ইতিহাসের সাক্ষী
আপনার ডিভাইস মিডিয়া প্লেব্যাক সমর্থন করে না

মাদার টেরেসার কাজ নিয়ে কেন প্রশ্ন উঠেছিল এক অনুসারীর মনে?

  • ৩০ মার্চ ২০১৭

বিশ বছর আগে বিশ্বখ্যাত রোমান ক্যাথলিক ধর্মযাজক মাদার টেরেসা ৮৭ বছর বয়সে তার মৃত্যুর মাত্র ছয় মাস আগে তার দাতব্য প্রতিষ্ঠানের কাজ থেকে অবসর নিয়েছিলেন।

তাঁর অসংখ্য অনুসারী ও স্বেচ্ছাসেবী যারা তাঁর অনাথ আশ্রমে কাজ করেছেন তাদের মধ্যে একজন ছিলেন মারি মারসেল থেকেকারা।

ক্যাথলিক পরিবারে জন্ম আর বড় হয়ে ওঠা মারি মাদার টেরেসার অনাথ আশ্রমের সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়েন তার শিশুকালে। সেখানে স্বেচ্ছাসেবী হিসাবে কাজ করতে করতে মাদার টেরেসার কাজের পদ্ধতি, তাঁর আদর্শ নিয়ে মারির মনে নানা প্রশ্ন উঠতে শুরু করলে তিনি ওই আশ্রমের কাজ থেকে সরে যান।

মারি তার অভিজ্ঞতার কথা বলেছেন বিবিসির ইতিহাসের সাক্ষী অনুষ্ঠানে।

তাদের বাসা থেকে মাদার টেরেসার আশ্রম ছিল মাত্র ৫ মিনিটের পথ। প্রতিদিন সকালে স্কুল যাবার সময় মাদরকে দেখতেন মারি। "ছোটখাট চেহারার মানুষ- খুব পরিশ্রম করতে পারতেন।"

বর্তমান ম্যাসেডোনিয়ার স্কপিয়েতে জন্ম নেওয়া ধর্মযাজিকা মাদার টেরেসা তাঁর দাতব্য কাজ প্রথম শুরু করেছিলেন কলকাতার রাস্তায় ।

তাঁর কাজের পরিধি বিস্তৃত ছিল বিশ্বের শতাধিক দেশে এবং তাঁর প্রতিষ্ঠিত ধর্মীয় আদর্শে উদ্বুদ্ধ হয়েছিলেন সাড়ে চার হাজার ধর্মযাজিকা।

আরো পড়ুন:

সিলেটের 'সূর্য্য দীঘল বাড়ি' থেকে 'আতিয়া মহল'

'অপারেশন টোয়াইলাইট' আনুষ্ঠানিক সমাপ্তির অপেক্ষা

ভিডিও: এক নজরে সিলেটে 'জঙ্গিবিরোধী অভিযান'

ছবিতে: সিলেটে 'জঙ্গি আস্তানা'য় অভিযান

ছবির কপিরাইট Getty Images
Image caption তাঁর প্রতিষ্ঠিত ধর্মীয় আদর্শে উদ্বুদ্ধ হয়েছিলেন সাড়ে চার হাজার ধর্মযাজিকা।

তবে কলকাতার বস্তিবাসীদের নিয়ে তাঁর কাজ তাকে বিশ্বের দরবারে পরিচিত করে তুলেছিল, এবং বিশ্বের মানুষের কাছে তাঁর আদর্শের প্রতীক হয়ে গিয়েছিল তাঁর নীলপাড় সাদা শাড়ি।

মারি মারসেল থেকেকারা তার ছোটবেলায় দেখেছেন কলকাতা শহরে চরম দারিদ্রের চেহারা। তিনি দেখেছেন ফুটপাতে ত্রিপল বা প্লাস্টিক টাঙিয়ে তারই নিচে কীভাবে মানবেতর জীবন কাটাচ্ছে মানুষ।

সেসময় কলকাতা ছিল বিশ্বের দরিদ্র দেশগুলোর অন্যতম।

"এসব জায়গায় দেখা যেত অসুস্থ মানুষ তাদের বমি এবং মূত্রের মধ্যেই পড়ে আছে, তাদের নোংরা কাপড়চোপড়- উকুনের বাস সারা শরীরে। সেখানে মাদার টেরেসা বা তাঁর অনুসারীরা যে এধরনের মানুষকে নিজে হাতে তুলে আনছেন, তাদের পরিষ্কার করে তাদের আশ্রয় দিচ্ছেন- সেটা ছিল তাদের অনেক দয়ামায়ার প্রকাশ," বলছিলেন মারি।

ভারতে মাদার টেরেসার প্রথম কাজের ক্ষেত্র ছিল দার্জিলিং। লরেটো কনভেন্টে প্রথমে শিক্ষিকা ও পরে হেডমিস্ট্রেস হিসাবে কাজ করেন তিনি।

কিন্তু ১৯৪০ এর দশকের শেষ দিকে তিনি কোনো এক কাজে কলকাতা গিয়ে সেখানকার দারিদ্র দেখে ঠিক করেন তাঁর বাকি জীবন তিনি 'হতদরিদ্রের' সেবায় নিয়োজিত করবেন।

বিবিসির একটি তথ্যচিত্রের জন্য দেওয়া সাক্ষাৎকারে বলেন ঐ দারিদ্র দেখার পরই তিনি তাঁর মিশনারিস অফ চ্যারিটি গড়ে তোলার সিদ্ধান্ত নেন।

ছবির কপিরাইট Mother Teresa Centre
Image caption কলকাতায় মাদার টেরেসার মিশনারিস অফ চ্যারিটির শিশু ভবনে কাজ করেছিলেন মারি

১৯৬০এর দশকের মাঝামাঝি ভারতে জনসংখ্যার দ্রুতবৃদ্ধি একটা সমস্যা হয়ে উঠছিল।

কেন্দ্রীয় এবং রাজ্য সরকারগুলো জনসংখ্যার বিস্ফোরণ ঠেকাতে জন্মনিরোধক কর্মসূচি এবং বন্ধ্যাত্বকরণের জন্য জোরেসোরে প্রচারণা চালাচ্ছিল। গর্ভপাত যদিও সেসময় অবৈধ ছিল , কিন্তু মেয়েদের মধ্যে গর্ভপাতের ব্যাপক চল ছিল আর কর্তৃপক্ষও সেসব জেনে না জানার ভান করত।

মারি বলছিলেন, যেসব মহিলা খুবই গরীব ছিলেন এবং যাদের অনেকগুলো সন্তান ছিল- তারা আর বাচ্চা চাইতেন না। ৭-৮ মাসেও এসব মহিলা গর্ভপাত করাতে যেতেন। সরকার সহ কেউ কোনো প্রশ্ন করত না।

"যেসব মহিলা খুব দেরিতে গর্ভপাত করাতেন তাদের ক্ষেত্রে গর্ভপাত ঠিকমত কাজ করত না, তাদের শিশুরা জীবিত ভূমিষ্ঠ হতো- কিন্তু মায়েরা তাদের ফেলে দিত। এছাড়াও যেসব বাবামা খুবই দরিদ্র্র - শিশুকে খাওয়ানোর ক্ষমতা যাদের নেই- তারাও সদ্যোজাত শিশু বা ছোট বাচ্চাকে ফেলে দিত।"

মাদার টেরেসা এইসব শিশুদের জন্য একটি অনাথ আশ্রম তৈরি করেছিলেন এবং তাকে সাহায্য করার জন্য মারির মত স্থানীয় শিশুদের সেখানে কাজ দিতেন।

"মাদার টেরেসার একজন অনুসারী ধর্মযাজিকা আমাদের সঙ্গে এসে কথা বললেন। জিজ্ঞেস করলেন আমাদের শিশুভবনে এসে তোমরা কাজ করবে? সেটা ছিল বাচ্চাদের আশ্রয়ভবন। ১০-১২ বছরের মেয়েরা কিন্তু শিশুদের খুব পছন্দ করে। আমরা সবাই সেখানে খুশি মনে সাহায্য করতে গেলাম।"

"আমরা যখন ডরমেটারি ঘরের মধ্যে ঢুকতাম- খুব অবাক লাগত। সারি সারি ছোট ছোট কটে কত যে শিশু শুয়ে আছে। আমরা একবার ডাস্টবিনে ফেলে দেওয়া একটা বাচ্চাকে দেখেছিলাম। আমার বোন মাদার টেরেসার একজন ধর্মযাজিকার সঙ্গে নিয়মিত গর্ভপাত ক্লিনিকগুলোতে যেত আর বালতিতে ফেলে দেওয়া শিশুদের কুড়িয়ে আনতো। নান-রা বাচ্চাগুলোকে উদ্ধার করতো এবং কাপড়ে মুড়ে তাদের নিয়ে আসতো দেখাশোনা করার জন্য।"

ছবির কপিরাইট Getty Images
Image caption মাদার টেরেসার আশ্রমে একসময় যারা রোগী হিসাবে আশ্রয় পেয়েছিলেন এখন তারা সেখানে নানদের পোশাক নীল পাড় সাদা শাড়ি তৈরি করেন

দরিদ্রদের জন্য মাদার টেরেসার নিবেদিত প্রাণের বিষয়টি মারি খুবই শ্রদ্ধার সঙ্গে দেখতেন, কিন্তু মাদার টেরেসা যে কঠোর নিয়মনীতির উপর জোর দিতেন, তা প্রয়োজন কিনা তা নিয়ে ক্রমশ মারির মনে সন্দেহ তৈরি হতে থাকে।

"ধর্মযাজিকারা বেশিরভাগই জুতো-চটি পরতেন না। এটা আমাকে ভীষণ পীড়া দিত। আমি তখন খুবই ছোট। ওদের জন্য আমার প্রাণ কাঁদত। কলকাতায় গ্রীষ্মকালে রাস্তার পিচ গলে যেত - আর ওই পিচগলা গরম রাস্তায় নান-রা খালি পায়ে ছুটে বেড়াতেন। আমার মনে হতো আর্তের সেবা করতে গিয়ে বেচারা নানদেরও দারিদ্রের চরম পরীক্ষা দিতে হচ্ছে!"

"ওদের পানীয় হিসাবে শুধু পানি ছাড়া আর কিছু খাওয়া নিষেধ ছিল। ভয়ঙ্কর- আমার তখন বয়েস মাত্র ১০- কিন্তু আমার এসব দেখে প্রচণ্ড রাগ হতো। কলকাতার প্রচণ্ড গরমে ঠাণ্ডা এক গ্লাস কমলা লেবুর রস খাওয়ার জন্য আপনাকে অনুমতি নিতে হবে? এ কেমন নিয়ম? এর কি কোনো প্রয়োজন আছে?" বলছিলেন মারি।

ছবির কপিরাইট AFP
Image caption ঢাকার ইসলামপুরে মাদার টেরেসা চ্যারিটির শিশুভবন

মাদার টেরেসার কর্মপদ্ধতি নিয়ে অন্য দেশেও প্রশ্ন উঠছিল। কেউ কেউ মনে করছিলেন হতদরিদ্র এবং মরণোন্মুখ মানুষকে সেবা দেওয়ার জন্য তার প্রয়াস কতটা যুক্তিগ্রাহ্য।

তারা বলছিলেন যারা মৃত্যুর মুখে তাদের চাইতে যারা বেঁচে আছেন - কিন্তু মানবেতরভাবে বেঁচে আছেন, তাদের জন্য আরও কিছু করার উদ্যোগ মাদার টেরেসার নেওয়া উচিত ছিল।

মাদার টেরেসার অবশ্য যুক্তি ছিল, "সমাজে জীবনভর অবাঞ্ছিত এই মানুষগুলোকে জীবনের শেষ মুহূর্তে এটুকু বোঝানো যে, তাদের প্রতি কোথাও ভালবাসা ও মমতা আছে।"

মারি যখন আরও বড় হয়ে ওঠেন তখন তিনি ঝুঁকে পড়েন ক্যাথলিকদের বিশেষ একটি শাখার মতাদর্শের দিকে এবং আগ্রহী হয়ে ওঠেন রাজনীতি চর্চায়।

"এই ধর্মমত আমাকে ভাবতে শিখিয়েছিল কীভাবে পরিবর্তন আনা সম্ভব? শুধু কিছু নির্দেশ দিয়ে বা প্রচারপত্র বিলি করে নয়, সমাজে আসল ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা কীভাবে সম্ভব? আমাদের সবকিছুই সমালোচকের চোখ দিয়ে দেখার - এমনকী চার্চকেও প্রশ্ন করার শিক্ষা দেওয়া হয়েছিল।"

মারি বলছেন মাদার টেরেসা বলতেন কষ্ট পাওয়াটা যিশুখ্রিস্টেরই নির্দেশ। সেই কষ্ট ধারণ করে তা ঈশ্বরের পায়ে নিবেদন করাই তাঁর আদর্শ।

"আমি এই যুক্তি মানতে পারতাম না। আমার মনে হতো কেন আমরা দারিদ্রের বিরুদ্ধে লড়ব না? দারিদ্র না থাকলে তো পৃথিবীর বুকে দরিদ্র মানুষের কষ্টও আর থাকবে না। সমস্যাটার মূলে আমরা আঘাত করছি না কেন?"

ছবির কপিরাইট AFP
Image caption মাদার টেরেসার অনাথ আশ্রম শিশু-ভবন

মারি লেখাপড়া শেষ করার পর তার স্বামী সন্তানদের নিয়ে দক্ষিণ ভারতে চলে যান। মিশনারিজ অফ চ্যারিটির সঙ্গে তার যোগাযোগেরও ইতি ঘটে।

সেখানে মারি সমাজ পরিবর্তনের জন্য লড়াই শুরু করেন। নারী আন্দোলনে সক্রিয় গোষ্ঠিগুলোর সঙ্গে কাজ করেন এবং বিশ্বাসের অনুপ্রেরণা থেকে আদিবাসী সমাজের মানুষদের নিয়ে একটি সমবায় গড়ে তোলেন।

মাদার টেরেসার সঙ্গে তার শেষবার সাক্ষাতকারের কথা মনে আছে। মাদার টেরেসা তখন নোবেল শান্তি পুরস্কার পেয়ে গেছেন এবং বিশ্বের চোখে জীবন্ত কিংবদন্তীতে পরিণত হয়েছেন।

"মাদার টেরেসার সঙ্গে আমার আবার দেখা হয়েছিল বহু বছর পরে, যখন আমার তিন সন্তানকে নিয়ে আমি আমার মায়ের সঙ্গে দেখা করতে কলকাতায় এসেছিলাম। আমি গির্জায় তার ঘরে গেলাম। ওনার তখন অনেক বয়েস হয়ে গেছে- চামড়া কুঁচকে গেছে। আমার মায়ের অনুরোধে আমার বাচ্চাদের তিনি আর্শীবাদ করলেন। মা বললেন- ওহ্ - আপনি জানেন কীনা জানি না- আমার মেয়ে ছোটবেলায় আপনার শিশুভবনে স্বেচ্ছাসেবী হিসাবে কাজ করতে যেত। তখন মাদার টেরেসা - বেশ খানিকটা উদ্ধতভাবে বলেছিলেন - অন্তত সেসময় আমার তেমনটাই মনে হয়েছিল- তিনি বললেন - ও - তখন তো তুমি ছোট ছিলে তাই যেতে। এখন? এখন তুমি কী করো? "

অবসর নেবার ছয় মাস পর মাদার টেরেসা মারা যান। তাঁর শেষকৃত্যে যোগ দেন লক্ষ লক্ষ মানুষ। আলবেনিয়াতে তাঁর জন্ম হলেও তিনি কলকাতার অংশ হয়ে গিয়েছিলেন।

মারি মারসেল থেকাকারা ব্যাঙ্গালোরের বাইরে একটি পাহাড়ী এলাকায় এখন বাস করেন এবং আদিবাসী সম্প্রদায়ের উন্নয়নের জন্য একটি প্রকল্প চালান।

সম্পর্কিত বিষয়