প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খানের জন্য রান্না বন্ধ করে দিয়েছিলেন বাবুর্চিরা

ছবির কপিরাইট Getty Images
Image caption ইয়াহিয়া খান

১৯৭১ সালের মার্চ মাসের একদিন পূর্ব পাকিস্তানে অসহযোগ আন্দোলনকারীদের কাছে প্রেসিডেন্টে ইয়াহিয়া খানের দপ্তর থেকে একটি টেলিফোন আসলো।

পাকিস্তান সেনাবাহিনীর প্রিন্সিপাল স্টাফ অফিসার লে. জেনারেল এস জি এম পীরজাদা সে টেলিফোনে আন্দোলনকারীদের প্রতি একটি অনুরোধ জানালেন। সে অনুরোধ বেশ ব্যতিক্রমী।

জেনারেল পীরজাদা জানালেন, অসহযোগ আন্দোলনের কারণে প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খানের বাসায় রান্না-বান্না বন্ধ হয়ে গেছে।

কারণ শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে অসহযোগ আন্দোলনের প্রতি সমর্থন জানিয়ে প্রেসিডেন্টের বাড়িতে বাবুর্চিরা রান্না বন্ধ করে দিয়েছেন।

জেনারেল পীরজাদা অনুরোধ করলেন, যাতে অসহযোগ আন্দোলনকারীরা বাবুর্চিদের রান্নার কথা বলে দেয়।

বাংলাদেশের স্বাধীনতার যুদ্ধ শুরুর আগে শেখ মুজিবুর রহমানের ডাকে অসহযোগ আন্দোলন কতটা তীব্র এবং জনসমর্থন ছিল, এ ঘটনা সেটি প্রমাণ করে। শেখ মুজিবুর রহমানের সেই সময়ের অন্যতম ঘনিষ্ঠ ব্যক্তি ড. কামাল হোসেন বিবিসি বাংলার কাছে সে সময়ের কিছু ঘটনার বর্ণনা দিয়েছেন। ড: হোসেনের বর্ণনায় এ ঘটনা উঠে এসেছে।

"জেনারেল পীরজাদা ফোন করে বললেন, দেখেন আপনারা বাঙালিরা তো অতিথিদের ব্যাপারে দুর্বল থাকেন। ইয়াহিয়া তো আপনাদের অতিথি হিসেবে এসেছে। তিনদিন ধরে কোন রান্না হচ্ছে না । বাবুর্চিরা রান্না করবে না। তারা অসহযোগ করছে। আপনারা যদি একটু অনুমতি দেন তাহলে বাবুর্চিরা ওনার (প্রেসিডেন্টের) জন্য কিছু গরম খাবার তৈরি করতে পারে," বলছিলেন ড: কামাল হোসেন।

তিনি বলেন, বিষয়টি শেখ মুজিবুর রহমানকে জানানো হলো। তখন তিনি ইয়াহিয়া খানের জন্য ডাল এবং রুটি তৈরির অনুমতি দিলেন।

ছবির কপিরাইট BBC BANGLA
Image caption বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠাতা রাষ্ট্রপতি শেখ মুজিবুর রহমানের ঘনিষ্ঠ সহচর ছিলেন ড: কামাল হোসেন

প্রেসিডেন্টের বাসায় রান্না বন্ধের পাশাপাশি ঢাকা ক্যান্টনমেন্ট সামরিক বাহিনীর বেতন পর্যন্ত বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। কারণ যে ব্যাংক থেকে সামরিক বাহিনীর জন্য বেতন উত্তোলন করা হতো সে ব্যাংকে কর্মরত বাঙালীরা অসহযোগ আন্দোলনের প্রতি সমর্থন জানিয়ে কাজ বন্ধ করে দিয়েছিলেন।

ড: কামাল হোসেনের বর্ণনায়, ক্যান্টনমেন্ট থেকে টেলিফোন করে তাদের কাছে অনুরোধ করা হয় যাতে সামরিক বাহিনীর বেতন উত্তোলন করা যায়।

১৯৭০ সালে শেষের দিকে সাধারণ নির্বাচনে আওয়ামী লীগে নিরঙ্কুশ বিজয়ী হবার পর সবাই ৩রা মার্চের জাতীয় অধিবেশনের জন্য অপেক্ষা করছিলো। তখন ১লা মার্চে তৎকালীন পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান সেই অধিবেশন অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত ঘোষণা করেছিলেন। তাৎক্ষনিক-ভাবে এর বিরুদ্ধে ফুঁসে উঠেছিলো পূর্ব পাকিস্তানের মানুষ।

স্বত:স্ফূর্তভাবে সবজায়গায় প্রতিবাদ শুরু হয়ে যায়।হাজার-হাজার মানুষ ঢাকার রাস্তায় নেমে প্রতিবাদ শুরু করে। এমনকি স্টেডিয়ামের ক্রিকেট খেলা ছেড়ে দর্শকরা রাস্তায় নামে। ১লা মার্চ বিকেলে শেখ মুজিবুর রহমান অসহযোগ আন্দোলনের ঘোষণা দিলেন।

২রা মার্চ থেকে ২৫শে মার্চ পর্যন্ত যে অসহযোগ আন্দোলন চলাকালে পাকিস্তান সরকার তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের জনগণের কাছে থেকে কোন ধরনের সহায়তা পায়নি ।

তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের অবিসংবাদিত নেতা শেখ মুজিবুর রহমানের ডাকে অসহযোগ আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় রক্তাক্ত এক যুদ্ধের মধ্য দিয়ে স্বাধীন বাংলাদেশের জন্ম হয়।