নির্দোষ কাশ্মীরি যুবকের বারো বছর কাটল জেলে

মুহম্মদ হুসেইন ফাজলি ছবির কপিরাইট বিলাল বাহাদুর
Image caption বারো বছর বাদে ঘরে ফিরেছেন মুহম্মদ হুসেইন ফাজলি

২০০৫ সালে দিওয়ালির সময় দিল্লিতে একের পর এক বোমা বিস্ফোরণে ঘটনায় ধরা পড়েছিলেন মোট তিনজন, তাদের মধ্যে দুজনকে আদালত নিরপরাধ বলে ঘোষণা করেছে।

ওই রায় নিয়ে বিস্ফোরণে নিহতদের পরিবার বা আহতরা ক্ষুব্ধ, কিন্তু আদালতে নিরপরাধ ঘোষিত হওয়ার পরে বিনা দোষে সাজা খাটা এক কাশ্মিরী মুসলমান বলছেন যে তাঁর জীবন থেকে যে বারোটা বছর চলে গেল, সেটা কে ফিরিয়ে দেবে?

শ্রীনগরের শাল প্রস্তুতকারী মুহম্মদ হুসেইন ফাজলির বিয়ের কথা চলছিল ধরা পড়ার সময়ে। বাড়ি ফিরে মি. ফাজলি বিবিসিকে এক সাক্ষাতকার দিয়েছেন।

মুহম্মদ হুসেইন ফাজলি আর রফিক আহমেদ শাহকে ২০০৫ সালে দিল্লির সিরিয়াল বিস্ফোরণে জড়িত থাকার অভিযোগে গ্রেপ্তার করেছিল পুলিশ। ওই বিস্ফোরণগুলিতে মৃত্যু হয়েছিল মোট ৬৮ জনের, আহত হন আরও বহু মানুষ।

কিন্তু এত বছর ধরে মামলা চলার পরে সম্প্রতি দিল্লির এক নিম্ন আদালত ঘোষণা করেছে যে ওঁরা দুজনেই নির্দোষ। মি ফাজলি শ্রীনগরের সোরহা এলাকায় তাঁর বাড়িতে ফিরে গেছেন।

এক যুগ পরে তার দেখা হয়েছে বাবা মায়ের সঙ্গে, কারণ মাঝের এতগুলো বছরে টাকাপয়সার অভাবে একবারও ছেলেকে দেখতে দিল্লির কারাগারে যেতে পারেননি তারা।

বাড়ির এক কোণে থাকা একটা পুরনো আমলের টেলিফোনই ছিল ছেলের সঙ্গে যোগাযোগের একমাত্র উপায়।

ছবির কপিরাইট বিলাল বাহাদুর
Image caption বাবা মায়ের সঙ্গে মুহম্মদ হুসেইন ফাজলি

বাড়ির ছোট ছোট বাচ্চাগুলোকে তো চিনতেই পারছেন না মি. ফাজলি। তিনি বলছিলেন, "বাড়ি ফিরে গিয়ে যখন বাবা মা কে দেখলাম, তখন উপলব্ধি করতে পারলাম যে কী হারিয়েছি এতগুলো বছরে! মা বিছানায় শুয়ে আছেন, বাবা একটা চোখে দেখতে পান না। ওঁদের ওপর দিয়ে যা গেছে এই বারো বছরে, সেটা কী করে ফিরে আসবে?"

"আর আমার নিজের জীবনটাওতো শেষ হয়েই গেছে", বলছিলেন ১২ বছর পরে সদ্য জেল থেকে মুক্তি পাওয়া মুহম্মদ হুসেইন ফাজলি।

শ্রীনগরের বাড়ি থেকে যখন পুলিশ তাঁকে নিয়ে গিয়েছিল বারো বছর আগে, তখন বলা হয়েছিল যে কয়েক মিনিটের জন্য নিয়ে যাওয়া হচ্ছে - সামান্য কিছু জিজ্ঞাসাবাদের জন্য। তারপরে ছেড়ে দেওয়া হবে।

মি. ফাজলিকে যে কেন গ্রেপ্তার করা হল, তারপরে কোথায় নিয়ে যাওয়া হল, সে সব কিছুই তিনি জানতে পারেন নি।

বেশ কিছুদিন পরে এক সাংবাদিক তাঁকে জানান যে কোন অপরাধে গ্রেপ্তার করে তাঁকে দিল্লিতে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। তারপর থেকে ১২ বছর জেলেই কাটিয়েছেন মি. ফাজলি।

যেদিন আদালত তাঁকে নির্দোষ বলে ঘোষণা করল, সেই দিন কী মনে হচ্ছিল?

এই প্রশ্নের জবাবে মি. ফাজলি বিবিসিকে বলছিলেন, "সেদিন আমার জীবন-মরণের ফয়সালা হওয়ার ছিল। একটাই ভরসা ছিল যে আল্লাহ নিশ্চই ন্যায়বিচার করবেন আমার সঙ্গে.. কারণ আমি নিজে জানি যে কোনও অপরাধ করিনি।"

"যে দোষ করিনি, তার জন্য জেল খাটছিলাম আমি। কিন্তু যে বারোটা বছর আমার জীবন থেকে হারিয়ে গেল, সেটা কে ফিরিয়ে দেবে?" অসহায়ভাবে প্রশ্ন করেন তিনি।

ছবির কপিরাইট বিলাল বাহাদুর
Image caption জীবনের বারোটা বছর কে আমায় ফিরিয়ে দেবে? প্রশ্ন মুহম্মদ হুসেইন ফাজলির

যখন গ্রেপ্তার হয়েছিলেন এই কাশ্মীরি শাল প্রস্তুতকারক, সেই সময়ে তাঁর বয়স ছিল ৩১। বাড়িতে বিয়ের কথাবার্তা চলছিল।

এখন তার বয়স হয়েছে তেতাল্লিশ, তারপরে আবার ১২ বছর জেল খেটে আসা ছেলে ... মি. ফাজলির বাবার আক্ষেপ এরকম ছেলের সঙ্গে কে মেয়ের বিয়ে দেবে!

আদালত তাঁকে নির্দোষ ঘোষণা করার পরে কি এখন সেইসব পুলিশকর্মীদের বিরুদ্ধে তিনি অভিযোগ দায়ের করবেন বা ক্ষতিপূরণ চাইবেন?

মুহম্মদ হুসেইন ফাজলির জবাব, "ন্যায় বিচার তো এটাই যে আদালত আমাকে নির্দোষ বলে দিয়েছে। আমি যদি দোষী হতাম তাহলে তো কোর্ট আমাকে সাজা দিত! কিন্তু যারা আমাকে ফাঁসিয়ে দিল, ১২ বছর জেল খাটালো, তাদেরও তো এই জবাবদিহি করা দরকার যে কেন একজন নিরপরাধ ব্যক্তির সঙ্গে তারা এটা করল!"

কারণটাও অবশ্য জানেন তিনি - "কাশ্মীরবাসী মুসলমান হওয়ার জন্যই ওই সাজা আমাকে পেতে হয়েছে", বলছিলেন মুহম্মদ হুসেইন ফাজলি।

ভারতে আইনজীবীরা বলছেন, আদালত কাউকে নিরপরাধ বলে মুক্তি দিলেও বিচারক বা ওই গ্রেপ্তারিতে জড়িত কোনও পুলিশ অফিসারের সাজার সুযোগ নেই। ক্ষতিপূরণ পাওয়াও সহজ নয়।

অন্যদিকে ঘটনায় নিহতদের পরিবার বা আহতরা বলছেন, যে তিনজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল তার মধ্যে দুজনই ছাড়া পেয়ে গেলেন। অন্যজনেরও এমন সাজা হল যেটা তিনি ইতিমধ্যেই খেটে ফেলেছেন - ফলে তাঁরা আর তাহলে কীভাবে ন্যায় বিচার পেলেন?

সম্পর্কিত বিষয়