২৫শে মার্চে গণহত্যা দিবসের আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি কতটা সম্ভব?

বাংলাদেশ রাষ্ট্রীয়ভাবে এবছর থেকে ২৫শে মার্চকে গণহত্যা দিবস পালন করছে
Image caption বাংলাদেশ রাষ্ট্রীয়ভাবে এবছর থেকে ২৫শে মার্চকে গণহত্যা দিবস পালন করছে

১৯৭১ সালের ২৫শে মার্চ রাতে ঢাকায় পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর অপারেশন সার্চ লাইট নামে পরিচালিত অভিযানে প্রায় ৫০ হাজার বাঙালিকে হত্যা করা হয়েছিল বলে দাবি করে বাংলাদেশ।

এছাড়া ২৫শে মার্চের পর থেকে ৯ মাসের যুদ্ধে প্রায় ৩০ লাখ বাঙালিকে হত্যা করা হয়েছে বলেও সরকারিভাবে দাবি করা হয়।

একাত্তরে পাকিস্তানি সেনা ও বাঙালি সহযোগীদের দ্বারা এই ব্যাপক হত্যা ও নির্যাতনের বিষয়টিকে সামনে এনে বাংলাদেশ রাষ্ট্রীয়ভাবে এবছর থেকে ২৫শে মার্চকে গণহত্যা দিবস পালন করছে।

দেশের জাতীয় সংসদে এবং মন্ত্রিসভায় এ সংক্রান্ত একটি প্রস্তাবও পাশ হয়েছে।

বাংলাদেশ এখন এই দিবসটির একটি আন্তর্জাতিক স্বীকৃতিও আদায় করতে চাইছে।

ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির প্রধান শাহরিয়ার কবির বলেন, দেরিতে হলেও এ সিদ্ধান্ত নেয়ায় আমরা সরকারকে ধন্যবাদ জানিয়েছি।

তিনি বলেন, "২০০৫ সাল থেকে নির্মূল কমিটি এ দিবসটা পালন করে আসছে। দীর্ঘকাল আমাদের দাবির প্রতি কোনো সরকারই কর্ণপাত করেননি।"

Image caption শাহরিয়ার কবির

মি. কবির জানান, ২৫শে মার্চ আন্তর্জাতিক দিবস হিসেবে স্বীকৃতি পেতে তারাও চেষ্টা করেছিলেন, কিন্তু সরকারি উদ্যোগ না থাকায় সেটি সম্ভব হয়নি।

"আমরা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে আবেদন জানিয়েছিলাম, ইউনেস্কোকেও চিঠি দিয়েছিলাম। জবাব হিসেবে আর্মেনিয়া থেকে আমাদের কাছে জানতে চাওয়া হয়েছিল,বাংলাদেশে কি ২৫শে মার্চ গণহত্যা দিবস হিসেবে পালন করা হয়? আমরা জানিয়েছিলাম, হয় না। পরে জবাব এল যে, যেটা বাংলাদেশ জাতীয়ভাবে পালন করে না সেটা আন্তর্জাতিকভাবে কেন জাতিসংঘকে পালন করতে হবে? সে কারণে আর্মেনিয়ার প্রস্তাব অনুযায়ী ৯ই ডিসেম্বরে গণহত্যা দিবস হিসেবে পালন করার সিদ্ধান্ত হয় জাতিসংঘে," বলেন তিনি।

একাত্তরের স্বাধীনতা যুদ্ধে হত্যা ও নির্যাতন নিয়ে দীর্ঘ সময় ধরে গবেষণা করেছেন ডা. এম এ হাসান। গণহত্যার আন্তর্জাতিক সংজ্ঞার আলোকে তিনি বলেন, বাংলাদেশে ১৯৭১ সালে যে হত্যা, নির্যাতন হয়েছে সেটি নিশ্চিতভাবেই জেনোসাইড বা গণহত্যা।

তিনি ব্যক্তিগত উদ্যোগ নিয়ে ২০০৪ সালে ইউনেস্কোর কাছে ২৫শে মার্চকে গণহত্যা প্রতিরোধ দিবস হিসেবে স্বীকৃতি দেয়ার জন্য আবেদন করেছিলেন।

সে চিঠির জবাবেও বলা হয়েছিল জাতিসংঘের সদস্য রাষ্ট্র আবেদন করলে সেটি বিবেচনা করা যায়।

তিনি জানান, পরবর্তীকালে তৎকালীন সরকারও বিষয়টি নিয়ে কোনো উদ্যোগ নেয়নি।

একই ধরনের একটি দিবস থাকায় ২৫শে মার্চের আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পেতে একটি বিশেষজ্ঞ সেল গঠন করে কাজ করা প্রয়োজন বলে মি. হাসান মনে করেন।

Image caption এম এ হাসান, গবেষক

"বাংলাদেশের জনগণের "আত্মপরিচয়ের সন্ধান দেবার জন্য এ দিনটিকে একটি ভিন্ন নামে হলেও আন্তর্জাতিকভাবে প্রতিষ্ঠা করা প্রয়োজন এবং সেটা সম্ভব। যাতে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে একাত্তরে আমাদের দেশে যে গণহত্যা হয়েছিল, যেটা কোনো রেকর্ডে স্বীকৃত নয়, ইম্পেরিয়াল ওয়্যার মিউজিয়ামসহ পৃথিবীর বিভিন্ন আর্কাইভে যেটা নানা কারণে উপেক্ষিত, সে বৃত্ত থেকে আমরা বেরিয়ে আসতে পারি," বলেন তিনি।

বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হচ্ছে, ২৫শে মার্চ দিবসটির আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি আদায়ের জন্যে তারা এখন থেকে তৎপরতা শুরু করছে। যদিও দেখা যাচ্ছে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে ইহুদি হত্যা, রোয়ান্ডা ও ক্যাম্বোডিয়ার মতো হাতেগোনা কয়েকটি ঘটনাকে জাতিসংঘ গণহত্যা হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে।

তাছাড়াও এ ব্যাপারে আন্তর্জাতিক রাজনীতি জড়িত রয়েছে। এ ব্যাপারে শাহরিয়ার কবির বলেন,

"পশ্চিম ইউরোপের বহু দেশ প্রত্যক্ষভাবে না হলেও পরোক্ষভাবে ৭১-এ গণহত্যাকারীদের সমর্থন দিয়েছে। আমেরিকা, চীন, তথাকথিত ইসলামি উম্মাহ এরা কিন্তু পাকিস্তানের পক্ষেই ছিল। তারা গণহত্যার ব্যাপারে সরকারিভাবে প্রতিবাদ করেনি যদিও সেসব দেশের গণমাধ্যম এবং জনগণ এর নিন্দা করেছে।"

মি. কবির জানান পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে বৈঠক করে তারা বন্ধু দেশগুলোর সংসদে এ দিবসের স্বীকৃতিতে এক প্রস্তাব পাশ করার উদ্যোগ নিতে পরামর্শ দিয়েছেন।

"আমরা বলছি সেসব দেশের (৭১এ পাকিস্তানের পক্ষে) কাছে পরে যাওয়া যাবে, আগে বেশিরভাগ দেশের কাছ থেকে আমরা স্বীকৃতিটা নিয়ে নেই। তারপরে আমাদের বন্ধুদেরকে নিয়েই আমরা জাতিসংঘে যাব। তখন আমরা আশা করতে পারি যে অদূর ভবিষ্যতে জাতিসংঘেরও স্বীকৃতি পাওয়া যাবে। কারণ আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে এবং জাতিসংঘের বিভিন্ন দলিলপত্রেও বলা হয়েছে যে স্মরণকালের ইতিহাসে নৃশংসতম গণহত্যার একটি বাংলাদেশে ঘটেছিল ১৯৭১ সালে।"

Image caption মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রী আ.ক.ম মোজাম্মেল হক

বাংলাদেশে বিভিন্ন ব্যক্তি ও সংগঠন গণহত্যা দিবসের আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির জন্য প্রচেষ্টা চালালেও সব সরকারই এ ব্যাপারে উদাসীনতা দেখিয়েছে।

এ ব্যাপারে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রী আ.ক.ম মোজাম্মেল হক বলেন, "একসাথে তো সব কাজ করা যায় না। যেমন যুদ্ধাপরাধীদের বিচার, বঙ্গবন্ধুর হত্যাকারীদের বিচার। আগে তো একটা জিনিস করার মতো অবস্থা সৃষ্টি করতে হয়, জনমত সৃষ্টি করতে হয়, পরে সিদ্ধান্ত নিলে সিদ্ধান্তটা বেশি কার্যকর হয়। তাই আমরা মনে করেছি আগে একটা জনমত সৃষ্টি হোক, জনসাধারণ উপলব্ধি করুক যে স্বাধীনতাবিরোধী শক্তি তৎপর হওয়ায় এ কাজটা আমাদের করা দরকার।"