বাংলাদেশে সড়ক দুর্ঘটনাতে কার দায় কতটা?

ছবির কপিরাইট ফোকাসবাংলা
Image caption এই দুর্ঘটনাতেই প্রাণ হারিয়েছিলেন চলচ্চিত্রকার তারেক মাসুদ

বাংলাদেশে প্রায় প্রতিদিনই দুর্ঘটনায় মানুষ প্রাণ হারাচ্ছে এবং আহত হয়ে পঙ্গুত্ব বরণ করছে। সড়ক দুর্ঘটনায় বাংলাদেশে রোজ যত লোক প্রাণ হারান বা জখম হন, সেই পরিসংখ্যান শিউড়ে ওঠার মতো।

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় বা বুয়েটের দুর্ঘটনা গবেষণা প্রতিষ্ঠান এআরআই-এর হিসেবে গত দশ বছরে বাংলাদেশে ২৯ হাজার ৪৩২টি দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছে প্রায় ২৬ হাজার ৬৮৬ জন। এসব দুর্ঘটনায় আহত হয়েছেন ২১ হাজার ৫৪৮ জন।

কিন্তু বাংলাদেশে দুর্ঘটনার মূল কারণগুলো কী এবং সমস্যাগুলোই বা ঠিক কোথায়?

এ প্রশ্নের জবাবে এআরআই-এর প্রাক্তন পরিচালক অধ্যাপক শামসুল হক বলেন, "দুর্ঘটনার অনেক কারণ থাকে। চালক-সর্বস্ব চিন্তাটা একটা অসুস্থ চিন্তা। এটা প্রকৃত কারণ না। এটা উপসর্গ।"

"চালকের যেমন ভুল আছে, তেমনি বিআরটিএ-র ভুল আছে, যারা সড়ক নির্মাণ করেন তাদের গাফিলতি ও ভুল আছে এবং এখানে যারা আইন প্রয়োগকারী সংস্থা আছে তাদেরও ভুল আছে। মালিকেরও ভুল আছে।"

মি হক আরও বলছিলেন, "ইনভেষ্টিগেশন থেকে আমরা যেটা পাই, প্রত্যেকেরই কিন্তু কিছু না কিছু গাফিলতির জন্য দুর্ঘটনা ঘটে। তবে এর মধ্যে চালকদের ভেতর যে অসুস্থ প্রতিযোগিতা এটা কিন্তু সবচেয়ে বড় কারণ বলে আমরা দেখতে পাই।"

ছবির কপিরাইট বিবিসি বাংলা
Image caption এআরআই-এর প্রাক্তন পরিচালক অধ্যাপক শামসুল হক

এদিকে বাংলাদেশে সড়ক দুর্ঘটনা মৃত্যুর জন্য সম্প্রতি দুজন চালককে সাজা দেয়ার পর পরিবহন শ্রমিকরা ধর্মঘট ডাকে। এতে ব্যাপক ভোগান্তি হয় সারা দেশের মানুষের।

বিপ্লবী সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ আলী রেজা মনে করছেন আসলে পর পর দুটি সাজা সারা দেশের শ্রমিকদের আতঙ্কিত করেছে।

তারেক মাসুদের দুর্ঘটনার বিষয়টিকে সামনে এনে তারা বলছেন এজন্য শুধু চালককে সাজা দেয়াটাও শ্রমিকরা মানতে পারেনি।

তিনি বিবিসিকে বলেন, "বুয়েটের থেকে বলা হইছে ঢাকা আরিচা রোড অগ্রহণযোগ্য, গাড়ি চলার উপযুক্ত না, বাঁকগুলি ডেঞ্জারাস। তাইলে রাস্তাগুলো কেন সংস্কার করা হলো না। না করার কারণেই তো মিশুক মুনীর সেখানে দুর্ঘটনার শিকার হলো!"

"সেই ইঞ্জিনিয়ারদের বিরুদ্ধে কোনো অ্যাকশন নিছে? তারপর ওই গাড়ির ফিটনেস সার্টিফিকেট নাই, ছিল না। ফিটনেস তো মালিকের করা। ফিটনেস দেখাতো চালকের দায়িত্ব না", বলছিলেন তিনি।

মি. রেজা বলেন সব কিছু ঠিক করার পর সড়কে দুর্ঘটনায় যদি চালকের গাফিলতি থাকে তাহলে সাজা হতেই পারে। "শাস্তি অন্যদের যা হবে আমাদেরও তা হবে।"

ছবির কপিরাইট বিবিসি বাংলা
Image caption সম্প্রতি পরিবহন শ্রমিকদের ধর্মঘটে প্রায় অচল হয়ে গিয়েছিল বাংলাদেশের সড়ক যোগাযোগ

এদিকে দেখা যাচ্ছে বাংলাদেশে প্রচলিত আইন অনুযায়ী সড়ক দুর্ঘটনায় সর্বোচ্চ সাজা তিন বছর কারাদণ্ড। জানা যাচ্ছে পাশ্ববর্তী দেশ ভারতে এ শাস্তি দুবছর। আর যুক্তরাজ্যে সর্বোচ্চ সাজার মেয়াদ ১৪ বছর পর্যন্ত।

কিন্তু বাংলাদেশে সড়ক দুর্ঘটনার মামলায় দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির নজির খুবই কম।

বুয়েটের অধ্যাপক শামসুল হক বলেন, "শাস্তি কম বা বেশি এটা ডেফিনেটলি এটা দেখার বিষয় আছে। বেশি থাকলে দৃষ্টান্তমূলক হয়, পেইনফুল হয়, মানুষ এই ভুলের পুনরাবৃত্তি করেনা।"

"কিন্তু যে আইন আমরা মানাতেই পারি না সেটা থেকে কী লাভ? যেমন আমরা বসে বসে সিদ্ধান্ত নেই মহাসড়কে সিএনজি চলবে না, কিন্তু চলছেই! আমরা কোনো আইনই মানাতে পারি না পুলিশকে দিয়ে।"

প্রতিনিয়ত দুর্ঘটনা এবং বিপুল সংখ্যক মানুষের প্রাণহানির পরও বাংলাদেশে সড়ক নিরাপত্তায় কার্যকর উদ্যোগে ঘাটতি দেখছেন গবেষকরা।

এছাড়া দুর্ঘটনায় দায়ীদের সাজা দিতে কঠোর আইন এবং এর প্রয়োগ নিশ্চিত করার জোর দাবিও রয়েছে বাংলাদেশে।

সম্পর্কিত বিষয়