ইসলামিক স্টেটের ‘বাংলাদেশি যোদ্ধা' সম্পর্কে কী জানা যাচ্ছে

  • ১৬ মার্চ ২০১৭
ছবির কপিরাইট facebook
Image caption ফেসবুক পাতায় নিয়াজ মোর্শেদের ছবি

আমেরিকা-ভিত্তিক ওয়েবসাইট সাইট ইনটিলিজেন্স তাদের খবরে যে আত্মঘাতী বাংলাদেশি বোমারুর ছবি প্রকাশ করেছে তার পরিচয় নিশ্চিত করেছে পরিবার ও বন্ধুরা।

ইসলামিক স্টেটের বাংলাদেশি যোদ্ধা হিসেবে প্রকাশিত ওই আত্মঘাতী বোমারুর নাম নিয়াজ মোর্শেদ রাজা।

মি: মোর্শেদের বোন জান্নাতুল মাওয়া বিবিসিকে নিশ্চিত করেছেন যে হামলায় নিহত ব্যক্তিই তাঁর ছোট ভাই।

নিয়াজ মোর্শেদ সম্পর্কে কী জানা যাচ্ছে?

নিয়াজ মোর্শেদের বাড়ি চট্টগ্রামের হাটহাজারী উপজেলার খান্দাকিয়ায়।

তাঁর বাবার নাম একেএম কামালউদ্দিন আহমেদ ও মায়ের নাম মাহবুবা কামাল। তিন বোন ও এক ভাইয়ের মধ্যে নিয়াজ মোর্শেদ ছিলেন সবার ছোট।

চট্ট্রগ্রামের সামার স্কুলে পড়াশোনা শুরু করলেও পুরো পরিবার এক সময় জাম্বিয়ায় চলে যায়। মি: মোর্শেদের বাবা সেখানে একটি ব্যাংকের সিনিয়র কর্মকর্তা হিসেবে কাজ করতেন।

জাম্বিয়ার লুসাকাতেই 'ও' লেভেল পাশ করেন নিয়াজ মোর্শেদ।

তারপর বাংলাদেশ থেকে 'এ' লেভেল পাশ করে অস্ট্রেলিয়ায় চলে যান তিনি। সেখানে ব্রুকলিন ইউনিভার্সিটি থেকে ব্যবসায় প্রশাসন ও তথ্যপ্রযুক্তির ওপর পড়াশোনা করেন মি: মোর্শেদ।

তবে গ্র্যাজুয়েশনের পর দেশে ফিরে আসেন তিনি - কারণ তাঁর বাবা অনেক অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন।

মি: মোর্শেদের মেজ বোন জান্নাতুল মাওয়া বলছিলেন "সে সময় নিয়াজ অন্যরকম একটা ছেলে ছিল। তার পার্টি খুব পছন্দ ছিল। এই জেনারেশনের ছেলেপুলেরা যেমন হয় আরকি। মজা-টজা করতো"।

আরো পড়তে পারেন:

ইসলামিক স্টেটের 'বাংলাদেশী যোদ্ধা' নিহত

সীতাকুণ্ডে 'জঙ্গি আস্তানায়' অভিযানে নিহত ৪

কবে থেকে বদলে গেলেন নিয়াজ?

সন-তারিখ কোনকিছু উল্লেখ করতে না পারলেও জান্নাতুল মাওয়া জানান যে হঠাৎ করেই এক সময় বদলে যান নিয়াজ। পার্টি-প্রিয় ছেলে থেকে হয়ে ওঠেন ধর্মপ্রিয়।

"ওর বদলটা হঠাৎই হয়। দেখলাম ও নামাজ-কালাম পড়ছে, পোশাক-আশাকেও পরিবর্তন এসেছে। আমরা খুশিই হয়েছিলাম। ধর্মের প্রতি মনোযোগী হয়েছে। আগের লাইফ থাকলে তো নিশ্চয়ই বাবা-মা'য়ের কাছে থাকতো না। ও বাবা-মায়ের খুব যত্ন নিতো"।

"ওর বদলে যাওয়া দেখে আমাদের একবারও খারাপ কিছু মনে হয়নি।

ওরা দুই পিঠাপিঠি ভাইবোন, দু'জনেই নামাজ-কালাম পড়তো। আমাদের ভালোই লাগতো। অন্য কোন কাজে সমস্যা হয়নি। অফিস করতো ঠিকমতো। ও এক্সট্রিমিস্ট হয়ে যাচ্ছে এমন কোন কিছু আমাদের মাথায় তো একেবারেই আসেনি"- বলছিলেন নিয়াজের মেজ বোন।

সাইট ইনটিলিজেন্সের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত ইসলামিক স্টেটের 'বাংলাদেশি যোদ্ধা'র ছবি ছবির কপিরাইট SITE INTILLIGENCE
Image caption সাইট ইনটিলিজেন্সের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত ইসলামিক স্টেটের 'বাংলাদেশি যোদ্ধা'র ছবি

নিয়াজ মোর্শেদের বাবা মারা যান ২০১১ সালে।

ওই বছরই তিনি বিয়ে করেন, এরপর তাঁর দু'টি মেয়ে জন্ম নেয়।

কিন্তু ছোট মেয়ের বয়স যখন মাত্র মাস খানেক, তখন হঠাৎ করেই নিখোঁজ হয়ে যান নিয়াজ মোর্শেদ রাজা।

"২০১৫ সালের মার্চ মাসের প্রথম দিকের এক শুক্রবারে নামাজ পড়ার উদ্দেশ্যে সে বের হয়ে যায়," বলছিলেন জান্নাতুল মাওয়া। "এরপর আর ফিরে আসেনি সে। তার খোঁজ করে যখন আর পেলাম না, তখন আমরা বাড্ডা থানায় জিডি করেছিলাম"।

"বেশ কিছুদিন পর তৃতীয় একটা মাধ্যমে নিয়াজ খবর পাঠায় যে সে বাংলাদেশ ছেড়ে চলে গেছে - সে ভালো আছে এবং সুস্থ আছে। এছাড়া আর কিছুই জানিনি তখন। তার অনেকদিন পর সে আমার সাথে যোগাযোগ করে। মাঝেমধ্যে আমার সাথেই যোগাযোগ হতো"।

তবে নিজের কাজ সম্পর্কে নিয়াজ কিছু বলতেন না বলে জানান জান্নাতুল মাওয়া।

নিয়াজ মোর্শেদই মাঝেমধ্যে ফোন করে পরিবারের খোঁজ নিতেন।

একদিন হঠাৎ এমন একটা ফোন কলেই জান্নাতুল মাওয়া জানতে পারেন তাঁর ভাই মারা গেছেন।

"ওর সাথে থাকা একটা ছেলে আমাকে খবরটা দিল। কোন একটা মিশনে গিয়েছিল নিয়াজ, যু্দ্ধের একটা ট্যাঙ্কার বিস্ফোরণে ঘটনাস্থলেই মারা গেছে আমার ভাই"- জানান মিজ মাওয়া।

পরিবারের হতাশা

ভাইয়ের মৃত্যুর খবর পেলেও কাউকে সেটা জানাতে পারেনি তিন বোন।

জান্নাতুল মাওয়া বলছিলেন, "আমরা তিন বোন মাসের পর মাস খবরটা হজম করেছি। কাকে কী বলবো?

"যখন ওর মৃত্যুর খবর পেয়েছি তখন তো বলার মতো পরিস্থিতি ছিল না। পরিবারের কেউ যখন জিজ্ঞেস করতো তখন বলতাম ও ব্যবসার কাজে অস্ট্রেলিয়া চলে গেছে। গতকাল যেমন সমস্ত জায়গায় ছড়িয়ে গেছে, ওই সময় তো ওটা বলার মতো অবস্থা ছিল না" ভারাক্রান্ত কন্ঠে বলছিলেন তিনি।

তাদের মায়ের মানসিক অবস্থা ভালো নয়, পাশাপাশি নিয়াজ মোর্শেদ নিখোঁজ হবার পর থেকে তার স্ত্রীও মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছেন বলে জানান জান্নাতুল মাওয়া।

"ওর স্ত্রীর কথা কী আর বলবো - এত অল্প বয়সে দু'টো মেয়ে নিয়ে কিসের মধ্যে যে পড়েছে! অন্যরকম একটা স্ট্রাগলের মধ্যে পড়েছে সে। আর নিয়াজের এমন ঘটনায় আমাদের জীবন, পরিবারের ওপর যে কী পরিমাণ প্রভাব ফেলেছে, তা আমি ভাষায় প্রকাশ করতে পারবো না"।

কথা হয়েছিল নিয়াজ মোর্শেদের চাচা ফরিদউদ্দিনের সঙ্গেও। তিনি চট্টগ্রামের একটি পত্রিকায় কাজ করেন। মি: মোর্শেদের বাবা ছিলেন পাঁচ ভাইয়ের মধ্যে সবার বড়।

দীর্ঘদিন কোন ধরনের যোগাযোগ না থাকলেও বড় ভাইয়ের পরিবারের একজন সদস্যের এমন ঘটনায় দু:খ ও হতাশাই প্রকাশ করলেন মি: ফরিদউদ্দিন।

"নিয়াজ যখন ক্লাস সিক্স-সেভেনে পড়তো, তখন শেষ দেখেছিলাম। এরপর আমি বাইরে চলে যাই। গতকাল ঘটনাটা জানার পর থেকে খুব দু:খ লাগছে। আমার ভাই এত শিক্ষিত, এত দারুণ লোক ছিলেন। তিনি যদি এখন বেঁচে থাকতেন, তাহলে হয়তো এ খবর শুনেই স্ট্রোক করতেন"- বলেন নিয়াজের চাচা।

সম্পর্কিত বিষয়