুদ্ধে অস্ত্র ব্যবহার করতে ভারতীয় সেনারা এখন থেকে আর দুবার ভাববে না - সেনাপ্রধান একথা বলার পর কাশ্মীরে ও তার বাইরে অনেকেই বলছেন এ ধরনের রাজনৈতিক মন্তব্য করা তার সমীচিন হয়নি।

তবে নিরাপত্তা দৃষ্টিকোণে তার কথায় কোনও ভুল নেই বলেও অনেক প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞর অভিমত।

গত তিনদিনে ভারত-শাসিত কাশ্মীরের হান্ডওয়ারা, বন্দীপোর ও কুলগামে তিনটি আলাদা আলাদা এনকাউন্টারে জঙ্গীদের পিছু ধাওয়া করতে গিয়ে অন্তত ছজন ভারতীয় সেনা সদস্য প্রাণ হারিয়েছেন।

প্রতিটি ক্ষেত্রেই জঙ্গীরা পালানোর সময় স্থানীয় জনতার সাহায্য পেয়েছে বলে অভিযোগ, এলাকার বাসিন্দারা পাথর ছুঁড়ে ভারতীয় সেনাদের বাধা দিয়েছে।

এরকমই একটি ঘটনায় নিহত এক মেজরকে শেষ বিদায় জানানোর সময় ভারতীয় সেনাধ্যক্ষ জানিয়ে দিয়েছেন তাদের ধৈর্যের বাঁধ কিন্তু এখন ভেঙে গেছে।

ছবির কপিরাইট STRINGER
Image caption শ্রীনগরের ৭০ কিলোমিটার দক্ষিণে কুলগামে সেনাবাহিনী জঙ্গী বিরোধী অভিযান চালায় ১২ই ফেব্রুয়ারি

জেনারেল বিপিন রাওয়াত কাশ্মীরের বাসিন্দাদের উদ্দেশে বলেন, "আপনারা যদি বাগে না-আসেন এবং সেনাবাহিনীর কাজে বাধা সৃষ্টি করেন, তাহলে শুনে নিন আমরা এতদিন যেভাবে শান্তিপূর্ণ পথে অভিযান পরিচালনা করে এসেছি তা কিন্তু আর করব না।"

"কিছু যুবক হয়তো সোশ্যাল মিডিয়ার প্রচারণায় বিভ্রান্ত হয়ে বিপথগামী হয়েছে, কিন্তু তারা যদি নিজেদের না-পাল্টায় আমরাও কিন্তু শক্ত হাতে তাদের মোকাবেলা করব। সেনাদের কাজে বাধা এলে আমাদের হাতের অস্ত্র ব্যবহারে আমরা কিন্তু পিছপা হব না।"

যে স্থানীয় যুবকরা জঙ্গীদের সাহায্য করবে কিংবা যাদের পাকিস্তানি ও আইএস পতাকা নিয়ে দেখা যাবে - সেনাবাহিনী তাদের দেশবিরোধী শক্তি বলেও চিহ্নিত করবে বলে জেনারেল রাওয়াত জানিয়ে দিয়েছেন।

তার এই বক্তব্য সামনে আসার পর খোদ কাশ্মীরেই তীব্র প্রতিক্রিয়া হয়েছে। শ্রীনগরে গ্লোবাল ইয়ুথ ফেডারেশন নামে একটি এনজিও চালান স্থানীয় যুবক তৌসিফ রায়না, তিনি বিবিসি বাংলাকে বলছিলেন সেনাপ্রধান এই কথাগুলো না-বললেই ভাল করতেন।

তৌসিফ রায়নার মতে এই বক্তব্য দুর্ভাগ্যজনক - কারণ এই কথাগুলো সেনাপ্রধানের নয়, রাজ্য সরকার বা রাজ্য পুলিশের বলা উচিত।

তিনি বলছিলেন, "সেনাবাহিনী কেন এখানকার আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতিতে সরাসরি হস্তক্ষেপ করবে? এতে কাশ্মীরের গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলো আরও দুর্বল হয়ে পড়বে। আমরা বুঝতে পারছি কাশ্মীরের পরিস্থিতি সেনাবাহিনী থেকে স্থানীয় মানুষ - সবার জন্যই খুব উত্তপ্ত, কিন্তু এই ধরনের অসংবেদনশীল মন্তব্য শুধু লোকের রাগ আর উষ্মাই বাড়াবে।"

কিন্তু এটা যদি একদিকের যুক্তি হয়, অন্য দিকে ভারতের অনেক নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞই মনে করছেন কাশ্মীরের পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছে গেছে যে জেনারেল রাওয়াতের এ কথা বলা ছাড়া কোনও উপায় ছিল না।

ছবির কপিরাইট AFP
Image caption গত তিনদিনে ভারত-শাসিত কাশ্মীরের হান্ডওয়ারা, বন্দীপোর ও কুলগামে তিনটি আলাদা আলাদা এনকাউন্টারে জঙ্গীদের পিছু ধাওয়া করতে গিয়ে অন্তত ছজন ভারতীয় সেনা সদস্য প্রাণ হারিয়েছেন।

যারা এই ধারণায় বিশ্বাস করেন, তাদেরই একজন ভারতীয় সেনার সাবেক মিলিটারি সেক্রেটারি, লে: জেনারেল সৈয়দ আতা হাসনাইন।

তিনি বলছেন, "২০১৫ থেকেই দেখা যাচ্ছে - বিশেষ করে দক্ষিণ কাশ্মীরে - যখনই কোনও জঙ্গীদের গোপন আস্তানায় সেনারা হানা দিচ্ছে, স্থানীয় মানুষজন মসজিদ থেকে মাইক জোগাড় করে বা সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রচার চালিয়ে তাদের ঘিরে ফেলছে - পাথর ছুঁড়ে তাদের বাধা দিচ্ছে।"

"এতে তাদের স্বাভাবিক অভিযান ব্যাহত হচ্ছে, অন্য দিকে তাদের মনোযোগ ঘুরিয়ে দেওয়া হচ্ছে", বলছিলেন লে: জেনারেল হাসনাইন।

কিন্তু যেহেতু ভারতীয় সেনা সাধারণত কোনও রাজনৈতিক মন্তব্য থেকে বিরত থাকে - তাই জেনারেল রাওয়াত যেভাবে পাকিস্তানি বা আইএস পতাকার উদাহরণ টেনেছেন ও অস্ত্র ব্যবহারের হুমকি দিয়েছেন তা অনেককেই বেশ বিস্মিত করেছে।

সম্পর্কিত বিষয়