সমুদ্রের পানি থেকে লবণ আলাদা করার ছাঁকনি
আপনার ডিভাইস মিডিয়া প্লেব্যাক সমর্থন করে না

সমুদ্রের পানি থেকে লবণ আলাদা করার ছাঁকনি

যুক্তরাজ্য-ভিত্তিক একদল বিজ্ঞানী এমনটি ছাঁকনি তৈরি করেছেন যা দিয়ে সমুদ্রের পানি থেকে লবণ আলাদা করে ফেলা সম্ভব।

গ্রাফিন দিয়ে তৈরি এই ছাঁকনি ব্যবহার করে সমুদ্রের লবণাক্ত পানিকে মিষ্টি পানিতে পরিণত করা যাবে।

বলা হচ্ছে, বিজ্ঞানের এই আবিষ্কার একটি তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা কারণ এই ছাঁকনিটি সারাবিশ্বে কোটি কোটি মানুষের পরিষ্কার খাবার পানির সঙ্কট দূর করতে কিছুটা হলেও ভূমিকা রাখবে।

ধারণা করা হয়, পৃথিবীতে সত্তর কোটির মতো মানুষের কাছে পান করার মতো নেই নিরাপদ পানি। জাতিসংঘ বলছে, ২০২৫ সালের মধ্যে এই মানুষের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়াতে পারে ১২০ কোটিরও বেশি।

এই গবেষণায় নেতৃত্বদানকারী বিজ্ঞানী রাহুল নায়ার বলেছেন, সারা বিশ্বে যে কোটি কোটি মানুষের কাছে খাবার পানি নেই, এই প্রযুক্তি উদ্ভাবনের ফলে তাদের সামনে সেই সুপেয় পানি পৌঁছে দেওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হলো।

"আমরা আশ্বস্ত করতে পারি যে আর কয়েক বছরের মধ্যেই এটি সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছে যাবে," বলেন তিনি।

এই ছাঁকনিটি তৈরিতে ব্যবহার করা হয়েছে গ্রাফিন অক্সাইড। বলা হচ্ছে, পানি থেকে লবণকে আলাদা করার জন্যে এই উপকরণটি অনেক বেশি কার্যকর।

ছবির কপিরাইট EPA
Image caption বিজ্ঞানের এই আবিষ্কার একটি তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা কারণ এই ছাঁকনিটি সারাবিশ্বে কোটি কোটি মানুষের পরিষ্কার খাবার পানির সঙ্কট দূর করতে কিছুটা হলেও ভূমিকা রাখবে।

ম্যানচেস্টার ইউনিভার্সিটির একদল গবেষক এই ছাঁকনিটি আবিষ্কার করেছেন। তাদের নেতৃত্ব দিয়েছেন বিজ্ঞানী ড. রাহুল নায়ার।

তিনি দেখিয়েছেন, অন্য একটি রাসায়নিক পদার্থ থেকে তৈরি গ্রাফিন অক্সাইড ব্যবহার করে তারা সমুদ্রের পানি থেকে লবণকে আলাদা করতে সফল হয়েছেন।

বিবিসির বিজ্ঞান বিষয়ক সংবাদদাতা পল্লব ঘোষ বলেছেন, আর সব ছাঁকনির মতোই এই ছাঁকনিটি। গ্রাফিনের তৈরি এই ছাঁকনিটিতে আছে ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র ছিদ্র যা দিয়ে পানি বেরিয়ে যেতে পারে। কিন্তু তার গায়ে লবণ আটকে থাকে।

বিজ্ঞানীদের এই দলটিই ২০০৪ সালে প্রথম গ্রাফিনকে আলাদা করতে সক্ষম হয়।

এই গ্রাফিনে আছে কার্বন এটমের একটি স্তর এবং এগুলো সাজানো আছে ষড়ভুজের আকৃতিতে। এর আছে অস্বাভাবিক কিছু বৈশিষ্ট্য। যেমন প্রসারিত করা যায় এরকম শক্তি এবং এটি বিদ্যুৎ পরিবাহী।

বলা হচ্ছে, এটি অলৌকিক এক বস্তু এবং ভবিষ্যতের পৃথিবীতে এই গ্রাফিন হয়ে উঠতে পারে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি উপাদান।

তবে সমস্যা হচ্ছে, এক স্তরের এই গ্রাফিন বর্তমান পদ্ধতিতে প্রচুর পরিমাণে উৎপাদন করা কঠিন। এতে খরচও অনেক বেশি। কিন্তু বিজ্ঞানী ড. নায়ার এখন বলছেন, ল্যাবরেটরিতে খুব সহজে অক্সিডেশনের মাধ্যমে গ্রাফিন অক্সাইড উৎপাদন করা সম্ভব।

ছবির কপিরাইট PHOTOSTOCK-ISRAEL/SCIENCE PHOTO LIBRARY
Image caption এই ছাঁকনিটি বাস্তবেও ল্যাবরেটরির মতোই লবণকে পানি থেকে আলাদা করতে সক্ষম হবে কীনা সেটাই সবচে বড়ো প্রশ্ন

পল্লব ঘোষ বলছেন, গ্রাফিনের ওপর গবেষণায় নেতৃস্থানীয় ভূমিকা পালন করছে ম্যানচেস্টারে ন্যাশনাল গ্রাফিন ইন্সটিটিউটে। এখানেই প্রথম এই উপাদানটিকে আলাদা করা হয়েছিলো। এটিকে ব্যবহার করে প্রযুক্তি উদ্ভাবন করে এখানকার বিজ্ঞানীরাই নোবেল পুরস্কার পেয়েছিলেন ২০১০ সালে। আর এখন এই গবেষণায় তারা আরো বড়ো ধরনের অগ্রগতি ঘটালেন।

আগে এর একটি সমস্যা ছিলো। ঠিকমতো কাজ করতো না গ্রাফিনের এই ছাঁকনি। কারণ একটা সময়ে এসে গ্রাফিন দুর্বল হয়ে পড়তো আর এর গায়ের ছিদ্রগুলো বড়ো হয়ে যেতো।

কিন্তু বিজ্ঞানীরা এখন এর গায়ে কিছু রাসায়নিক মেখে দিয়েছেন যার ফলে ছিদ্রগুলি বড় হতে পারে না।

সমুদ্রের লবণাক্ত পানিকে খাবারের মিষ্টি পানিতে পরিণত করার এই প্রযুক্তি নিয়ে শুনুন বাংলাদেশে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সমুদ্র বিজ্ঞানী প্রফেসর সায়েদুর রহমান চৌধুরীর সাক্ষাৎকার।

অডিওটি শুনতে হলে উপরের লিঙ্কে ক্লিক করুন।

বিজ্ঞানীরা বলছেন, প্রচলিত পদ্ধতিতে সমুদ্রের পানিকে লবণমুক্ত করা খুবই ব্যয়সাপেক্ষ। কিন্তু গ্রাফিনের ছাঁকনিটি হবে সহজলভ্য এবং সস্তা।

কিন্তু এই ছাঁকনিটি বাস্তবেও ল্যাবরেটরির মতোই লবণকে পানি থেকে আলাদা করতে সক্ষম হবে কীনা সেটাই সবচে বড়ো প্রশ্ন।

কিভাবে তৈরি হয় স্মৃতি

মানুষের মস্তিষ্কে কিভাবে কোন কিছুর স্মৃতি তৈরি হয় এবং সেই স্মৃতি কিভাবে সংরক্ষিত থাকে সে বিষয়ে বিজ্ঞানীরা বিস্ময়কর কিছু নতুন তথ্য আবিষ্কার করেছেন।

বিজ্ঞানীরা দেখার চেষ্টা করেছেন, আসলেই মাথার ভেতরে কি ঘটে এবং তারা যা জানতে পেরেছেন তাতে তারা নিজেরাই বিস্মিত হয়েছেন।

যুক্তরাষ্ট্র ও জাপানি বিজ্ঞানীদের একটি দল দেখেছেন, আমাদের মস্তিষ্ক একই সাথে একটি ঘটনার দুটো স্মৃতি তৈরি করে। তার একটি এখনকার জন্যে আর অন্যটি সারা জীবনের জন্যে।

ছবির কপিরাইট F WALSH
Image caption হিপোক্যাম্পাস হচ্ছে স্বল্পমেয়াদী স্মৃতির জন্যে আর দীর্ঘমেয়াদী স্মৃতি সংরক্ষিত থাকে কর্টেক্সে।

আগে ধারণা করা হতো, সব স্মৃতিই শুরু হয় স্বল্পমেয়াদী স্মৃতি হিসেবে। তারপর সেগুলো ধীরে ধীরে পরিণত হয় দীর্ঘ মেয়াদী স্মৃতিতে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নতুন এই আবিষ্কার বিস্ময়কর। তবে সুন্দর এবং বিশ্বাসযোগ্য।

আমাদের প্রাত্যহিক জীবনে যেসব অভিজ্ঞতা হয় সেগুলো মনে রাখতে খুবই জোরালো ভূমিকা রাখে মস্তিষ্কের দুটো অংশই। হিপোক্যাম্পাস হচ্ছে স্বল্পমেয়াদী স্মৃতির জন্যে আর দীর্ঘমেয়াদী স্মৃতি সংরক্ষিত থাকে কর্টেক্সে।

১৯৫০ এর দশকে হেনরি মোলাইসন কেসের পর এই ধারণাটি বিখ্যাত হয়ে উঠেছিলো।

অপারেশনের সময় তার মস্তিষ্কের হিপোক্যাম্পাস অংশটি নষ্ট হয়ে গিয়েছিলো। ফলে তার আর নতুন স্মৃতি তৈরি হতো না। কিন্তু অপারেশনের আগে যেসব স্মৃতি ছিলো সেগুলো রয়ে গিয়েছিলো।

স্মৃতি সম্পর্কে বর্তমান ধারণা হচ্ছে- প্রথমে এটি তৈরি হয় হিপোক্যাম্পাসে। পরে সেটি স্থানান্তরিত হয় কর্টেক্সে যেখানে এটি সংরক্ষিত হয় দীর্ঘ সময়ের জন্যে।

কিন্তু রিকেন- এমআইটি সেন্টার ফর নিউরাল সার্কিট জেনেটিক্সের একদল বিজ্ঞানী বলছেন, বিষয়টি ঠিক এরকম নয়।

ইঁদুরের ওপর গবেষণা চালিয়ে বিজ্ঞানীরা এই সিদ্ধান্তে পৌঁছেছেন। ধারণা করা হচ্ছে, মানুষের মস্তিষ্কেও বিষয়টি ঠিক একইভাবে কাজ করে।

ইঁদুরের মস্তিষ্কে নির্দিষ্ট কিছু স্মৃতির ওপর বিজ্ঞানীরা নজর রেখেছেন।

মস্তিষ্কের ভেতরে একে অপরের সাথে যুক্ত কিছু কোষে এসব স্মৃতি গুচ্ছ গুচ্ছভাবে তৈরি।

তারপর বিজ্ঞানীরা আলোক রশ্মির সাহায্যে মস্তিষ্কের একেকটি নিউরনের কাজ নিয়ন্ত্রণ করেছেন।

এভাবে তারা স্মৃতিকে কখনো জাগিয়ে তুলেছেন আবার কখনও ঘুম পাড়িয়ে দিয়েছেন।

তাদের গবেষণার ফলাফলে দেখা গেছে, স্মৃতি একই সাথে হিপোক্যাম্পাস এবং কর্টেক্স - এই দুটো অংশেই তৈরি হচ্ছে।

ছবির কপিরাইট Getty Images
Image caption ইঁদুরের ওপর গবেষণা চালিয়ে বিজ্ঞানীরা এই সিদ্ধান্তে পৌঁছেছেন

এই গবেষণা প্রতিষ্ঠানের পরিচালক প্রফেসর সুসুমু তোনেগাওয়া বলেছেন, এই আবিষ্কার বিস্ময়কর। এটি আগের বহু দশক ধরে চলে আসা জনপ্রিয় ধারণার বিপরীত।

কারণ বিজ্ঞানীরা দেখেছেন, স্মৃতি তৈরি হওয়ার পর প্রথম কয়েকদিন ইঁদুর তার মস্তিষ্কের কর্টেক্সে সংরক্ষিত দীর্ঘমেয়াদী স্মৃতিকে ব্যবহার করেনি। এছাড়াও, হিপোক্যাম্পাসে স্বল্পমেয়াদী স্মৃতি বন্ধ করে দেওয়ার পর দেখা গেছে তারা তাদের তাৎক্ষণিক স্মৃতি মনে করতে পারেনি।

বিজ্ঞানীরা বলছেন, স্মৃতি কিভাবে গঠিত হয় ও সংরক্ষিত থাকে সেটা বুঝতে পারলে মস্তিষ্কের রোগের চিকিৎসায় সেটা বড়ো রকমের ভূমিকা রাখতে পারে।

বিজ্ঞানের আসর পরিবেশন করেছেন মিজানুর রহমান খান।