এ সপ্তাহের সাক্ষাৎকার
আপনার ডিভাইস মিডিয়া প্লেব্যাক সমর্থন করে না

এ সপ্তাহের সাক্ষাৎকার: ডা: হালিমা আলম

  • ২৯ মার্চ ২০১৭

স্কুলের ছাত্রী থাকা অবস্থাতেই ভাষা আন্দোলনের মিছিলে গিয়ে কর্তৃপক্ষের রোষানলে পড়েছিলেন হালিমা আলম। ৭১ সালে লন্ডনে বাংলাদেশের স্বাধীনতার পক্ষে জনমত গড়তেও অগ্রণী ভূমিকা রেখেছেন। যুক্তরাজ্যে চিকিৎসক হিসেবে তাঁর দীর্ঘ কর্মজীবনে নানা অম্ল-মধুর অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হয়েছেন। বিবিসি বাংলার মোয়াজ্জেম হোসেনকে দেয়া সাক্ষাৎকারে হালিমা আলম বলেছেন তার জীবনের সেসব কাহিনি:

১৯৪৮ সাল । যশোরের তারাপ্রসন্ন হাইস্কুলের একদল ছাত্রী মিছিল করে বেরিয়ে গেছে ক্লাস থেকে। রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই শ্লোগান দিয়ে। এ নিয়ে পুরো শহর তোলপাড়। পরদিনই স্কুলে ঘটনা তদন্ত করতে এসেছেন একজন স্কুল ইন্সপেক্টর। স্কুলের প্রধান শিক্ষকের মুখ শুকিয়ে গেছে। সবাই ভয়ে তটস্থ।

যে মিছিল নিয়ে এত ঘটনা, তার নেতৃত্বে ছিলেন হালিমা বেগম আলম। তখন স্কুলের নবম শ্রেনীর ছাত্রী।

"ঢাকায় ভাষা আন্দোলন হচ্ছে, বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে মিছিল মিটিং হচ্ছে, এসব খবর আমরা পাচ্ছি। তখন যশোরেও ভাষা আন্দোলন শুরু হয়েছে মশিউর রহমান, হামিদা রহমান, শামসুর রহমান এদের নেতৃত্বে। তারা একদিন মিছিল করে আসলেন আমাদের স্কুলে। তারা বললেন, তোমরা মিছিল করে বেরিয়ে আসো, আমরা ভাষা আন্দোলনে যাব। তখন আমি ক্লাসে ক্লাসে গিয়ে বললাম, চলো, আমাদের আন্দোলনে যেতে হবে। তখন আমরা মিছিলে যোগ দিলাম। মিছিল করে আমরা গিয়েছিলাম নিয়াজ মোহাম্মদ পার্কে। কালেক্টরেট অফিসের সামনে।"

পরের দিন তদন্তে আসা স্কুল ইন্সপেক্টর সবাইকে লাইনে দাঁড় করিয়ে জিজ্ঞেস করতে লাগলেন, কারা কারা যোগ দিয়েছিল সেই মিছিলে। প্রত্যেকেই মিছিলে যাওয়ার কথা অস্বীকার করছিল। কিন্তু হালিমা বেগমকে বিপদে ফেলে দিলেন তাঁর এক সহপাঠী।

"আমার বাঁ পাশে দাঁড়িয়ে ছিল কনক প্রভা দাস নামে একটি মেয়ে। ওর বাবা ছিলেন এসডিপিও। ও ঘাবড়ে গিয়ে বললো, আমি নিজে থেকে যাইনি, ও আমাকে নিয়ে গিয়েছে। এই বলে আমাকে দেখিয়ে দিল।"

হালিমা স্বীকার করলেন, তিনি মিছিলে গিয়েছিলেন। তবে দৃঢ়তার সঙ্গে বললেন, না বুঝে নয়, তিনি জেনে শুনেই মিছিলে যোগ দিয়েছিলেন বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে।

"পুরো স্কুল তখন তোলপাড়। এবার কি হবে। স্কুলের তো গ্রান্ট কাটা যাবে। আমার বৃত্তি বাতিল হবে। পরে দেখা গেল কিছুই হয়নি। আমি বরং বৃত্তি পেয়েছি।"

হালিমা বেগম আলমের জন্ম কোলকাতায়, সারা জীবন চিকিৎসক হিসেবে কাজ করেছেন, এখন লন্ডনে অবসর জীবন কাটাচ্ছেন।

তাঁর বাবা ছিলেন ডাক্তার, মা আনজুমান আরা ছিলেন সেই যুগের কৃতি ছাত্রী। পড়াশোনা করেছেন কোলকাতার সেন্ট মার্গারেট স্কুলে। চিকিৎসক হওয়ার স্বপ্নটা পেয়েছেন বাবার কাছ থেকে।

১৯৪৭ সালের দেশ ভাগের পর তাঁদের কোলকাতা ছেড়ে চলে আসতে হয় যশোরে। সেখানে তারাপ্রসন্ন স্কুলে ভর্তি হন।

স্কুলে যে ভাষা আন্দোলনে জড়িয়ে গিয়েছিলেন, তাঁর চূড়ান্ত পর্বটিও সরাসরি দেখার সুযোগ হয়েছিল ১৯৫১ সালে ঢাকায় এসে মেডিক্যাল স্কুলে ভর্তি হওয়ার পর।

২১শে ফেব্রুয়ারী যখন গুলি চললো, তার পরদিন থেকেই আমরা আন্দোলনে নেমে পড়লাম। আমাদের একজন শিক্ষকের ভাই গুলিতে মারা গিয়েছিলেন। আমাদের তখন মনে হয়েছিল যেন আমাদের ভাই মারা গেছেন। এ থেকে দূরে থাকার কোন সুযোগ ছিল না।"

হালিমা বেগম আলম ষাটের দশকের শুরুতে চলে এসেছিলেন লন্ডনে উচ্চশিক্ষার্থে, আর দেশে ফিরে যাওয়া হয়নি। যুক্তরাজ্যে প্রথম যে বাংলাদেশিরা পেশাদার চিকিৎসক হিসেবে কাজ শুরু করেন, তিনি তাদের একজন।

১৯৭১ সালে যখন বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ শুরু হয়, তখন তিনি এবং তাঁর স্বামী ডা: শামসুল আলম সক্রিয়ভাবে জড়িয়ে পড়েন বাংলাদেশের পক্ষে জনমত গঠন এবং তহবিল সংগ্রহে।

ব্রিটেনে তখন কাজ করেন বহু বাঙালি চিকিৎসক। ঢাকায় গণহত্যার মর্মান্তিক খবরের ধাক্কা সামলে উঠার পর তাদের মনে হলো, কিছু একটা করতেই হবে।

সব ডাক্তারদের মিলে গঠন করা হলো একটি সংগঠন। সিদ্ধান্ত নেয়া হলো, লন্ডন থেকে তারা ঔষধ এবং চিকিৎসা সরঞ্জাম সংগ্রহ করে পাঠাবেন যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধাদের চিকিৎসার জন্য।

'আমি তখন সার্জন হিসেবে কাজ করি। নার্সদের বললাম তারা যেসব যন্ত্রপাতি ফেলে দেয়, সেগুলো যেন আমাদের দেয়, যাতে সেগুলো আমরা মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য পাঠাতে পারি। একই ভাবে বিভিন্ন ফার্মেসীতে গিয়ে সংগ্রহ করতাম মেয়াদোত্তীর্ণ ঔষধ। কিন্তু অনেকে ভালো ভালো অপারেশনের সাজ-সরঞ্জাম, মেয়াদ ফুরিয়ে যায়নি এমন ঔষধও আমাদের দিতো। এদের কাছে আমাদের অনেক কৃতজ্ঞতা।"

যুক্তরাজ্যে চিকিৎসক হিসেবে কাজ করতে গিয়ে অনেক অম্ল-মধুর অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হয়েছেন। শুরুর দিকের একটা ঘটনার কথা ভুলতে পারেন না, যেটি তাকে এই পেশার প্রতি অঙ্গীকার এবং শ্রদ্ধাবোধ বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছিল।

"তখন আমি বার্মিংহ্যামের এক হাসপাতালে কাজ করি। একটা রোগী আসলো হাসপাতালে, রোগীর কোন পালস ছিল না।"

"পরদিন পুরো হাসপাতালে মিটিং হলো। এই রোগীকে বাঁচানো যেত কিনা। সেটার তদন্ত। সবাই আমরা নিশ্টিত হলাম, পেশেন্ট এমন সময় এসেছিল, আর কিছু করার ছিল না।"

"আমি যে দেশ থেকে এসেছি, সেখানে প্রতিদিন হাসপাতালে কত রোগী আসে, গত রোগীকে আমরা মরে যেতে দেখেছি। কোন জবাবদিহিতা নেই। কোন কোয়েশ্চেন নেই। মারা গেছে তো কি হয়েছে। কিন্তু এখানে দেখছি, একটা পেশেন্টের জন্য কত মায়া। জীবনের যে মূল্য এখানে, এটা দেখে আমি খুব নাড়া খেয়েছিলাম।"

লন্ডনের এক হাসপাতালে আরেকটি ঘটনার কথা তাঁর খুব মনে পড়ে।

"তখন আমি এক জুনিয়র ডাক্তার। হাসপাতালের কনসালট্যান্ট চিকিৎসক অপারেশনের রোগীর জন্য আমাকে বলে দিয়ে গেছেন কি কি ঔষধ দিতে হবে। আমি ফার্মেসীতে যাওয়ার পর আমাকে বলা হলো, একটা ঔষধ নেই। তখন আমি আর এই ঔষধটা রোগীকে দেই নি। এটির গুরুত্বটা আমি বুঝতে পারি নি।"

প্রতিদিন রাত দশটায় কনস্যালট্যন্ট ডাক্তার ওয়ার্ড ফোন করতেন। উনি জিজ্ঞেস করতেন ঔষধ দিয়েছি কিনা। আমি জানালাম, না ঔষধটা পাওয়া যায়নি।

উনি তখন বেশ গম্ভীর গলায় বললেন, তুমি নতুন, কিন্তু এটাই তোমার প্রথম এবং শেষ ওয়ার্নিং। প্রেসক্রিপশনে লেখা ঔষধটা যদি হাসপাতালের ফার্মেসীতে না থাকে, তখন অন্য হাসপাতালের ফার্মেসীতে যাবে। যদি তাদের কাছেও না থাকে, তখন সেন্ট্রাল ল্যাবরেটরিতে খোঁজ নেবে। যদি তাদের কাছেও না থাকে, অন্য কোন দেশ থেকে আনানো যাবে কিনা, তার খোঁজ নেবে। প্রেসক্রিপশনে যখন কোন ঔষধ দেয়া হবে, সেটা অবশ্যই রোগীকে দিতে হবে।"

"তখন আমি ভাবলাম, চিকিৎসক হিসেবে এটাই তো আমার স্বর্গ। এত ক্ষমতা আমাকে দেয়া হয়েছে? কী সাংঘাতিক একটা স্বাধীনতা। আমি ভাবলাম এই দেশ ছেড়ে আমি আর যাব না।"

সম্পর্কিত বিষয়