ঢাকার সড়কজুড়ে নৈরাজ্য, আইনকে ‘থোড়াই কেয়ার’

সড়কে নৈরাজ্য
Image caption প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সামনে: লাল বৃত্তের মধ্যিখানের যানবাহনগুলো দেখুন- মাইক্রোবাসটি রঙ সাইড দিয়ে যাচ্ছে। মোটরসাইকেলটি এমন এক জায়গা থেকে সড়ক অতিক্রম করতে চাইছে যেটা সম্পূর্ণরূপে বেআইনি। আর এই সড়কে অযান্ত্রিক যানবাহন চলাচল নিষিদ্ধ, ফলে বাইসাইকেলটি এখানে থাকবারই কথা নয়। পাশে ট্রাফিক পুলিশও দেখা যাচ্ছে।

বিরতিহীন সাইরেন বাজাতে বাজাতে দ্রুত চলে যাচ্ছিল গাড়িটি। যে সিএনজি অটোরিকশাটায় বসে আমি যানজটে নাকাল হচ্ছিলাম, সেটির দরজা খুলে বেরোতে বেরোতে গাড়ি চলে গেছে বেশ কিছুটা দূর।

তারপরও যেটুকু বুঝলাম, এটি একটি পাজেরো। সরকারি গাড়ি। সামনে একটি পতাকা-দণ্ডও রয়েছে। যদিও পতাকা উড়ছে না সেখান থেকে। সম্ভবত কোন পদস্থ সরকারি কর্মকর্তা এটির ভেতরে রয়েছেন।

জরুরী সেবাদাতা সংস্থার গাড়ি না হওয়ায় এটি থেকে সাইরেন বাজবার কথা নয়।

গাড়িটি সড়কের ডান পাশ দিয়ে, অর্থাৎ 'রং সাইড' দিয়ে যাচ্ছিল।

সকাল দশটার মতো বাজে। অফিস টাইম। সবাই ব্যস্ত।

গাড়িটি যাচ্ছে 'বীর উত্তম মেজর জেনারেল আজিজুর রহমান সড়ক' ধরে, ঢাকাবাসীরা এটিকে লিংক রোড বলে চেনেন।

পাজেরোটি রং সাইড দিয়ে ঠিক প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সামনের সড়কে গিয়ে বের হল। সেখান থেকে কিছুটা উল্টোপথে রাস্তা পার হল। তারপর অবশেষে সঠিক পথে চলতে শুরু করলো।

পুরো ব্যাপারটা ঘটলো প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সামনের রাস্তায় কর্মরত একজন ট্রাফিক সার্জেন্ট ও দুজন ট্রাফিক পুলিশের চোখের সামনেই।

কর্তব্যরত ট্রাফিক পুলিশের দৃষ্টি আকর্ষণ করলে তিনি অনেকটা উষ্মা ভরা কণ্ঠে বললেন, "রং সাইডে আপনি কত ঠেকাবেন, বলেন? হাজার হাজার গাড়ি"।

আমি কথা বলতে বলতেই চোখের সামনে দিয়ে উল্টো পথে বেরিয়ে গেল একটা অ্যাম্বুলেন্স, একটি ব্যক্তিগত গাড়ি, তারপর আরো দুটি ব্যক্তিগত গাড়ি, কয়েকটা মোটরসাইকেল।

অ্যাম্বুলেন্সটিকে পথ করে দিলেও প্রথম গাড়িটিকে আটকানোর চেষ্টা তারা করছিলেন। চালক কি বলল কে জানে, ট্রাফিক পুলিশ গাড়িটিকে ছেড়ে দিল। তারপরের গাড়িগুলোকে আটকানোর আর চেষ্টাই করল না।

Image caption অসুস্থ রোগী বহণকারী অ্যাম্বুলেন্স অতি প্রয়োজনে উল্টো পথে যেতে পারবেন, বিধিতে বলা আছে। কিন্তু লাশবাহী গাড়ি? (লাল বৃত্ত চিহ্নিত)

উল্টো পথে কি কেউ যেতে পারেন?

ট্রাফিক বিধি অনুযায়ী তিন ধরণের যানবাহন প্রয়োজন পড়লে রং সাইডে যেতে পারে।

অ্যাম্বুলেন্স, দমকলের অগ্নি নির্বাপনী গাড়ি এবং পুলিশের গাড়ি ও মোটরসাইকেল।

তাও তারা যেতে পারবেন জরুরী পরিস্থিতি তৈরি হলে।

অ্যাম্বুলেন্স খালি থাকলে বা পুলিশ বাড়ি থেকে অফিসে যাওয়ার জন্য এই সুবিধা নিতে পারবে না।

কিন্তু ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের ট্রাফিক বিভাগের কমিশনার মোসলেহউদ্দীন আহমেদ বলছেন জরুরী রাষ্ট্রীয় প্রয়োজনে অতি গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের মাঝে মাঝে রং সাইডে পথ করে দেন তারা।

যদিও এ ব্যাপারে বিধিতে কিছু বলা নেই বলে উল্লেখ করেন মি. আহমেদ।

সাধারণেরা আইন ভাঙছেন প্রতিনিয়ত:

ফার্মগেটের পুলিশ বক্সের পাশে রাস্তার রং সাইডে অনেকগুলো গাড়ি দাঁড়িয়ে আছে, তারা সিগনালের অপেক্ষা করছে।

এই লেনটা মূলত বাঁ দিকে বেরিয়ে যাওয়ার জন্য, কিন্তু তারা সবাই অপেক্ষা করছে ডানে বেরিয়ে যাবে বলে। এটা একেবারেই বেআইনি।

Image caption শেওড়াপাড়া: সড়কের ফাঁকা লেনটি দিয়ে সোজা পথে যে কটি যানবাহন চলছে, উল্টো পথে চলছে তার চাইতে বেশী। আইন ভঙ্গকারীদের মিছিলে রয়েছে ব্যক্তিগত গাড়ি মোটর সাইকেল। দূরে পুলিশের একটি ভ্যানও দেখা যাচ্ছে। তার জরুরী অবশ্য জরুরী পরিস্থিতিতে যেতে পারে। (লাল বৃত্ত চিহ্নিত)

লাইন দিয়ে অনেকগুলো গাড়ি দাঁড়ানো - পুলিশের একজন বড় কর্তাকে বহনকারী পাজেরো, তারপর ঢাকা ওয়াসার লোগো লাগানো একটি মাইক্রোবাস, একটি ব্যক্তিগত মাইক্রোবাস, সংসদ সচিবালয়ের লোগো সম্বলিত একটি মাইক্রোবাস, একটি ব্যক্তিগত পাজেরো গাড়ি, একটি সিএনজি অটোরিকশা, একটি প্রাইভেট কার, তার পেছনে একটি স্কুল বাস। এটিতে ভিকারুননিসা নুন স্কুলের ছাত্রীরা বসে আছে।

চালককে জিজ্ঞাসা করলে জবাব এলো, স্কুলে দেরী হয়ে যাচ্ছে, কি করব? তিনি স্বীকার করলেন তিনি জানেন এটা করে আইন ভাঙছেন তিনি।

এখানে ট্রাফিক পুলিশকে সাহায্য করছিলেন পুলিশের একজন কর্মকর্তা আবদুর রাজ্জাক।

"হাই অফিসিয়াল কিছু গাড়ি এদিক দিয়ে আসে। তারা এই কাজটা করে। মাননীয় সংসদ সদস্য সাহেবরা..", বলছিলেন তিনি।

জানতে চাই, এদেরকে কি আইন থেকে অব্যাহতি দেয়া হয়েছে?

মি. রাজ্জাক বলছেন, "ইনডেমনিটি নাই। কিন্তু যাওয়া লাগে, ছাড়া লাগে। বললেও মামলা করা যায় না"।

"অনেক কিছু করা যায় না, সেটা আপনিও বোঝেন। মাননীয় সংসদ সদস্য সাহেবের গাড়িতো আমরা....। হয়ত রিপোর্ট একটা দেয়া যায়, ছবি-টবি তুলে"।

মি. রাজ্জাক আরো বলছিলেন, অনেক সময় তারা এখান থেকে গাড়ি ঘুরিয়ে বাম দিকে বের করে দিতে যান, কিন্তু অনেকে শুনতে চায় না।

তারা 'প্রভাব খাটায়', বলছিলেন পুলিশের কর্মকর্তা আব্দুর রাজ্জাক।

Image caption আইন ভাঙার সবচাইতে বেশী অভিযোগ মোটরসাইকেল ও রিক্সা-ভ্যানের বিরুদ্ধে।

বেপরোয়া মোটরসাইকেল ও রিকশা:

প্রধানমন্ত্রী যাবেন তাই বিজয় সরণি মোড় আটকে দিয়েছে পুলিশ।

যানজট তৈরি হয়েছে সেখান থেকে আগারগাঁও ছাড়িয়ে প্রায় শেওড়াপাড়া পর্যন্ত।

মোড় আটকে রাখার কারণে সড়কের উল্টোপাশ থেকে গাড়ী আসছে না, তাই ফাঁকা।

বঙ্গবন্ধু সম্মেলন কেন্দ্রের সামনের সেই ফাঁকা লেন ধরেই উল্টোপথে চলে যাচ্ছে একের পর এক রিকশা এবং মোটরসাইকেল।

এদের বিরুদ্ধেই ট্রাফিক আইন অমান্য করার অভিযোগ সবচাইতে বেশী।

এক মোটরসাইকেল আরোহীকে দেখা গেল, তিনি উল্টোপথে তো যাচ্ছেনই, আবার অদ্ভুত এক কৌশলে হেলমেটের সাথে তার মোবাইল ফোনটাকে কানের সঙ্গে আটকে কথা বলতে বলতে যাচ্ছেন।

তাকে থামালাম, তিনি বললেন, "মায়ের অসুখ, হাসপাতালে, দ্রুত যেতে হবে, তাই আইন ভেঙেছি, স্যরি"।

আর রঙ সাইডে আসা এক রিকশাওয়ালার কাছে জানতে চাইলাম, তাকে তো মামলা দেয়া যায় না, তাকে কি পুলিশ কখনো কিছু বলে না?

জবাব এলো, "পুলিশ পেটায়। কি করবো বলেন? এত জ্যাম!"

Image caption ফার্মগেট ওভারব্রিজ থেকে পাখির চোখে দেখা।

স্বেচ্ছাচারী পাবলিক বাস:

ফার্মগেট ওভারব্রিজের উপর উঠে রাস্তার দিকে পাখির চোখ করে তাকিয়ে দেখা গেল এক চরম অরাজকতা।

বাসগুলো চলছে যেন সাপের মতো এঁকে-বেঁকে, এ লেন থেকে ও লেনে, ও লেন থেকে এ লেন।

আবার যেখানে সেখানে দাঁড়িয়ে পড়ছে। বাস স্টপেজ তো দূরে থাক, বাস রাস্তার পাশে পর্যন্ত নিচ্ছে না তারা।

সড়কের মাঝখানে দাঁড়িয়েই অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণভাবে তারা যাত্রী ওঠাচ্ছে এবং নামাচ্ছে।

ফার্মগেটে সড়কের দুপাশে দুটি প্রশস্ত বাস বে তৈরি করা রয়েছে যাত্রী ওঠা-নামা করানোর জন্য। রাস্তার পূর্ব পাশের বাস বে-টি দেখা গেল খালি। একটু সামনে কারওয়ান বাজারের দিকে ফুটপাত ঘেঁষে দাড়িয়ে যাত্রী তুলছে কয়েকটি বাস।

আইন ভঙ্গকারী প্রতিষ্ঠান:

গণমাধ্যম কর্মীদের ব্যবহার করা যানবাহন এবং পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলো, বিশেষ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীদের বহনকারী বাসগুলোর বিরুদ্ধে দীর্ঘদিনের অভিযোগ, তারা সড়কের আইনকানুনের তোয়াক্কা করে না।

বিশেষ করে বেসরকারি টেলিভিশন কোম্পানিগুলোর লোগো সম্বলিত যানবাহনগুলোর ট্রাফিক আইন ভাঙা এতটাই নিয়মিত হয়ে গিয়েছিল, যে ২০১৬ সালের জুন মাসে পুলিশের পক্ষ থেকে সংবাদ সম্মেলন করে গণমাধ্যমগুলোকে অনুরোধ জানানো হয়েছিল আইন মেনে চলতে।

তাতে কি পরিস্থিতি কিছু বদলেছে?

Image caption স্কুল পড়ুয়া শিশুদের নিয়ে এই রিক্সা-ভ্যানটি খুবই ঝুঁকিপূর্ণভাবে যানজটে পূর্ণ একটি সড়ক অতিক্রম করতে চাইছে।

ট্রাফিক বিভাগের কমিশনার মি. আহমেদ বলছেন, "গত জুন মাস থেকে কিন্তু আমরা পুলিশ-গণমাধ্যম সবার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিচ্ছি। আমরা কিন্তু পুরোপুরি এখনো এটাকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারিনি, এটা ঠিক। অনেক দিন ধরে আমাদের পুলিশ, আমাদের গণমাধ্যম, আমাদের অনেক গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি-তাদের কিন্তু আইন না মানার প্রবণতা ছিল বা আছে"।

"বিশ্ববিদ্যালয়ের বাস, বিশেষ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাস, যদি সুনির্দিষ্ট করে বলি, এগুলোর অনেক সময় উল্টো পথে যাবার প্রবণতা আছে। আমরা এগুলো বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য এবং প্রক্টর মহোদয়কে চিঠি দিয়ে জানিয়েছি, তাদের সাথে কথাও বলেছি"।

"আগে ইউনিভার্সিটির বেশীরভাগ বাসই উল্টোপথে যেত, যখন সড়কে যানবাহনের পরিমাণ বেশী থাকত। এখন বেশীরভাগ যাচ্ছে না। কিছু যাচ্ছে। প্রবণতা অনেক কমে এসেছে", বলছেন মোসলেহউদ্দীন আহমেদ।

যত্রতত্র পার্কিং:

পার্কিং নিয়ে ঢাকায় চলছে আরেক অরাজকতা।

যার যেখানে ইচ্ছে গাড়ি রেখে দিচ্ছে। অবশ্য রাখবেই বা কোথায়?

ঢাকার সড়কে তিন লাখ যানবাহন চলার ক্ষমতা রয়েছে, চলছে এগারো লাখের বেশী।

অতিরিক্ত গাড়ির জন্য চাই অতিরিক্ত পার্কিং। কিন্তু কোথায় এত পার্কিং?

ঢাকার সোনারগাঁও মোড় থেকে হাতিরপুলের দিকে চলে যাওয়া বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়কটিতে সারা বছরই দেখা যায় রাস্তার দুধারে অসংখ্য গাড়ি পার্কিং করা। মাঝখানে যেটুকু ফাঁকা তা দিয়ে কোন মতে একটি গাড়ি যায় কি যায় না।

সিটি কর্পোরেশন থেকে একটি ভ্রাম্যমান আদালত এখানে এসেছে অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করতে। তারা অবৈধ পার্কিংও উচ্ছেদ করলো।

কিন্তু ভ্রাম্যমান আদালত চলে যাওয়ার কয়েক মিনিটেরও মধ্যেই আবার সব গাড়িগুলো এসে দাঁড়িয়ে পড়লো আগের জায়গায়।

এই সড়কটিতে যেসব গাড়ি পার্ক করা থাকে, তার অধিকাংশই কয়েকটি বেসরকারি টেলিভিশন প্রতিষ্ঠানের।

Image caption পার্কিং লটে পরিণত বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক। (সিটি কর্পোরেশনের উচ্ছেদ অভিযানের আগে।)
Image caption উচ্ছেদ অভিযান শেষে সিটি কর্পোরেশনের ভ্রাম্যমান আদালত চলে যাবার কয়েক মিনিট পর বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক আবার।

শৃঙ্খলা ফেরানোর অভিনব চেষ্টা:

ট্রাফিক চলাচলের জন্য যে সড়ক বাতির সিগন্যাল, তা ঢাকা শহরের যানবাহনগুলোকে মেনে চলতে দেখা যায়নি কখনোই।

পুলিশেরও এতে আগ্রহ বিশেষ নেই, হাতই তাদের প্রধান অস্ত্র।

কিন্তু দেখা যাচ্ছে অনেক ক্ষেত্রে পুলিশ হাত তুললেও যানবাহন থামছে না। কখনো কখনো এমনও দেখা যায় পুলিশকে দুই হাত ছড়িয়ে চলন্ত গাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে পড়তে, তাতে যদি অন্তত থামে তারা।

এখন তাই নতুন কৌশল নিয়েছে ট্রাফিক বিভাগ। এফডিসি থেকে কারওয়ান বাজার মোড়ের দিকে আসতে সোনারগাঁও হোটেলের সামনে যানবাহন আটকানোর জন্য বসানো হয়েছে রেললাইনের মতো সিগন্যাল গেইট।

সার্ক ফোয়ারা আর ফার্মগেট মোড়ে বসানো হয়েছে স্টিলের গেট, একটি রেলের উপর দিয়ে সেই গেট টেনে নিয়ে রাস্তা আটকে দেবার ব্যবস্থা।

আর বিজয় সরণি-সহ অনেক মোড়েই দেখা গেল রশি টানানো।

যানবাহন আটকাতে হলে পুলিশ রশি টানটান করে দিচ্ছে, আবার যখন ছাড়তে হবে তখন ঢিলে করে দেয়া হচ্ছে।

এটুকুতেও উপলব্ধি করা সম্ভব ঢাকার সড়কগুলো ব্যবহার করছে যেসব নাগরিকেরা তারা আইন ভাঙতে কতটা বেপরোয়া!

Image caption বিজয় সরণি ট্রাফিক সিগন্যালে রশি টানিয়ে যানবাহন আটকানোর চেষ্টা।

'সিভিক সেন্স' কোথায়?

দেখা যাচ্ছে, সাংবাদিক থেকে শুরু করে পুলিশ, মন্ত্রী থেকে সংসদ সদস্য, আমলা থেকে সাধারণ চাকুরীজীবী, বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া ছাত্র থেকে রিকশাওয়ালা—কেউই আইনের প্রতি বিন্দুমাত্র সম্মান প্রদর্শন করছেন না।

সিভিক সেন্স বা নাগরিক ভব্যতার যে ধারণাটি, সেটি কি তাহলে ঢাকা শহরে আর কাজ করছে না?

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক এবং সমাজবিজ্ঞানী মাহবুবা নাসরীন বলছেন, "এখন আমরা এখানে অনিয়মটাকেই নিয়ম করে ফেলেছি। যেখানে নগরায়ণটাই অপরিকল্পিত হয়েছে, সেখানে নগরের মানুষের অভ্যাসগুলো অপরিণতভাবে হয়েছে"।

অবশ্য ট্রাফিক আইন ভঙ্গ করার জন্য শাস্তি যা তাও দেখা যাচ্ছে খুব সামান্যই।

বর্তমান আইনে, উল্টো পথে গাড়ি চালানোর শাস্তি মোটে দুইশ টাকা জরিমানা। দ্রুত গন্তব্যে পৌঁছানোর জন্য অনেকেই নিশ্চয়ই দুইশ টাকা খোয়ানোর ঝুঁকি নিতে রাজী থাকবেন।

কিন্তু সড়ক নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ প্রফেসর শামসুল হক বলছেন, আজ যে নাগরিকেরা সড়কের নিয়মকানুন মানছেন না, তার গোড়াপত্তন করে দিয়েছেন নগরের পরিকল্পনা যারা করেছেন তারা, অর্থাৎ কর্তৃপক্ষ।

"আমি যদি এখন ক্যান্টনমেন্ট থেকে আর্মিও নামাই, সিস্টেম অ্যানালাইসিস করেই বলে দেয়া যায়, রাস্তাঘাটের ধারণ ক্ষমতা আর নাই, পথচারীদের জন্য যথেষ্ট পারাপার ব্যবস্থা নাই। সুতরাং এই অবস্থায় তাদের কাছে ভদ্র ব্যবহার পেতে চাওয়াটা একটা অন্যায় আবদার হবে"।

"আগে আসবেন, আগে যাবেন- এটা একটা বিজ্ঞান। এটা বাস্তবায়ন করার জন্য চাহিদা ও যোগানের মধ্যে একটা সমন্বয় থাকতে হয়। দুর্ভাগ্য আমাদের এই ঢাকা শহরে কেউ চাহিদা ও যোগা নিয়ে চিন্তা করেনি। মানুষ কখন আইন ভঙ্গকারী হয়? যোগান যখন সীমিত হয়, চাহিদা যখন অসীম হয়, ফ্লাডগেট ওপেন করবেই, ভেঙেই ফেলবে", বলছিলেন প্রফেসর শামসুল হক।

সম্পর্কিত বিষয়