ইতিহাসের সাক্ষী
আপনার ডিভাইস মিডিয়া প্লেব্যাক সমর্থন করে না

হোয়াইট হাউসে কিভাবে হয় ক্ষমতার পালাবদল?

কিছুদিন আগেই আমেরিকায় নতুন প্রেসিডেন্ট হয়েছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প, বিদায় নিয়েছেন বারাক ওবামা।

প্রতি চার বছর পর প্রেসিডেন্ট নির্বাচন হয় যুক্তরাষ্ট্রে - নতুন প্রেসিডেন্ট আসেন, পুরোনো জন প্রেসিডেন্ট বিদায় নেন ।

কিন্তু, এই যাওয়া আসার মাঝখানের সময়টায় কি ঘটে? কি ভাবে হয় ক্ষমতা ও দায়িত্বের হাত বদল?

এসব নিয়মকানুন যিনি নতুন করে লিখেছিলেন - সেই সেনেটর টেড কফম্যানের সাথে কথা বলেছেন বিবিসির রেবেকা কেসবি ।

"হোয়াইট হাউসের ওয়েস্ট উইং এমনই একটা জায়গা - যে এর ভেতর ঢুকলে আপনার গায়ে কাঁটা দেবে। এর ইতিহাস, এবং এ কাজের যে দায়িত্ব - তার এক অন্যরকম অনুভুতি। আপনি উপলব্ধি করবেন যে আপনি যুক্তরাষ্ট্রের ভবিষ্যত গতিপথ নির্ধারণ করবে এমন একটা কাজ করছেন" - বলছিলেন টেড কফম্যান।

ছবির কপিরাইট Pool
Image caption হোয়াইট হাউসে নতুন প্রেসিডেন্ট হিসেবে ডোনাল্ড ট্রাম্পকে স্বাগত জানাচ্ছেন বারাক ওবামা

বারাক ওবামা যখন ২০০৮ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচন জিতলেন, টেড কফম্যান তখন ছিলেন ভাইস প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের প্রধান রাজনৈতিক উপদেষ্টা।

"একটি নতুন প্রশাসনের শুরুর দিকটা এক দারুণ অভিজ্ঞতা। ২০০৮এ আমি সেই পরিবর্তনের সময়টার কাজে জড়িত ছিলাম। বারাক ওবামা ও জো বাইডেন নির্বাচনে জয়ী হয়েছেন মাত্র তিন দিন হলো। আমি একটা ঘরে ১০ -১২ জন লোক নিয়ে বসতে শুরু করলাম, আলোচনা শুরু করলাম কে পররাষ্ট্রমন্ত্রী হবেন, এটর্নি জেনারেল কে হবে - কি কি বিষয় নিয়ে আমাদের কাজ করতে হবে। আমি প্রেসিডেন্ট ওবামা এবং ভাইস প্রেসিডেন্ট বাইডেনসহ আরো কয়েকজনের এর সাথে নিয়মিত বসছিলাম, এবং এসব পরিকল্পনাগুলো করছিলাম। এটা ছিল আমাদের জীবনের একটা সেরা সময় ।"

আমেরিকান গণতন্ত্রের একটা মূল দিক হলো শান্তিপূর্ণ ক্ষমতার হস্তান্তর। মার্কিন সংবিধানেই এটা বলা আছে যে নভেম্বর মাসের প্রথম মঙ্গলবার নির্বাচন হতে হবে, আর প্রেসিডেন্ট শপথ নেবেন জানুয়ারির ২০ তারিখ। ফলে নতুন সরকারে যারা আসবেন তাদের জন্য তৈরি হবার সময় হচ্ছে মাত্র ৭০ দিনের মতো। আর এই যে পরিবর্তনটা হয় তা শুধু দুজন লোকের মধ্যে সীমিত থাকে না।

ছবির কপিরাইট JIM WATSON
Image caption হোয়াইট হাউস ছেড়ে যাচ্ছেন বারাক ওবামা

"আমাদের একটা বিশাল আমলাতন্ত্র আছে। কিন্তু এর সর্বোচ্চ স্তরে ফেডারেল সরকারের যে ২ হাজার পদ আছে - একজন নতুন প্রেসিডেন্ট এসেই এতে পরিবর্তন আনেন। এটা অনেকটা একটা বিরাট কর্পোরেশনের মতো। যেমন ধরুন, আপনি জেনারেল মোটর্সের নতুন সি ই ও বা প্রধান নির্বাহী হিসেবে যখন অফিসে ঢুকছেন, ঠিক তখনই কিন্তু প্রায় দু হাজার ম্যানেজার পেছনের দরজা দিয়ে বেরিয়ে যাচ্ছেন। তাই আপনাকে নতুন দু হাজার ম্যানেজার নিয়োগও করতে হবে, আবার এর মধ্যেই আপনাকে প্রতিষ্ঠানটি চালাতে হবে, নতুন গাড়ি বানাতে হবে, বিক্রি করতে হবে, বিজ্ঞাপন দিতে হবে - সব কাজই করতে হবে। "

ইতিহাস বলে কিছু কিছু দায়িত্ব হস্তান্তর খুব ভালোভাবেই হয়ে গেছে। এর একটা ছিল জর্জ বুশের পর বারাক ওবামার দায়িত্ব গ্রহণের সময়। অর্থনৈতিক সংকটের মধ্যেও এটা হয়েছিল খুবই সহযোগিতামূলক পরিবেশে। কিন্তু তার আগের বার - যখন বিল ক্লিনটনের বিদায়ের পর জর্জ বুশ ক্ষমতা গ্রহণ করেছিলেন - তখন ব্যাপারটা ছিল ঠিক উল্টো। মোটেও সৌহার্দ্যপূর্ণ ছিল না।

"আমার স্পষ্ট মনে আছে যে প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশের দৃঢ় অঙ্গীকার ছিল - যেন ক্ষমতার হস্তান্তরের প্রক্রিয়া সুষ্ঠুভাবে হয়, যেন তিনি নিজে যখন হোয়াইট হাউসে ঢুকেছিলেন - সেই সময়টার মতো না হয়। "

ছবির কপিরাইট The White House
Image caption ওভাল অফিসে জর্জ ডব্লিউ বুশ ও বারাক ওবামা

যখন রিপাবলিকান জর্জ ডব্লিউ বুশ সামান্য ব্যবধানে ২০০০ সালের নির্বাচন জিতলেন, তার দল হোয়াইট হাউসে এসে দেখলেন - সেখানে নানা ধরণের ফাঁদ পাতা রয়েছে, জিনিসপত্র ভেঙে-চুরে রাখা হয়েছে, লোককে বোকা-বানানোর, ঠাট্টা-বিদ্রুপের নানা-রকম আয়োজন করে রাখা হয়েছে। এবং সেগুলো নাকি করে রেখে গেছেন ডেমোক্র্যাট প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটনের স্টাফরা।

"হোয়াইট হাউসে পুরুষদের বাথরুমে দেখা গেছে কারা যেন দেয়ালে নানা ধরণের কথা লিখে রেখে গেছে - আক্রমণাত্মক এবং অশ্লীল সব কথাবার্তা - যেগুলো প্রেসিডেন্ট বুশের জন্য অবমাননাকর। অফিসের ডেস্কগুলোতে তৈলাক্ত এবং আঠালো কিছু একটা জিনিস ঢেলে দিয়ে সেগুলো নষ্ট করে রাখা হয়েছে। টেলিফোনের এ্যানসারিং মেশিনে অশ্লীল বার্তা রেখে যাওয়া হয়েছে।"

"বেশ কিছু কম্পিউটারের কিবোর্ড থেকে ডব্লিউ অক্ষরটা খুলে নেয়া হয়েছে, বা ওটাকে চেপে উল্টো করে আটকে দেয়া হয়েছে। একটি বিশেষ ঘরে টেলিফোন এক্সটেনশন কাজ করছিল না।"

"সব প্রেসিডেন্টেরই প্রথম কয়েকটা সপ্তাহ নানা অসুবিধার মধ্যে দিয়ে কাটাতে হয়। জর্জ ডব্লিউ বুশকে ক্ষমতা গ্রহণের কয়েক মাস পরই ১১ই সেপ্টেম্বরের হামলা মোকাবিলা করতে হয়েচে। আর তার শেষ সময়টায় এমন একটা অর্থনৈতিক সংকট দেখা দিয়েছিল যা পশ্চিমা পুঁজিবাদের ভিত্তিকেই হুমকির মধ্যে ফেলে দিয়েছিল। ওয়াশিংটনের রাজনৈতিক এলিট শ্রেণীর জন্য দুটোই ছিল কঠিন অভিজ্ঞতা। এই প্রেক্ষাপটেই প্রেসিডেন্ট ওবামা ২০১০ সালেল টেড কফম্যানকে বললেন, কিভাবে এই ক্ষমতার পালাবদল প্রক্রিয়া উন্নত করা যায় - তার নিয়ে বিভিন্ন দলের মধ্যে আলোচনার উদ্যোগ নিতে।"

ছবির কপিরাইট Win McNamee
Image caption বারাক ওবামা ও ডোনাল্ড ট্রাম্প

"যে কোন গণতন্ত্রেই যে অসুবিধাটা হতে পারে তা হলো - একেকটা সময় আসে যখন কে যে দেশটা চালাচ্ছে - এটা আপনার বন্ধু, বা শত্রু বা গোটা দুনিয়া - কেউই বুঝতে পারে না। এটা নিরাপত্তার দিক থেকে খুবই বিপজ্জনক। যেমন মনে করুন ১১ই সেপ্টেমবরের হামলাটা যদি জানুয়ারির ২৫ তারিখ ঘটতো, তাহলে কি হতো?"

"২০০৮ সালে - যখন একটা অর্থনৈতিক সংকট চলছে তখন একজন অর্থমন্ত্রী বা বিভিন্ন নিয়ন্ত্রক সংস্থার প্রধানদের আপনার খুবই দরকার। তাদের পদ গুলো যত তাড়াতাড়ি সম্ভব পূরণ করা দরকার। আমাদের সবারই মনে হচ্ছিল যে আমাদের কিছু একটা করা দরকার। কারণ আপনি বুঝতে পারছেন একটা কিছু ঘটতে যাচ্ছে, এবং সেটা একটা বিপদ ঘটাবার আগেই আপনাকে একে থামাতে হবে। এমন সব লক্ষণ দেখা যাচ্ছিল যে নতুন প্রশাসন যদি তৈরি না থাকে তাহলে খুব খারাপ একটা অবস্থা তৈরি হতে পারে।"

" একটা সমস্যা ছিল - রাজনৈতিক কারণে নির্বাচন হয়ে যাবার পরই শুধু এই পালাবদলের প্রক্রিয়া শুরু করা যেতো, তার আগে নয়। এটা স্পষ্ট ছিল যে বেশি সময় নেই। আমি রিপাবলিকানদের সাথে বসলাম। আলোচনা করলাম, এই ক্ষমতা হস্তান্তর সুষ্ঠুভাবে করার জন্য কি করা যায়। সবচেয়ে বড় যে সিদ্ধান্তটা আমরা নিলাম তা হলো - অগাস্ট মাসে যখন প্রধান দলের প্রার্থীদের মনোনয়ন চুড়ান্ত হয়ে যাবে, তখন থেকেই পালাবদলের প্রক্রিয়া শুরু হয়ে যাবে - এবং ফেডারেল সরকারের সব বিভাগকেই একটা ক্ষমতার পালাবদলের পরিকল্পনা তৈরি করতে হবে - যাতে তারা পরবর্তী সরকারের জন্য তৈরি থাকে। কাজেই ৭০ দিনের পরিবর্তে আমরা ১৭০ দিন সময় হাতে পেলাম।"

"কিন্তু এ বছর ব্যাপারটা হচ্ছে ভিন্ন। কারণ প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পর যে সহযোগী এবং উপদেষ্টারা আসছেন - তারা ঐতিহ্যগত রাজনৈতিক জগত থেকে আসছেন না। অনেকেই হয়তো সরকারি পদে কাজ করেন নি।"

কফম্যানের বিল তৈরির সময় কি এরকম একটা পরিস্থিতির কথা ভাবনায় ছিল?"

ছবির কপিরাইট JEWEL SAMAD
Image caption হোয়াইট হাউসের ওভাল অফিস

"না, তা ছিল না। এটা কোন আদর্শ পরিস্থিতি নয়। আমরা ক্ষমতার পালাবদল নিয়ে বৈঠক করেছিলাম। কিন্তু এটা স্পষ্ট বোঝা গিয়েছিল যে মি. ট্রাম্পের টিম এই পালাবদলের সময় অসুবিধায় পড়বে। কারণ, তাদের প্রচারাভিযানের দলে এমন লোক বেশি ছিল না যাদের ফেডারেল সরকারের কাজ করার অভিজ্ঞতা আছে।"

"শুধু তাই নয়, প্রচারাভিযানের মাঝখানে মি. ট্রাম্প তার টিমকে বরখাস্তও করলেন। ফলে আবার নতুন করে সব শুরু করতে হলো।"

"এর ফলে ব্যাপারটা আরো জটিল হলো। প্রচারভিযানের প্রধানদের বরখাস্ত করায় ১০০ দিনে যা অর্জন করা গিয়েছিল তা হারাতে হলো। তাদের জন্য এটা ছিল একটা বড় সমস্যা। এতে ভালো হয় নি। যারা বিভিন্ন পদের জন্য মনোনীত ছিলেন - তাদের মনোনয়নের আগে কোন যাচাই-বাছাই হয় নি। অথচ পালাবদলের প্রক্রিয়ায় এটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি ধাপ।"

"ফলে যেটা হয় নিয়োগের প্রক্রিয়া বিলম্বিত হয় - নতুন আইনের মাধ্যমে টেড কফম্যান ঠিক যা এড়াতে চেয়েছিলেন।"

"অতীতে আমরা এন অবস্থায় পড়েছি , যখন সসরকারের উচ্চ পর্যায় একেবারেই স্থবির হয়ে পড়েছিল, কিন্তু ফেডারেল কর্মীরা প্রক্রিয়াগুলো চালু রাখতে পেরেছিলেন। ফলে আমার মনে হয় এবারও চালিয়ে নেয়া যাবে। কিন্তু এটা আদর্শ পরিস্থিতি নয়।"

ছবির কপিরাইট Alex Wong
Image caption হোয়াইট হাউস

"নতুন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রথম প্রেসিডেন্ট - যার কোন সরকারি পদে থাকার বা সামরিক বাহিনীতে কাজ করার অভিজ্ঞতা নেই। কিন্তু তার সত্বেও টেড কফম্যান আমেরিকান পদ্ধতির ওপর আস্থা রাখছেন। কারণ তার নির্বাচন জেতার এবং হারার অভিজ্ঞতা দুটোই আছে।"

"আমি একাধিক নির্বাচনের প্রচারাভিযানের সাথে জড়িত ছিলাম। আপনাকে সাংঘাতিক চাপের মধ্যে কাজ করতে হয়। এটা আপনার সবকিছু নিংড়ে নেয়। যখন আপনি এতে জয়লাভ করেন তখন আপনার সব পরিশ্রমের সার্থকতার অনুভুতি হয়। আর যখন আপনি হেরে যান - তখন এর যে মনোকষ্ট তা সীমাহীন।"

"এটা কাটিয়ে উঠতে আপনার এক বছর বা দু বছর পর্যন্ত লাগতে পারে। তাই যখন আপনি এটা উপলব্ধি করবেন যে জনগণ আপনাদের বিজয়ী করেছে, এবং আপনাকে একটা দায়িত্ব দিয়েছে - আপনি হোয়াইট হাউসে ঢুকছেন, এই পুরো ব্যাপারটার অংশ হচ্ছেন - এটা এক দারুণ অনুভুতি।"

এবারের ইতিহাসের সাক্ষী পরিবেশন করেছেন পুলক গুপ্ত।