ঢাকায় এক ফ্যাশন শোর ক্যাটওয়াকে এ্যাসিড দগ্ধ নারী-পুরুষ

ছবির কপিরাইট বিবিসি বাংলা
Image caption ফ্যাশন শোতে অংশ নেয়া কয়েকজন এ্যাসিডদগ্ধ নারী-পুরুষ

বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকায় আজ (মঙ্গলবার) অনুষ্ঠিত হলো এক ব্যতিক্রমী ফ্যাশন শো।

র‍্যাম্পে বাংলা গানের তালে বিভিন্ন পোষাকে যারা হেঁটেছেন, তারা সবাই এ্যাসিডদগ্ধ নারী-পুরুষ।

আয়োজকেরা বলছেন, ব্যতিক্রমী এই ফ্যাশন শোর মূল উদ্দেশ্য সৌন্দর্যের প্রথাগত মানদণ্ডকে চ্যালেঞ্জ করা। আর সেই সাথে নারীর ভেতরের সৌন্দর্যই যে তার শক্তি এই বার্তা উপস্থাপন করা।

ঢাকার এক পাঁচতারা হোটেল ঐ ফ্যাশন শো শুরুর আগে মূল মঞ্চের পেছনে গিয়ে দেখা গেল শেষ মূহুর্তের তোড়জোড় চলছে। একপাশে বানানো ছোট গ্রিনরুমে চলছে রূপসজ্জার কাজ। কারো মুখে মেকআপের এক পরত মাখা হয়েছে, কারো চোখ আর ঠোটের সাজ চলছে।

সাতক্ষীরার মেয়ে নুরনাহার-- পারিবারিক বিরোধের জের ধরে যার ওপর এ্যাসিড ছোড়া হয়েছিল --বললেন, "শুধু কি যাদের চেহারা ভালো, তারাই ফ্যাশন শো করবে! আমরাও পারব। আমাদের চেহারা তারা ক্ষত করে থাকতে পারে, কিন্তু আমরা সেটা লুকিয়ে রাখব কেন? মুখ ঢাকতে হয়, তারা ঢাকুক। তারা অন্যায় করেছে, আমরা কোন অন্যায় করিনি।"

ছবির কপিরাইট বিবিসি বাংলা
Image caption র‍্যাম্পে প্রবেশের আগে চলছে সাজসজ্জা

হেয়ার-স্প্রে দিয়ে নুরনাহারের চুলে বেণী গাথা হচ্ছিল। তার পাশেই বাহারি খোঁপা বাঁধা হচ্ছিল গঙ্গা দাসীর। ফ্যাশন শোতে পোশাক প্রদর্শন করা ছাড়াও নাচবেন তিনি। তাই প্রস্তুতি নিচিছলেন।

"আমার নিজেকে আজ ভাগ্যবান মনে হচ্ছে। এরকম কোন অনুষ্ঠানে তো কোনদিন যাইনি। আমাদের তো বাইরে বেরুতে দেয়না। আমার মুখ দেখে কোন কাজে গেলে নাকি কাজয় হয় না। কোন বিয়ে শাদী বা পূজা আচ্চায় আমাকে ডাকে না।"

এরকমই ১৫জন এ্যাসিদগ্ধ নারী এবং পাঁচজন পুরুষ হেঁটেছেন ব্যতিক্রমী এক ফ্যাশন শোতে। তারা এসেছেন বাংলাদেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে। একেকজনের গল্প একেকরকম, এসেছেনও ভিন্ন ভিন্ন সামাজিক প্রেক্ষাপট থেকে।

তাদের প্রশিক্ষণ দিয়েছেন বিশ্বখ্যাত ফ্যাশন ডিজাইনার বিবি রাসেল। তিনি বলছিলেন, তার উদ্দেশ্য এই মানুষদের মধ্যে আত্মবিশ্বাস জাগিয়ে তোলা।

"আমারও এমন হতে পারে, আপনারও হতে পারে। কিন্তু মনে রাখতে হবে, তারাও মানুষ। তারা যাতে স্বাভাবিক একটা জীবন পায় সেটা দরকার। আর আমি একজন ডিজাইনার, আমার কাপড় যাকে খুশী তাকে পরাতে পারি, তাকে 'টপ-মডেল' হতে হবে না। "

ছবির কপিরাইট বিবিসি বাংলা
Image caption ফ্যাশন মডেল হওয়ার সুযোগ পেয়ে উচ্ছসিত ছিলেন এ্যাসিডদগ্ধ নারী-পুরুষ

বিউটি রিডিফাইন্ড নামে এই আয়োজনটি করেছে বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা এ্যাকশনএইড। সংস্থার বাংলাদেশ প্রধান ফারাহ কবীর। তিনি বলেন, "অনেকের মনে হতে পারে, তাদের আমরা প্রদর্শন করছি কিনা। কিন্তু তাদের মধ্যে কোন দ্বিধা নেই। তারা আনন্দের সাথে এটি করছে, কারণ তারাও প্রকাশ্য জীবনযাপন করতে চায়।"

এদিকে, গ্রিনরুমে তখনো চলছে শেষ মূহুর্তের মহড়া। একটু পরেই উঠবেন র‍্যাম্পের জন্য বানানো ছোট মঞ্চটিতে। উচ্ছ্বাস দ্বিধা আর কিছুটা ভয় নিয়ে অপেক্ষা করছেন পাবনার মেয়ে কাকলী।

মেকআপের জন্য তখনো অপেক্ষা করছিলেন বগুড়ার নার্গিস, বরিশালের জেসমিন, কাসেদ আলী, ঈমান আলী, সাদেকুর রহমানসহ আরও কয়েকজন। তারা বলছিলেন এ্যাসিড তাদের জীবনের প্রায় সব আনন্দকে কেড়ে নিয়েছে। কিন্তু মঙ্গলবারের ঐ আয়োজনে অংশ নিয়ে তারা তাদের জীবনের দু:সহ বাস্তবতা কিছুটা হলেও ভুলে থাকার সুযোগ পেয়েছিলেন।

সম্পর্কিত বিষয়