বাংলাদেশে হেফাজতে ইসলাম নিয়ে কী অবস্থান সরকারের?

  • ৯ মার্চ ২০১৭
সুপ্রিম কোর্ট প্রাঙ্গণে ন্যয়বিচারের প্রতীক ভাস্কর্য
Image caption সুপ্রিম কোর্ট প্রাঙ্গণে ন্যয়বিচারের প্রতীক ভাস্কর্য

বাংলাদেশে নাস্তিকতা, নারী নীতি ও শিক্ষা নীতি-বিরোধী আন্দোলনের পর এবার সুপ্রিম কোর্ট প্রাঙ্গণ থেকে ভাস্কর্য অপসারণের দাবি তুলে নতুন করে আলোচনায় এসেছে হেফাজতে ইসলাম।

অতীতে সংগঠনটি যে ১৩-দফা দাবি তুলেছিল সেটি নিয়ে দেশে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনার সৃষ্টি হয়। ১৩ দফার মধ্যে ইসলাম অবমাননা কটূক্তিকারীদের মৃত্যুদণ্ডের আইন, দেশে ভাস্কর্য স্থাপন নিষিদ্ধ এবং শিক্ষানীতি বাতিলের দাবি ছিল উল্লেখযোগ্য।

এছাড়া ২০১৬ সালে পাঠ্যবইয়ে ১৭টি বিষয় সংযোজন ও ১২টি বিষয় বাতিলের সুনির্দিষ্ট দাবিতে আন্দোলন করেছিল সংগঠনটি। ২০১৭ সালে নতুন পাঠ্যবই প্রকাশের পর দেখা গেছে এসব সংযোজন-বিয়োজন হয়েছে। হেফাজত এজন্য সরকারকে আনুষ্ঠানিকভাবে ধন্যবাদ‌ও জানিয়েছে।

ইসলামপন্থী এ সংগঠনের বিভিন্ন দাবি দাওয়া নিয়ে সরকারের অবস্থান প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা এইচ. টি. ইমাম বলেন, "রাজনীতিতে বলুন, সরকার পরিচালনায় বলুন সবসময়ই ছোটখাটো অনেকসময় আপোষ করতে হয় বৃহত্তর স্বার্থে। যেমন, এর আগে নারী নীতি নিয়ে কথা হয়েছিল তখন আমি নিজেই আলেম ওলামাদের সঙ্গে বসেছি, তাদের সঙ্গে কথাবার্তা বলেছি।"

"তারপর শিক্ষানীতি নিয়ে যখন কথা হয়েছে তখন আমাদের সরকারের থেকে ক্যাবিনেটেই সিদ্ধান্তই নেয়া হয়েছে যে, এই নীতিমালাগুলোতে এমন কিছুই থাকবে না যেটি শরিয়া পরিপন্থী, কোরান হাদিসের পরিপন্থী। আসলে থাকেও নি। তার ফলে বিষয়টিকে বলতে পারি ডিফিউজ করা হয়ে গেছে, না হলে এটা একটা খারাপ রূপ ধারণ করতে পারতো। ঐ সুযোগটি তো আমরা দেবো না।"

Image caption এইচ.টি. ইমাম, প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা

বাংলাদেশে ধর্মীয় কারণে হেফাজতের দাবি এবং এ ব্যাপারে সিদ্ধান্তগুলো স্পর্শকাতর। হেফাজতের সঙ্গে দেশের অধিকাংশ ইসলামপন্থী রাজনৈতিক দল ও সংগঠনের সংশ্লিষ্টতার কারণে সংগঠনটিকে সরকারের জন্য হুমকি হিসেবে দেখা হয় কিনা এ প্রশ্নের জবাবে মি. ইমাম বলেন, "দেখতে হবে যাতে এমন কোনো অবস্থানে তারা না যায় যাতে রাষ্ট্রীয় কাঠামোই বিপন্ন হয়। এরা তো দেশে কোনো কালেই হালে পানি পেতো না। এদের পুনঃস্থাপন করা হয়েছিল।"

"জামাত ইসলামের বড় নেতাদের, যাদের যুদ্ধাপরাধী হিসেবে ফাঁসিও হলো। এই লোকজনদের এদেশে আনা হয়েছিল, পুনঃস্থাপন করা হয়েছিল, পুনর্বাসন করা হয়েছিল। ব্যবসা বাণিজ্য সবকিছু তাদের হাতে। এখনতো দেশের আপনি যেখানে যান রন্ধ্রে রন্ধ্রে ঢুকে গেছে।"

এখন আদালত চত্বরে ভাস্কর্য নিয়ে হেফাজতের দাবিতে সরাসরি সমর্থন না জানালেও সরকার এবং ক্ষমতাসীন দলের অনেকেই এই ভাস্কর্য স্থাপন অপ্রয়োজনীয় ছিল বলে মনে করেন। বিষয়টিকে স্পর্শকাতর উল্লেখ করে এ ব্যাপারে সরকার এবং আওয়ামী লীগের কেউ কোনো মন্তব্যও করছে না।

পাঠ্যবইয়ে হেফাজতের দাবির প্রতিফলন এবং তাদের বিভিন্ন দাবির প্রতি সরকারের অবস্থান নিয়ে শিক্ষাবিদ অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, "যদি বিএনপি এই সমস্ত দাবি তুলতো বা বিএনপি যদি রাজপথে আসতো, তাদের প্রতি যে দৃষ্টিভঙ্গি হতো, সেই দৃষ্টিভঙ্গি এদের প্রতি না। এদেরকে প্রশ্রয়ই দেয়া হচ্ছে। কেননা মনে করা হচ্ছে এরা সমর্থন করবে এবং এদের সমর্থনটা তাদের জন্য প্রয়োজন। এবং এরা শান্ত থাকলে সুবিধা, শান্ত না থাকলে এরা উগ্র হয়ে পড়বে।"

Image caption সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী, শিক্ষাবিদ

মি. চৌধুরীর মতে, হেফাজতের দাবি অযৌক্তিক এবং বাংলাদেশের অন্যতম রাষ্ট্রীয় মূলনীতি ধর্মনিরপেক্ষতার সঙ্গেও সাংঘর্ষিক।

"সরকার এদেরকে শান্ত রাখতে চাচ্ছে এবং আগামী নির্বাচন যখন হবে তখন তাদের ভোটগুলো যাতে তারা পায় এই তাদের আকাঙ্ক্ষা। দ্বিতীয় হচ্ছে মানুষের যে ইহজাগতিক সমস্যা, অর্থনৈতিক সমস্যা -- এগুলোকে আচ্ছাদন করার জন্য রাজনৈতিক দলগুলো এগুলোকে উৎসাহিতও করবে যাতে করে মানুষ এই সমস্ত বিষয় নিয়ে ব্যস্ত থাকে।"

এদিকে, ২০১০ সালে প্রতিষ্ঠিত হেফাজতে ইসলামের প্রতি ধর্মীয় কারণে সাধারণ মানুষের আবেগ এবং সমর্থন দেখা যায়। ২০১৩ সালের ঢাকায় ব্যাপক লোকসমাগম করে হেফাজত তাদের শক্তি-সামর্থ্য দেখানোর চেষ্টা করে। তবে ৫ই মে ঢাকায় অবস্থান নিলে তখন সরকার কঠোর অবস্থানে যায়। ভবিষ্যতে সরকার বিরোধীরা যেন সংগঠনটি কাজে লাগিয়ে ফায়দা নিতে না পারে সেজন্য সরকার সংগঠনটির সঙ্গে যে সতর্ক এবং সুসম্পর্ক রাখতে চায় সেটিও অনেকটা স্পষ্ট।

এইচ. টি. ইমাম বলেন, "এই পাঠ্যপুস্তক কিংবা অন্য কোনো বিষয় নিয়ে এমন কোনো কিছু একটা সুযোগ দেব না, যাতে যে কোনো মহলই হোক এর পক্ষে-বিপক্ষে কেউই সরকারের বিরুদ্ধে কোনো অবস্থান নিতে পারে।"

এদিকে কওমি মাদ্রাসাভিত্তিক ইসলামপন্থী এ সংগঠনের নীতিনির্ধারকরা বলছেন, ইসলামী চিন্তাধারা থেকে অতীতে তারা সরকারের কাছে যেভাবে দাবি তুলে ধরেছেন ভবিষ্যতেও তারা এটি চালিয়ে যাবেন। তাদের বিশ্বাস সরকার উপলব্ধি থেকেই তাদের দাবি মেনে নিচ্ছে এবং ভবিষ্যতেও মানবে।

অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, "এটা বাংলাদেশের জন্য হুমকি হবে যদি এদেরকে প্রশ্রয় দেয়া হয়। কেননা এটা বাড়বে।"

Image caption শাপলা চত্বরে হেফাজত সমাবেশ