ব্রিটেনে বাংলা বই-এর প্রসারে ৪০ বছরের লড়াই
আপনার ডিভাইস মিডিয়া প্লেব্যাক সমর্থন করে না

ব্রিটেনে বাংলা বই-এর প্রসারে ৪০ বছরের লড়াই: রায়হানা মাহবুবের সাক্ষাৎকার

বাংলাদেশ তখন সদ্য স্বাধীন হয়েছে। সারাবিশ্বের মতো ব্রিটেনের লোকজনের কাছেও একেবারে নতুন ও অপরিচিত একটি রাষ্ট্র এই দেশ।

তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের বহু মানুষ তখন লন্ডনসহ ব্রিটেনের বিভিন্ন শহরে বসবাস করলেও ১৯৭১ সালের পর বাংলাদেশ সম্পর্কে জানার জন্যে স্থানীয় লোকজনের মধ্যে এই আগ্রহ আরো বেড়ে যায়।

আর ঠিক তখনই ব্রিটিশদের সামনে বাংলাদেশ, বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতিকে তুলে ধরতে এগিয়ে এলেন রায়হানা মাহবুব আহমদ।

লন্ডনেই তিনি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন বাংলা বই এর একটি বিশাল ভাণ্ডার বা ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান। নাম রূপসী বাংলা।

স্বামীর সূত্র ধরে মিসেস মাহবুব লন্ডনে আসেন ১৯৭২ সালে। তার দু'বছরের মাথাতেই ১৯৭৪ সালে পশ্চিমা বিশ্বে তথা ইউরোপের তিনি বাংলা বই বিপণনের এরকম একটি উদ্যোগ নেন।

তিনি জানান, তার স্বামী মাহবুবউদ্দীন আহমদ ব্রিটেনে এসেছিলেন লন্ডন স্কুল অফ ইকোনমিকসে পড়াশোনা করতে।

"সেই সময় সদ্য স্বাধীন হওয়া দেশের নাগরিক হিসেবে দেশের কথা সবসময় মনে পড়তো। নিজের দেশকে খুবই মিস করতাম। সবসময় কিছু একটা করার জন্যে মন চাইতো," বলেন তিনি।

স্বাধীনতার পর পর ব্রিটেনে বাংলাদেশকে তুলে ধরার জন্যে লন্ডনে বাংলাদেশ হাই কমিশনের পক্ষ থেকে নানা ধরনের প্রদর্শনীর আয়োজন করা হতো। কিন্তু এসব করার জন্যে হাই কমিশনের প্রয়োজনীয় লোকবল ছিলো না।

ছবির কপিরাইট Ruposhi Bangla
Image caption লন্ডনে চারতলা এই ভবনটি হয়ে উঠেছিলো বাংলা বই এর বিশাল ভাণ্ডার

সেসময় ব্রিটেনে বাংলাদেশের হাইকমিশনার ছিলেন সৈয়দ আবদুস সুলতান।

মিসেস মাহবুব জানান, মি. সুলতান তখন তার স্বামীকে এই কাজে তাদেরকে সাহায্য সহযোগিতা করতে বলেন।

তখন তারা ভাবতে শুরু করেন ব্রিটেনে থেকে দেশের জন্যে কি করা যায়। আর ঠিক তখনই এই ধারণাটা তাদের মাথায় আসে।

ব্রিটিশদের কাছে বাংলাদেশকে তুলে ধরার জন্যে তারা তখন বাংলাদেশ থেকে নানা ধরনের জিনিস নিয়ে আসতে শুরু করেন। এসবের মধ্যে রয়েছে মানচিত্র, পতাকা, পাট বাঁশ, কাঠ ইত্যাদি দিয়ে হাতে তৈরি নানা রকমের সামগ্রী, হস্তশিল্প, নকশী কাঁথা এবং নানা ধরনের বই। বিশেষ করে বাংলাদেশের ওপর ইংরেজিতে লেখা বই।

"আমাদের ইচ্ছাই ছিলো আমাদের দেশের ইতিবাচক, গঠনমূলক ও সুন্দর জিনিসগুলো আমরা বিদেশীদের কাছে তুলে ধরবো। আমার স্বামী এই ব্যাপারে আমাকে পূর্ণ সহযোগিতা দিয়েছেন।

তিনি জানান, রূপসী বাংলা লিমিটেড নামে প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার ধারণা ছিলো তার স্বামীরই। এটিকে বাংলা ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতির একটি রিসোর্স সেন্টার হিসেবে গড়ে তোলার পরিকল্পনা ছিলো তাদের।

এই উদ্যোগটা যখন নেওয়া হয়েছিলো তখন ব্রিটেনে বাংলাদেশীদের সংখ্যা খুব একটা বেশি ছিলো না। আর একারণে এই দেশে বাংলা বই বিক্রি করার কাজটা খুব একটা সহজ ছিলো না।

"কিন্তু একটা স্বপ্ন-তো মানুষের থাকেই। আমার সবসময় মনে হয়েছে যে আমরা যেখানেই থাকি না কেনো নিজের দেশ, নিজের ভাষা, নিজের সাহিত্য- এসব তো আমরা ভুলতে পারবো না।"

শুরু হয়েছিলো বাংলা শেখার বই আনার মধ্য দিয়ে। বিশেষ করে ইংরেজিতে বাংলা শেখার বই। পরে তারা নানা ধরনের বই আনতেন মানুষের আগ্রহ মেটাতে।

নিজেদের বাড়ি থেকেই শুরু হয়েছিলো এই বই বিক্রির কাজ। পরে শহরের একটি বাণিজ্যিক এলাকায় চারতলা একটি ভবন কিনে নিয়ে পুরো বাড়িটিকেই তারা দোকানে পরিণত করেন। এজন্যে বাড়িটিতে প্রচুর সংস্কার করতে হয়েছিলো। একসময় এই বাড়িতেই ধীরে ধীরে গড়ে উঠতে শুরু করে বাংলা বইয়ের বিশাল মজুদ।

টুটিং হাই স্ট্রিটে বিশাল এই বাড়িটি কেনা হয় ১৯৭৮ সালে।

ছবির কপিরাইট Ruposhi Bangla
Image caption রূপসী বাংলায় বাংলাদেশ থেকে আসা কয়েকজন অতিথি

মিসেস মাহবুব বলেন, "সত্যি কথা বলতে গেলে আমার এই কাজের উৎসাহ দিয়েছেন স্থানীয় ইংরেজরাই। যখন শুরু করি তখন তো ইংরেজি ভাষাতেই বেশি বই ছিলো। ছিলো বাংলাদেশের হস্তশিল্প। আমাদের দেশের মানুষ তো এসব জিনিসের কদর বুঝতো না।"

তিনি জানান, যেসব বিদেশিরা বাংলা বই কিনতেন তাদের কাছে বাংলা ভাষার অন্য রকমের একটা মর্যাদা ছিলো। তারা বলতেন, বাংলা খুব 'মিষ্টি' ভাষা।

কবিতা, গল্প উপন্যাস থেকে শুরু করে যেকোনো ধরনের বই-ই পাওয়া যেতো এই রূপসী বাংলায়।

"এমনকি বাংলাদেশর বাৎসরিক পরিসংখ্যানের বইও আমরা এনে দিয়েছি। এসব বই আমরা ব্রিটেনের পাবলিক লাইব্রেরিতে সরবরাহ করেছি। নিউক্যাসেল বিশ্ববিদ্যালয়ে একটা গবেষণা হচ্ছিলো ধানের তুষের ওপর। ওরা আমাদের কাছে এবিষয়ে আগ্রহ প্রকাশ করার পর এধরনের বইও আমি তাদেরকে এনে দিয়েছি। পাটও এনে দিয়েছে।"

প্রথম দিকে এসব বই আনা হতো সমুদ্র পথে, জাহাজে করে। আরো পরে বিমানে।

ছবির কপিরাইট Ruposhi Bangla
Image caption বাংলাদেশ থেকে বই আনা, অর্ডার নেওয়া, প্যাকেট করা, সেগুলো পোস্ট করে ক্রেতাদের কাছে পাঠানো, রশিদ তৈরি করা - সব কাজ তিনি নিজেই করতেন

ব্যবসা সম্পর্কে কোন অভিজ্ঞতাই ছিলো না মিসেস মাহবুবের। ছিলেন পুরোদস্তুর গৃহিনী। সন্তানদের লালন পালন করার পাশাপাশি এরকম এক ব্যবসাও শুরু করলেন তিনি।

সব কাজ করতেন তিনি একাই। বাংলাদেশ থেকে বই আনা, অর্ডার নেওয়া, প্যাকেট করা, সেগুলো পোস্ট করে ক্রেতাদের কাছে পাঠানো, রশিদ তৈরি করা - সব কাজ তিনি নিজেই করতেন।

ব্রিটেনের পাবলিক লাইব্রেরি, স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়, গবেষণা প্রতিষ্ঠান এসব জায়গায় বাংলা বই সরবরাহ করতো রূপসী বাংলা।

এছাড়াও ইউরোপের বিভিন্ন দেশেও তিনি বই পাঠাতেন। সুইডেনে আর ইটালিতে প্রচুর বাংলা বই পাঠিয়েছেন তিনি।

ব্রিক লেনে তখন কিছু দোকান ছিলো যেখানে বাংলা বই এর খুচরা বিক্রি হতো। তবে রূপসী বাংলা বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে বাংলা বই সরবরাহ করতেই ব্যস্ত ছিলো বেশি।

এসব করতে গিয়ে রূপসী বাংলা নিজেরাও বাংলা শেখার দুটো বই প্রকাশ করে। একটি ছিলো ইংরেজিতে বাংলা শেখার বই এবং অন্যটি বাংলা-ইংরেজি-বাংলা অভিধান।

ছবির কপিরাইট Ruposhi Bangla
Image caption কলকাতা থেকে বই আনা নিয়ে রূপসী বাংলার রায়হানা মাহবুব কথা বলছেন আনন্দ পাবলিশার্সের একজন কর্মকর্তা সুবীর মিত্রের সাথে

"এর কারণ হলো লন্ডনে শহর কর্তৃপক্ষ তখন বহু সংস্কৃতিকে খুব বেশি গুরুত্ব দিয়েছিলো। এনিয়ে ইউরোপিয়ান ইউনিয়নেরও নির্দেশনা ছিলো। ছিলো মাতৃভাষা শেখানোর তাগিদ। এই রাজনৈতিক কারণেও তখন বাংলা বই এর চাহিদা তৈরি হয়।"

তিনি জানান, রূপসী বাংলার চার দশকেরও বেশি সময়ে সবচেয়ে ব্যস্ত সময় কেটেছে আশির দশকের মাঝামাঝি থেকে ২০১২ সাল পর্যন্ত। এবং তারপরই বাংলা বইয়ের চাহিদার ভাটা পড়তে শুরু করে।

এর কারণ কি জানতে চাইলে তিনি বলেন, প্রথমত প্রযুক্তি। কারণ এখন অনলাইনে বাংলা বই পাওয়া যায়। দ্বিতীয় কারণ হলো- এখানে যাদের জন্ম হয়েছে, যারা এখানেই বেড়ে উঠেছে, বিশেষ করে তৃতীয় আর চতুর্থ প্রজন্মের ছেলেমেয়েদের মধ্যে বাংলা শেখার আগ্রহটাও অনেক কমে গেছে। ওরা এই দেশের ভাষা ও সংস্কৃতির সাথে ধীরে ধীরে একাত্ম হয়ে পড়েছে।

Image caption লন্ডন স্টুডিওতে সাক্ষাৎকারটি নিচ্ছেন মিজানুর রহমান খান

প্রায় ৪৩ বছর পর এসে এখন এই প্রতিষ্ঠানটি বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। কারণ ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান হিসেবে এটিকে বাঁচিয়ে রাখা এখন খুব কঠিন হয়ে পড়েছে বলে জানান মিসেস মাহবুব।

রূপসী বাংলার চারতলা ভবন থেকে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে ৪০ হাজার বই। এটি এখন আবার একটি আবাসিক ভবনে পরিণত হয়েছে।

"যে স্বপ্ন নিয়ে আমি রূপসী বাংলা গড়ে তুলেছিলাম সেটাকে আমার গুটিয়ে আনতে হচ্ছে এটা ভেবে আমি খুব আবেগপ্রবণ হয়ে পড়ি। কিন্তু এটাই হয়তো নিয়তি ছিলো। তারপরেও আমি বই ছাড়া থাকতে পারি না," বলেন তিনি।

মিসেস মাহবুব বলেছেন, "আমার নিজের বাড়িতে আমি হাজার খানেক বই রেখেছি। এগুলো আমার প্রতিদিনের সঙ্গী। প্রতিটা বই আমার কাছে আমার নিজের সন্তানের চাইতেও কাছের।"