চট্টগ্রামে ধর্ষণের অভিযুক্তকে বিয়ের শর্তে মুক্তি দেয়া নিয়ে বিতর্ক

  • ২৩ মার্চ ২০১৭
ছবির কপিরাইট Sk Hasan Ali
Image caption শিশু ধর্ষণের বিরুদ্ধে ঢাকায় মহিলাদের একটি প্রতিবাদ কর্মসূচী

কোন মেয়েকে ধর্ষণের অভিযোগে যদি কাউকে জেলে পাঠানো হয়, ধর্ষিতা মেয়েটিকে বিয়ে করার শর্তে কি তাকে মুক্তি দেয়া উচিৎ ?

বাংলাদেশের চট্টগ্রামে এক কিশোরীর ক্ষেত্রে এমনটাই ঘটেছে। আদালতের সম্মতিতে এবং দুই পক্ষের আইনজীবীদের মধ্যস্থতায় মেয়েটির সঙ্গে ধর্ষণের অভিযোগে অভিযুক্ত ছেলেটিকে বিয়ে দেয়া হয়েছে গতকাল। এরপর ছেলেটি জামিনে মুক্তি পেয়েছে। কিন্তু এর আইনগত ভিত্তি আর নৈতিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন চট্টগ্রামেরই এক মানবাধিকার আইনজীবী।

ঘটনাটি ২০১৫ সালের। বলা হচ্ছে তের বছরের এই কিশোরীর সঙ্গে প্রেমের সম্পর্ক ছিল ছেলেটির। এক সময় মেয়েটি অন্ত:সত্ত্বা হয়ে পড়ে। কিন্তু ছেলেটি বিয়েতে রাজী হচ্ছিল না। তখন ছেলেটির বিরুদ্ধে ধর্ষণের অভিযোগে মামলা করা হয় কিশোরীর পরিবারের পক্ষ থেকে। ছেলেটিকে গ্রেফতার করে কারাগারে পাঠানো হয়।

এর মধ্যে মেয়েটি একটি সন্তানের জন্ম দিয়েছে, যার বয়স এখন এক বছরের বেশি। কিন্তু ছেলেটি বিচারাধীন আসামী হিসেবে কারাগারেই ছিল। দুবছর ধরে তার জামিনের চেষ্টা ব্যর্থ হয়।

শেষ পর্যন্ত ছেলেটির মুক্তির জন্য সমাধান হিসেবে হাজির করা হয় এই বিয়ের ফর্মূলা।

এই মামলায় রাষ্ট্র-পক্ষের আইনজীবী হিসেবে কাজ করেছেন এম এ ফয়েজ। তিনি বলছিলেন মামলার আসামী এখন মেয়েটিকে বিয়েতে রাজি হওয়ায় দুই পক্ষের উপস্থিতিতে আদালতে এই বিয়ের কাজটি সম্পন্ন করা হয়।

"মেয়ের পরিবারকে আমরা আদালতে ডাকলাম। আদালতও নির্দেশ দিল, তারা যদি রাজী হয়, আপনারা এটা বিয়ের আয়োজন করেন। তখন মেয়ের বয়সও ১৮ হয়ে গেল। সন্তানের বয়সও একের অধিক হয়ে গেল। রাজী হওয়ার পর কালকে আমরা এই বিয়েটা পড়িয়ে দিলাম মেয়েটির সঙ্গে।

তিনি আরও বলেন, মেয়েটি এবং তার শিশু সন্তানের কথা চিন্তা করেই এই পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে।

মামলায় উভয়পক্ষের আইনজীবীরা দাবি করছেন, মেয়েটির বয়স এখন ১৮ বছরের বেশি, কাজেই এই বিয়েতে কোন আইনগত অসুবিধা নেই।

কিন্তু দুবছর আগে ধর্ষণের অভিযোগে মামলা রুজু করার সময় যে মেয়েটিতে ১৩ বছরের কিশোরী বলে উল্লেখ করা হয়েছিল, মাত্র দু বছর পরেই কিভাবে সেই মেয়েকে ১৮ বছরের বেশি বলে দাবি করা হচ্ছে?

ছবির কপিরাইট Pacific Press
Image caption বাংলাদেশে সংশোধিত আইনে বাল্য বিয়েকে বৈধতা দেয়া হয়েছে বলে সমালোচনা হয়েছে সরকারের

চট্টগ্রামের আকবর শাহ থানার কর্মকর্তা আনোয়ার হোসেন নিশ্চিত করেছেন যে, এই মামলার এজাহারে মেয়েটির বয়স ১৩ বছর বলে উল্লেখ আছে। সে মোতাবেক তার বয়স এখন ১৫।

বাংলাদেশে সম্প্রতি বিশেষ ব্যবস্থায় ১৮ বছরের নীচে বিয়ের বিধান রেখে আইন পাশ হয়েছে। তবে এই বিয়েটি সেই বিশেষ আইন অনুসরণ করে হয়নি বলে জানিয়েছেন আইনজীবী এম এ ফয়েজ। তবে তিনি স্বীকার করেন বিয়ের সময় তারা মেয়েটির জাতীয় পরিচয় পত্র যাচাই করে দেখেন নি।

পুরো বিষয়টি কতটা আইনগত এবং নৈতিক হয়েছে, সে প্রশ্ন তুলছেন অনেকে।

চট্টগ্রামের মানবাধিকার বিষয়ক একজন আইনজীবী রেজাউল করিম বলছিলেন এই ঘটনা আইন ও নৈতিকতা- কোন দিক থেকেই এটা সমর্থনযোগ্য নয়।

"নারী শিশু নির্যাতন দমন আইনে কোনভাবেই এটা সমর্থনযোগ্য নয়। জামিনযোগ্য নয়। নৈতিকতার দৃষ্টিকোণ থেকেও এটা সমর্থনযোগ্য নয়। যে মেয়েটি ধর্ষণের শিকার হয়েছে, সে যে কতটুকু মানসিক ও দৈহিক নির্যাতনের শিকার হয়েছে, সেটা যদি ভাবেন, ছেলেটা এভাবে জামিন পেয়ে যাবে সেটা, আইনে তো এটা কোনভাবেই সমর্থনযোগ্য নয়।"

রেজাউল করিম বলেন, শুধু মাত্র মামলা থেকে অব্যাহতি পাওয়ার জন্য অভিযুক্ত ছেলেটি বিয়ে করেছে বলে তিনি আশঙ্কা করছেন।

এদিকে এই নবদম্পতি আগামী চার থেকে ছয় মাস আদালতের পর্যবেক্ষণে থাকবেন বলে আইনজীবী জানিয়েছেন। পরে বাদী চাইলে অভিযুক্তকে মামলা থেকে অব্যাহতি দিতে পারেন।