ইতিহাসের সাক্ষী
আপনার ডিভাইস মিডিয়া প্লেব্যাক সমর্থন করে না

ইতিহাসের সবচেয়ে দীর্ঘ যুদ্ধাপরাধের বিচারে আসামী ছিলেন সার্বিয়ার সাবেক নেতা স্লোবোদান মিলোশেভিচ।

  • ১৫ মার্চ ২০১৭

২০০২ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে শুরু হয়েছিল ইতিহাসের সবচেয়ে দীর্ঘ যুদ্ধাপরাধের বিচার। বিচারের কাঠগড়ায় ছিলেন সার্বিয়ার সাবেক প্রেসিডেন্ট স্লোবোদান মিলোশেভিচ।

সাবেক ইয়ুগোশ্লাভিয়ার সংঘাতে যুদ্ধাপরাধ সংঘঠিত করার অভিযোগে আদালতের কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হয়েছিল মিলোশেভিচকে।

তাকে অভিযুক্ত করার প্রক্রিয়াই চলেছিল দুবছর ধরে আর বিচার প্রক্রিয়া ছিল এতই দীর্ঘ যে মিলোশেভিচের জীবদ্দশায় তা শেষ হবার সম্ভাবনা ছিল খুবই ক্ষীণ।

অনেকের কাছে বলকানের কসাই নামে পরিচিত ছিলেন এই সার্ব নেতা যিনি আদালতে আত্মপক্ষ সমর্থন করেছিলেন নিজেই।

কিন্তু যে দুজন আইনজীবী তাকে সহায়তা করেছিলেন তাদের একজন ছিলেন সার্বিয় - অন্যজন ব্রিটিশ।

আদালতে আইনজীবীর এই সূচনা বক্তব্যের পর মিঃ মিলোশেভিচ বলেছিলেন তিনি মনে করেন এই বিচার প্রক্রিয়া ভুয়া।

"এসব অভিযোগ মিথ্যা। জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদ এই আদালত নিয়োগ করে নি- ফলে এটা বেআইনী। কাজেই বেআইনী একটা প্রক্রিয়ার জন্য আইনজীবী নিয়োগ করা আমি প্রয়োজন মনে করিনি।"

তাকে সহায়তা করার জন্য যে ব্রিটিশ ফৌজদারি আইনজীবীকে আদালত নিয়োগ করেছিলেন, তার নাম স্টিভেন কে। এর আগে তিনি দ্য হেগের আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতে দুজন নেতার বিরুদ্ধে গণহত্যার মামলায় আইনজীবী ছিলেন। একজন ছিলেন আন্তর্জাতিক আদালতে সাবেক ইয়ুগোশ্লাভিয়ার প্রথম অভিযুক্ত ব্যক্তি এবং দ্বিতীয় জন রুয়ান্ডার এক কারখানা মালিক।

তিনি বলছেন, "মিঃ মিলোশেভিচ যদি আমাদের স্বীকার করে নিতেন, তাহলে গোটা প্রক্রিয়াটা যে বৈধ সেটাও তাকে নিজের মনের মধ্যে স্বীকার করে নিতে হতো। সেটা যে কোনো মূল্যে অস্বীকার করাটাই ছিল তার মূল কৌশল।"

তবে মিঃ মিলোশেভিচ মানতে রাজি না হলেও আদালত জোর দিয়ে বলেছিল যে মিঃ মিলোশেভিচ আত্মপক্ষ সমর্থন করলেও তার একজন আইনজীবী থাকতেই হবে।

ছবির কপিরাইট HO/AFP/Getty Images
Image caption ইউরোপীয় সংবাদ চ্যানেলে দেখানো স্রেব্রেনিৎসার কাছে হাত বাঁধা অবস্থায় ছয়জন তরুণের ছবি। মি: মিলোশেভিচের বিচারের সময় আদালতে এই ছবি তাকে দেখানো হয়। এই ভিডিওতে ছিল তৎকালীন সার্ব স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অধীনে আধাসামরিক বাহিনীর সদস্য এই তরুণদের ট্রাক থেকে ফেলে দিয়ে গুলি করে মারছে। ১৯৯৫ সালে স্রেব্রেনিৎসায় মিলোশেভিচের বাহিনী ৮০০০ মুসলিম পুরুষ ও তরুণকে হত্যা করেছিল বলে অভিযোগ।

মিলোশেভিচের বিরুদ্ধে একটি নয়- তিনটি সংঘাতে সংঘটিত অপরাধের অভিযোগ ছিল। কসভোয়, এছাড়াও বসনিয়া হের্সেগোভিনা আর ক্রোয়েশিয়ার যুদ্ধের সময় ।

সাক্ষ্যপ্রমাণ নথিভুক্ত করা হয়েছিল দশ লাখ পৃষ্ঠা জুড়ে, ১৬৬ পৃষ্ঠা জুড়ে ছিল অভিযোগের বিবরণ- মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ, যুদ্ধাপরাধ এবং বসনিয়ায় গণহত্যা।সাবেক ইয়ুগোশ্লাভিয়ায় এক দশকেরও বেশি রাজনীতিতে আধিপত্য করেছিলেন স্লোবোদান মিলোশেভিচ।

কম্যুনিষ্ট আমলে প্রেসিডেন্ট টিটোর শাসনকাল যখন মৃতপ্রায়, তখন রাজনীতিতে অভ্যূত্থান মিলোশেভিচের।

ইয়ুগোশ্লাভিয়ায় ভিন্ন জাতি ও ভিন্ন ধর্মের মানুষের মধ্যে ৪০বছরেরও উপর একটা সম্প্রীতি বজায় রাখতে সক্ষম হয়েছিলেন প্রেসিডেন্ট টিটো। কিন্তু টিটোর বিদায়ের পর মিলোশেভিচ সার্বিয়ার জাতীয়তাবাদকে পুঁজি করে নিজের অবস্থান শক্ত করেন এবং এর পরিণতিতে ভেঙে যায় ইয়ুগোশ্লাভিয়ার অখন্ডতা।

সমর্থকদের কাছে মিলোশেভিচ ছিলেন হিরো- সার্ব জাতীয়তাবাদের সর্বোচ্চ প্রতিভু। আর সমালোচকদের কাছে তিনি ছিলেন ইয়ুগোশ্লাভিয়ার নির্মম গৃহযুদ্ধের নিন্দিত জনক।

বসনিয়ায় যুদ্ধ শেষ হবার ছয়বছর পর বিক্ষোভ, সাধারণ ধর্মঘট এবং সশস্ত্র অবরোধের মুখে মিলোশেভিচকে হেগে আন্তর্জাতিক আদালতে বিচারের জন্য সোপর্দ করা হয়।

ছবির কপিরাইট AP
Image caption বিচার শুরুর আগে দ্য হেগ শহরের কাছে একটি অবকাশ যাপন কেন্দ্রে প্রথমে এনে আটক অবস্থায় রাখা হয়েছিল মি: মিলোশেভিচকে।

মিঃ মিলোশেভিচকে বিচারের জন্য দ্য হেগের আদালতে সোপর্দ করার প্রায় দেড় মাস আগে তিনি দ্বিতীয় সহায়ক আইনজীবী হিসাবে নিয়োগ করেছিলেন সার্বিয় স্টেঙ্কো টোমানোভিচকে।

তার একটি আইন সংস্থা ছিল বেলগ্রেডে। তিনি বলেছেন গোড়া থেকেই মিলোশেভিচ পরিস্কার জানিয়ে দিয়েছিলেন যে তিনিই আদালতে আত্মপক্ষ সমর্থন করবেন। কিন্তু মিঃ টোমানোভিচের কাজ ছিল নথিপত্রের পাহাড় থেকে তথ্য সংগ্রহে তাকে সাহায্য করা।

মি. টোমানোভিচ স্লোবোদান মিলোশেভিচকে দেখেছিলেন খুব কাছ থেকে।

"নিজের সম্পর্কে তার যে উচ্চ ধারণা ছিল, তার বিরুদ্ধে গণহত্যার অভিযাগ আনার পরেও তার সেই ধারণা একেবারেই বদলায়নি । তিনি নিজে আইন পড়েছেন, যদিও কখনও প্র্যাকটিস করেননি। তবে তিনি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করতেন যে তিনি একজন দারুণ আইনজ্ঞ।"

মিলোশেভিচের বিচারকে আখ্যা দেওয়া হয়েছিল শতাব্দীর সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বিচারকাজ হিসাবে। হেগ শহরে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতে তার বিচার শুরু হয়েছিল ২০০২ সালের দোসরা ফেব্রুয়ারি।

"আমি গোড়া থেকেই আঁচ করতে পারছিলাম যে তিনি আদালত কক্ষের ভেতর নাটকীয় পরিবেশ তৈরির আনন্দ উপভোগ করতে শুরু করেছেন। সবার নজর কাড়তে তিনি বিচারক ও কৌঁসুলিদের বিভ্রান্ত করছেন। বাদী পক্ষের সাক্ষী ও বিশেষজ্ঞদের বক্তব্য নস্যাৎ করে দিয়ে তিনি মজা পাচ্ছেন। তাকে দেখে বোঝা যেত তিনি এই অভিজ্ঞতা বেশ উপভোগ করছেন।"

আদালতে মি. মিলোশেভিচ তার যুক্তিতর্ক পেশ করছিলেন দোভাষীর মাধ্যমে।

ছবির কপিরাইট AP
Image caption তুজলায় বাড়িতে বসে টিভিতে মি: মিলোশেভিচের বিচার কার্যক্রম দেখছেন স্রেব্রেনিৎসা গণহত্যা থেকে প্রাণে বেঁচে যাওয়া কয়েকজন বসনিয় মুসলমান নারী

এই মামলায় সাক্ষী ছিলেন কয়েকশ'। কাঠগড়ায় নিজেদের ও পরিবারের উপর অত্যাচার নির্যাতনের কথা বলতে উঠে অনেকে কান্নায় ভেঙে পড়েন।

মিলোশেভিচ আদালতে জেনারেল, ও বিভিন্ন রাজনীতিকদের পাল্টা সওয়াল করেন।

স্টিভেন কে বলেছেন, "মামলাটা ছিল একটা যুদ্ধের মত। একটা মানসিক যুদ্ধ। সাক্ষীদের জেরা করা, আইনের খুঁটিনাটি তুলে আনা। মিলোশেভিচ লম্বা সময় কাজ করতেন। তিনি কাজ করতে করতে কখন ক্লান্ত হয়ে পড়ছেন বা ঝিমিয়ে পড়ছেন সেটা বোঝা যেত।"

বিচার যখন শুরু হয় মিঃ মিলোশেভিচের বয়স তখন ৬০। তার উচ্চ রক্তচাপ ও হৃদযন্ত্রের সমস্যা ছিল।

বাদীপক্ষের কৌঁসুলির অভিযোগ পেশ করতে সময় লেগেছিল দু বছর। মি. মিলোশেভিচ তার পক্ষের যুক্তি পেশ করতে শুরু করেছিলেন ২০০৪ সালে।

তিনি তখনও পর্যন্ত স্টিফেন কে-র সহায়তা প্রত্যাখান করছিলেন। তাকে নিয়োগ করা হয়েছিল একজন এমিকাস কিউরি আইনজীবী হিসাবে। বিবাদীপক্ষের যুক্তি পেশ করতে যাদের কোনো আইনজীবী থাকে না তাদের মামলায় এমিকাস কিউরিরা আইনী যুক্তি দিয়ে সহায়তা করেন।

ছবির কপিরাইট AP
Image caption দ্য হেগের আন্তর্জাতিক আদালতে মিঃ মিলোশেভিচের বিচার কার্যক্রম বড় পর্দায় দেখছেন সাংবাদিকরা।

তবে মিঃ কে বলেছেন তাদের মধ্যে একটা আস্থার সম্পর্ক গড়ে ওঠে তিনি আদালতে আসার আগে যখন তার কারাকক্ষে দুজনের দেখা হয়। তিনি বলেন তার দুটো রূপ তিনি দেখেছেন। ব্যক্তিগত পর্যায়ে তিনি তার সঙ্গে খুব হালকা মেজাজে কথাবার্তা বলতেন। ছিলেন খোলামেলা সহজমনের।

কিন্তু আদালতে তার ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন রূপ। সেখানে তিনিই সবকিছুর কেন্দ্রে থাকতে চেয়েছেন । সার্বিয়ার মানুষ এবং বিশ্বের জনগণকে তিনি দেখাতে চেয়েছেন তিনিই সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করছেন।

শেষ পর্যন্ত মিলোশেভিচের বিচারে কোনো রায় হয় নি। ফলে সাবেক ইয়ুগোশ্লাভিয়ার যুদ্ধে যারা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিলেন তারাও বিচার পাননি।

২০০৬ সালের ১১ই মার্চ স্লোবোদান মিলোশেভিচকে তার কারাকক্ষে মৃত অবস্থায় পাওয়া যায়।

গুটিকয় ব্যক্তি যাদের মিলোশেভিচের মৃতদেহ দেখার অনুমতি দেওয়া হয়েছিল তাদের মধ্যে ছিলেন স্টেঙ্কো টোমানোভিচ।

"মিলোশেভিচের মৃতদেহ পাওয়া যায় বিছানার উপর। তার দেহ অর্ধেক ঢাকা ছিল কম্বলে। চেয়ারের উপর ছিল খোলা একটা বই আর তার চশমা। সেই সময় কারাকক্ষের ভেতরের অবস্থাটা আমি ভুলব না। কারাগারের সব দরজা বন্ধ । করিডোর শুনশান । কারো মুখে কোনো কথা ছিল না।"

সাবেক ইয়ুগোশ্লাভিয়ায় মানবতাবিরোধী অপরাধের জন্য জাতিসংঘ যুদ্ধাপরাধ আদালতে অভিযুক্ত হয়েছিল দেশটির ১৬০জনের বেশি ব্যক্তি।

গত বছর গণহত্যার দায়ে দোষী সাব্যস্ত হয়েছেন সাবেক বসনিয় সার্বনেতা রাদোভান কারাজজিচ। সাবেক বসনিয় সার্ব অধিনায়ক রাদকো ম্লাদিচের মামলার রায় হওয়ার কথা শীগিগিরি।

সম্পর্কিত বিষয়