ইতিহাসের স্বাক্ষী
আপনার ডিভাইস মিডিয়া প্লেব্যাক সমর্থন করে না

পাকিস্তানের লাহোরে ২০০৯ সালে শ্রীলঙ্কান ক্রিকেট দলের ওপর সন্ত্রাসী হামলার স্মৃতিচারণ

  • ১৯ মার্চ ২০১৭

এখন থেকে আট বছর আগে একটি ঘটনা পাকিস্তানের ক্রিকেটের জন্য মহা বিপর্যয় ডেকে এনেছিলো।

লাহোরে শ্রীলঙ্কার ক্রিকেট দলকে বহনকারী বাসে সন্ত্রাসী হামলার পর থেকে পাকিস্তানের মাটিতে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কার্যত বন্ধ হয়ে গেছে।

বিবিসির রেবেকা কেসবি'র কাছে দুজন প্রত্যক্ষদর্শী লাহোরে সেদিনের হামলার স্মৃতিচারণ করেছেন -আইসিসি ম্যাচ রেফারি ক্রিস ব্রড এবং পাকিস্তানের আম্পায়ার এহসান রাজা।

তেসরা মার্চ, ২০০৯। লাহোরে হোটেল থেকে গাদাফি স্টেডিয়ামে ম্যাচের জন্য কয়েকটি বাসে করে রওয়ানা হয় সফরকারী শ্রীলঙ্কান দল এবং ম্যাচ পরিচালনার জন্য বিদেশ থেকে লোকজন।

ব্রিটিশ ম্যাচ রেফারি ক্রিস ব্রড শ্রীলঙ্কা টিম বাসের পেছনে একটি মিনি ভ্যানে ছিলেন। "আমি ঠিক ড্রাইভারের পেছনের সিটে ছিলাম। এহসান আমার পাশের সিটে। সে হঠাৎ চিৎকার করে উঠলো - মাথা নিচু করো।"

ক্রিস ব্রডের সহযাত্রী ছিলেন পাকিস্তানের একজন আম্পায়ার এহসান রাজা। "ক্রিস অনেক লম্বা। আমি সেই তুলনায় অনেক খাটো। ফলে আমি সহজে গাড়ির মেঝেতে শুয়ে পড়লাম আর ক্রিস কোনোরকমে সিটের নীচে ঢোকার চেষ্টা করছিল। গুলি চলছিল। আমরা পরিষ্কার বুঝতে পারছিলাম ঘটনা খুবই গুরুতর।"

ছবির কপিরাইট Gallo Images
Image caption ম্যাচ রেফারি ক্রিস ব্রড। লাহোরের হামলায় প্রাণে বেঁচে গিয়েছিলেন।

১২ জন বন্দুকধারী ঐ ক্রিকেট কনভয়ের জন্য ওঁত পেতে ছিলো। গাদাফি ক্রিকেট স্টেডিয়ামের কাছে মোড়ে গাড়িগুলো পৌঁছুনোর সাথে সাথে গুলি শুরু হয়ে যায়। নিরাপত্তার ভয়ে ভারত পাকিস্তানে সফর বাতিল করে দেয়ার পর শ্রীলঙ্কা এগিয়ে এসেছিল। পাকিস্তানে তাদেরকে সর্বোচ্চ নিরাপত্তার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। ফলে গোলাগুলি যখন শুরু হলো, প্রথমে ক্রিস এবং এহসান ঠিক বুঝে উঠতে পারেননি তাদের লক্ষ্য করেই এই হামলা।

এহসান রাজা বলছিলেন, "আমরা প্রথমে ভাবলাম দুই গ্রুপের মধ্যে লড়াই শুরু হয়েছে। আমরাই যে হামলার লক্ষ্য সেটা বুঝিনি, কারণ পাকিস্তানীরা ক্রিকেট পাগল জাতি।"

ক্রিস ব্রড - "আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে এ ধরণের ঘটনা তো ঘটেনি। পাকিস্তানীরা ভেবেছিলো ক্রিকেট তাদের দেশে ধর্মের মত। সুতরাং সন্ত্রাসবাদের ছোঁয়া অন্তত ক্রিকেটে লাগবে না। কিন্তু তারা আমাদের দিকেই গুলি ছুড়ছিল। গুলি লেগে জানালার কাঁচ টুকরো টুকরো হয়ে আমাদের ওপর পড়ছিলো। আমাদের গাড়ির ড্রাইভারে কাঁধে গুলি লেগে সে মারা গেল। রক্তে ভেসে যাচিছলো গাড়ির মেঝে।"

নিজের সিটেই ড্রাইভারের মৃত্যুর কারণে ম্যাচ কর্মকর্তারা রাস্তায় আটকা পড়ে গেলেন। ঘেরাও হয়ে পড়লেন।

এহসান রাজা - "ক্রিস এবং আমরা কজন ভয়ে চিৎকার করছিলাম, কারণ আমরা বুঝতে পারছিলাম আমাদের গাড়ির ওপর গুলি চলছে এবং আমরা ঘোরতর বিপদে।"

"এক পর্যায়ে আমার মনে হলো যদি ক্রিস বা গাড়ির অন্য কারোর গায়ে গুলি রাগে সেটা আমার দেশের জন্য সর্বনাশ হবে। এটা ভেবে আমি উঠে দাঁড়ালাম। হ্যাঁ আমি ক্রিসকে বাঁচানোর চেষ্টা করছিলাম। আমার গায়ে দুটো গুলি লাগে। একটা পিঠে, একটা পেটে। মারা যেতে পারতাম, কিন্তু ক্রিস আমার রক্ত আটকানোর চেষ্টা করছিলো।"

ক্রিস ব্রড- "আমার মনে আছে এহসানের গায়ে গুলি লেগেছিলো। রক্তে ভেসে যাচিছলো। সে প্রার্থনা করছিলো। আমি তার পিঠে গুলি লাগার জায়গায় হাত দিয়ে চেপে ধরেছিলাম। আমি রক্ত থামানোর চেষ্টা করছিলাম।

এহসান রাজা- "শরীরে প্রচণ্ড যন্ত্রণা অনুভব করছিলাম। ধরেই নিয়েছিলাম আমি মারা যাচ্ছি। আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করছিলাম আমার মেয়েদের জন্য যেন আমি বেঁচে থাকতে পারি।"

২০ মিনিট ধরে গুলি চালানোর পর বন্দুকধারীরা পালিয়ে যায়।

তাদেরকে নিরাপদ জায়গায় সরিয়ে নেওয়ার পরই শুধু ক্রিস এবং এহসান অনুধাবন করতে পেরেছিলেন বিপদের মাত্রা কতটা ভয়াবহ ছিলো।

হামলাকারীরা শ্রীলঙ্কান টিম বাসে রকেট-চালিত গ্রেনেড ছুঁড়েছিল। ভাগ্যিস সেটি বাসের গায়ে লাগেনি। ড্রাইভার অত্যন্ত সাহস করে অবিরাম গুলির মধ্যেই পুরো গতিতে বাস চালিয়েছিলো। বাসের নীচে গ্রেনেড ছুড়ে মেরেছিলো হামলাকারীরা। কিন্তু অলৌকিকভাবে সেটা ফাটার আগেই বাসটি তা পেরিয়ে যায়। ড্রাইভার মেহের মোহাম্মদ খলিল শ্রীলঙ্কান দলকে নিয়ে স্টেডিয়ামের ভেতরে ঢুকে যেতে পেরেছিলেন। তবে ছজন ক্রিকেটার আহত হয়েছিলেন।

ছবির কপিরাইট AAMIR QURESHI
Image caption বাসচালক মেহের ম: খলিল রক্ষা করেছিলেন শ্রীলঙ্কান দলকে

এত বছর পর পেছনে তাকিয়ে এহসান এখন মনে করেন তারা প্রাণে বেঁচে গিয়েছিলেন কারণ হামলাকারীরা বোঝেনি ঐ মিনি ভ্যানে যাত্রীরা কারা কারা ছিলেন। "আমাদের ভ্যানটি পুরনো ধরনের ছিল। জানলায় পর্দা ছিলো। ফলে তারা বোঝেনি যে ভেতরে বেশ কজন বিদেশী ছিল।"

ক্রিস ব্রডও বলেন, "তারা যদি জানতো গাড়ীর ভেতরে আমরা ছিলাম, তাহলে আমাদের সেদিন রক্ষা ছিলনা।"

লাহোরের ডাক্তাররা এহসানের জীবন বাঁচাতে পারলেও, তার একটি ফুসফুস চিরতরে নষ্ট হয়ে যায়।

"ডাক্তাররা আমারে শরীরে ১২ পাইন্ট রক্ত ঢুকিয়েছিলেন । কিন্তু আমার জীবন বাঁচিয়েছিলো ক্রিস ব্রড। সে ছিল আমার এঞ্জেল।"

ক্রিস ব্রড অবশ্য মনে করেন ভাগ্যের জোরেই তারা রক্ষা পেয়েছিলেন। "না আমি কোনো এঞ্জেল ছিলাম না। আমরা সেদিন ভাগ্যের জোরে বেঁচে গিয়েছিলাম।"

শ্রীলঙ্কান দলের ওপর সেই সন্ত্রাসী হামলার পর পাকিস্তানে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট বন্ধ হয়ে যায়। টানা ছয় বছর পর ২০১৫'র মে মাসে জিম্বাবুয়ে একটি টেস্ট সিরিজ খেলতে রাজি হয়, এবং সেটা লাহোরেই। কিন্তু বড় কোনো দল এখন পর্যন্ত পাকিস্তানে যায়নি। পাকিস্তানকে তাদের ডোমেস্টিক সিরিজ আয়োজন করতে হচ্ছে সংযুক্ত আরব আমিরাতে। ক্রিস ব্রড এখনো আইসিসির ম্যাচ রেফারি। আর এহসান রাজা সাত বছর পর সম্প্রতি আবার আম্পায়ার হিসাবে মাঠে ফিরেছেন।