অভিজিত হত্যার দু বছর পর লেখক-ব্লগাররা কতটা স্বাধীন?

ছবির কপিরাইট BBC BANGLA
Image caption লেখক-ব্লগার অভিজিৎ রায়। ২০১৫ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারি ঢাকায় একুশে বইমেলার কাছে তাকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়।

মার্কিন প্রবাসী বিজ্ঞানমনস্ক লেখক ও ব্লগার অভিজিৎ রায় ঢাকায় হামলাকারীদের চাপাতীর কোপে নিহত হয়েছিলেন আজ (রোববার) থেকে ঠিক দু' বছর আগে।

তিনি স্ত্রী রাফিদা বন্যা আহমেদকে সাথে নিয়ে বাংলা একাডেমির বইমেলা থেকে বাসায় ফেরার পথে হামলার শিকার হন।

মূলত লেখালেলেখির কারণেই মি. রায়কে হত্যা করা হয়েছিল।

তিনি এমন একসময়ে বাংলাদেশে এসেছিলেন এবং বইমেলায় গিয়েছিলেন যখন ধারাবাহিকভাবে ভিন্নমতাবলম্বীরা চোরাগোপ্তা হামলা হত্যাকাণ্ডের শিকার হচিছলেন।

এই চোরাগোপ্তা হামলার শুরুটা ছিলো একজন ব্লগারকে দিয়ে। ২০১৩ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে হত্যা করা হয় ব্লগার আহমেদ রাজীব হায়দারকে।

সেই থেকে বাংলাদেশের অনেক ব্লগারই সাবধানে চলেন, বুঝেশুনে লেখেন।

যেমনটি লেখালেখিতে স্বেচ্ছা-সেন্সরশিপ আরোপ করেছিলেন বলে জানালেন সুপরিচিত ব্লগার, আরিফ জেবতিক।

কিন্তু বেশ কিছুদন হল এ ধরণের চোরাগোপ্তা হত্যাকাণ্ডের কথা আর শোনা যায় না।

এখন কি তাহলে হাত খুলে লিখছেন মি. জেবতিক? "আমি খুব কমই লিখছি", বলছিলেন মি. জেবতিক, "কারণ পরিবেশ পরিস্থিতি ভাল না"।

"নিজস্ব সেল্ফ-সেন্সরশিপে অনেক ব্লগারের মত আমাকেও থাকতে হচ্ছে, কারণ আমরা নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছি এবং নিরাপত্তাহীন অবস্থায় যে খুব বেশী মন খুলে, হাত খুলে লেখালেখি করা যাবে সেটাতো সম্ভব না"।

Image caption হত্যাকান্ডের শিকার কজন লেখক-ব্লগার

অভিজিৎ রায়কে হত্যার মধ্যে দিয়েই যে তার উপর হামলাকারীদের মিশন শেষ হয়ে যায়নি, তার প্রমাণ ওই বছরই অক্টোবর মাসে মি. রায়ের লেখা বইয়েরই একজন প্রকাশক ফয়সাল আরেফীন দিপনকে কুপিয়ে হত্যার ঘটনা।

এই হামলার প্রভাব পরবর্তীতে বাংলাদেশের বই পুস্তক প্রকাশনা অঙ্গনে দেখা গেছে।

এমনকি এবছরও বাংলা ভাষার বিতর্কিত ও নির্বাসিত একজন লেখিকা তসলিমা নাসরিনের একটি বই প্রকাশ করতে গিয়ে নিজে থেকেই কি ধরণের সেন্সরশীপ করেছেন, সেকথা বিবিসি বাংলাকে বলছিলেন শ্রাবন প্রকাশনীর কর্ণধার রবিন আহসান।

তিনি বলছিলেন 'সকল গৃহ হারাল যার' শিরোনামের বইটি মূলত গত এক বছর বাংলাদেশের বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় ছাপা হওয়া তসলিমা নাসরিনের লেখা কলামের একটি সমগ্র।

কিন্তু পত্রিকায় প্রকাশিত সেই কলামগুলো বই আকারে ছাপতে গিয়েও এর থেকে অন্তত দশ পৃষ্ঠা বাদ দিয়ে দিয়েছেন তিনি, যেগুলো ছিল ধর্ম নিয়ে আলোচনা।

মি. আহসান বলছেন, "সমাজের মধ্যে যে আতঙ্ক তারা তৈরি করতে পেরেছে, সেটা কিন্তু বাস্তব সত্য। কারণ অনেক লেখালেখি হচ্ছে না, ব্লগাররা দেশ ছেড়ে পালিয়ে যাচ্ছেন, প্রকাশকেরা ওই রকম বই ছাপাতে চাচ্ছেন না। এখন ফুল-পাখি-লতা-পাতা এই ধরণের বইই বেশী ছাপানো হচ্ছে"।

প্রাণভয়ে ভীত হয়ে বাংলাদেশের যে কজন ব্লগার গত কয়েক বছরে দেশ ছেড়েছেন, তাদের অনেকেই ইউরোপের বিভিন্ন দেশে এখন রাজনৈতিক আশ্রয় নিয়ে অবস্থান করছেন।

এদেরই একজন, সুপরিচিত ব্লগার অমি রহমান পিয়াল। তিনি পরিবার নিয়ে বাস করছেন সুইজারল্যান্ডে। তিনি সেখানে থাকলেও বাংলাদেশের দিকে যে তার তীক্ষ্ম নজর, তার প্রমাণ মেলে তার ফেসবুক টাইমলাইনের বিভিন্ন লেখালেখিতেই।

তিনি কি দেখছেন?

অমি রহমান পিয়াল বলছেন, "পরিবেশ পরিস্থিতির কোন উন্নতি তো দেখতে পাচ্ছি না।

"যদি হত্যাকাণ্ডগুলোর সঠিক বিচার হতো, তাহলেতো একটা দৃষ্টান্ত সৃষ্টি হত। লেখকরাও একটু নিরাপত্তা বোধ করত। যারা এদের বিরুদ্ধে আছে তারাও একটু সাবধান হত। কিন্তু এখনতো তার কোন নমুনা দেখতে পাচ্ছি না"।