স্কুল পাঠ্য বইতে ভুল থাকায় ৬ কর্মকর্তার শাস্তি

  • ৫ এপ্রিল ২০১৭
ছবির কপিরাইট FARJANA K. GODHULY
Image caption পাঠ্য বই হাতে ছাত্র ছাত্রীরা (ফাইল ফটো)

বাংলাদেশে স্কুলের বইতে ভুল থাকার দায়ে জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের ঊর্ধ্বতন ছয় কর্মকর্তাকে সেখান থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে।

শিক্ষা মন্ত্রণালয় বলছে 'দায়ী ব্যক্তিদের' দেশের বিভিন্ন সরকারী কলেজে বদলী করা হয়।

চলতি শিক্ষাবর্ষে স্কুল পর্যায়ের পাঠ্য বই নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক সৃষ্টি হয়। এ বিতর্কের দু'টো দিক আছে। প্রথমত: বইতে ভুল এবং দ্বিতীয়ত: এমন কিছু ধর্মীয় বিষয় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে যেটি শুধু মুসলমানদের জন্যই প্রযোজ্য।

পাঠ্য বইতে ভুল কিভাবে হলো সে বিষয়টি খতিয়ে দেখার জন্য শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব রুহী রহমানের নেতৃত্বে কমিটি গঠন করা হয়েছিল। গত ফেব্রুয়ারি মাসে সে কমিটি ২৮০ পৃষ্ঠার প্রতিবেদন জমা দেয়। সে প্রতিবেদনের ভিত্তিতে পাঠ্য পুস্তক ও পাঠ্যক্রম বোর্ডের ছয় কর্মকর্তাকে বদলী করা হয়।

শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা বিবিসি বাংলাকে জানিয়েছেন, বই সংশোধনের ক্ষেত্রে কিছু কর্মকর্তা হয় যথেষ্ট মনোযোগ দেননি নতুবা তারা অজ্ঞতার পরিচয় দিয়েছেন।

"দেখা গেছে অর্থনীতির লোক বাংলার বই পরিমার্জনের সাথে জড়িত ছিলেন। আবার ইসলামের ইতিহাসের শিক্ষক ভিন্ন আরেকটি বিষয়ের বই পরিমার্জনের সাথে জড়িত ছিলেন," বলছিলেন সে কর্মকর্তা।

তিনি বলেন বইগুলো নতুনভাবে প্রণয়ন করা হয়নি। এগুলো কয়েক বছর আগেই প্রকাশিত হয়েছে। চলতি বছর কিছু কিছু জায়গায় সংশোধন, পরিমার্জন কিংবা পরিবর্ধন করা হয়েছে।

তদন্ত কমিটি বলছে এ কাজ করার ক্ষেত্রে জাতীয় পাঠ্যক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডে পেশাগত দক্ষতার অভাব রয়েছে।

কিন্তু যে বিষয়টি নিয়ে বেশি বিতর্ক তৈরি হয়েছে তা হলো ইসলামপন্থী সংগঠন হেফাজতে ইসলামের পছন্দ অনুযায়ী পাঠ্য পুস্তকে বিভিন্ন বিষয় সংযোজন এবং বিয়োজন করা করা হয়েছে।

Image caption বানান ও তথ্যে ভুল থকার পাশাপাশি ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে পাঠ বইতে পরিবর্তনের অভিযোগ উঠেছে

এ বিষয়টি নিয়ে একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি একটি নাগরিক কমিশন গঠন করেছিল। তারা সেখানে তুলে ধরেছে যে চলতি বছরের পাঠ্য বইতে মৌলবাদ ও সাম্প্রদায়িক মনোবৃত্তির অনুপ্রবেশ ঘটানো হয়েছে।

শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের তদন্ত কমিটি কার্য পরিধিতে সে বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত ছিল না । কর্মকর্তারা বলছেন এ কমিটি গঠন করা হয়েছিল শুধু ভুল কিভাবে হয়েছে সেটি চিহ্নিত করার জন্য। বিষয়বস্তুর ক্ষেত্রে যেসব সংযোজন এবং বিয়োজন হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে সে বিষয়টি কমিটির কাজের অন্তর্ভুক্ত ছিল না।

২০১৬ সালে হেফাজতে ইসলাম দাবী তুলে ধরেছিল যে পাঠ্যপুস্তকে স্কুল পাঠ্য-পুস্তকে ইসলামী ভাবধারা বাদ দিয়ে 'নাস্তিক্যবাদ এবং হিন্দু তত্ব পড়ানো হচ্ছে।'

ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি যে দাবী তুলে ধরেছে সেটিকে শিক্ষা মন্ত্রণালয় কোন গুরুত্ব দেয়নি বলেই মনে হচ্ছে।

সংগঠনের অন্যতম শীর্ষ নেতা শাহরিয়ার কবির বলেন, " বানান ভুলের জন্য কাউকে না কাউকে শাস্তি পেতে হবে। সেটা ঠিক আছে। কিন্তু এর চেয়ে বড় বিষয় হচ্ছে গোটা জাতীর মনোজগতে মৌলবাদের আধিপত্য বিস্তারের যে প্রবণতা এটাকে আমরা ভয়ংকর অপরাধ বলে মনে করি।"

জাতীয় পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের বই প্রণয়নের সাথে বিভিন্ন সময় বিশেষজ্ঞ হিসেবে কাজ করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা গবেষণা ইন্সটিটিউটের অধ্যাপক মজিবুর রহমান। তিনি বলেন, অনেক সময় বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ পাঠ্য বইতে পুরোপুরি প্রতিফলিত হয় না।

"এনসিটিবি'র (জাতীয় পাঠ্যপুস্তক বোর্ড) লোকজন আমাদের সাপোর্ট দেয়। কিন্তু শেষ পর্যন্ত দেখা যায় যে সরকারের দিক নির্দেশনা অনুযায়ী সংযোজন এবং বিয়োজন হয়ে থাকে। তবে মাইনর কিছু ভুল - প্রচ্ছদের ভুল, বানান ভুল সেটা ভিন্ন জিনিস," বলছিলেন অধ্যাপক রহমান।

কর্মকর্তারা বলছেন, পাঠ্য বইতে কোন বিষয় যোগ করা হবে আর কোন বিষয় বাদ দেয়া হবে - সেক্ষেত্রে মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত। পাঠ্য বইতে 'মৌলবাদ ও সাম্প্রদায়িকীকরণের' যে অভিযোগ উঠেছে সে বিষয়ে শুধু শিক্ষামন্ত্রী ব্যাখ্যা দিতে পারেন।

কিন্তু বারবার চেষ্টার পরেও শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদের কোন মন্তব্য পাওয়া যায়নি।