ঢাকার চারুকলার ক্যান্টিনের খাবারে 'গরুর মাংস দেয়ার অভিযোগে' ভাংচুর, তদন্তের নির্দেশ

Image caption চারুকলা ইনস্টিটিউটে মঙ্গল শোভাযাত্রার আগে শুরু হয় গরুর মাংসের খাবার নিয়ে এই ঘটনা।

ঢাকার চারুকলা ইন্সটিটিউটের ক্যান্টিনে 'না জানিয়ে হিন্দু ছাত্রদের গরুর মাংস খাওয়ানোর' এক অভিযোগকে কেন্দ্র করে ভাঙচুরের ঘটনার পর এর তদন্ত করা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর। এ নিয়ে সামাজিক মাধ্যমে অনেকেই ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন ।

বাংলাদেশে নববর্ষের প্রথম দিনটিতে চারুকলা ইন্সটিটিউটে মঙ্গল শোভাযাত্রা শুরু হতে তখনো ১০/১৫ মিনিট সময় বাকি। চারুকলার বৈশাখ উদযাপন কমিটির সদস্যরা এবং অন্যান্য কর্মীরা 'চারুকলার পুকুরপাড়' নামে পরিচিত জায়গাটিতে অবস্থিত ক্যান্টিন থেকে খাবার খাওয়ার কিছুক্ষণের মধ্যেই সেখানে শোরগোল শুরু হয়।

অভিযোগ তোলা হয় "তেহারিতে গরুর মাংস দেয়া হয়েছে এবং না জেনে হিন্দু শিক্ষার্থীরা তা খেয়েছে"। এরপর ক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীরা সেখানে ভাংচুরও করেন, এমনটাই জানান শুক্রবারের ওই ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শীরা।

ওই ক্যান্টিনটিতে বিভিন্ন ধর্মের শিক্ষার্থীরা খাবার খেয়ে থাকে বলে ঐতিহ্যগতভাবে গরুর মাংস রান্না করা হয় না বলে জানাচ্ছেন ইন্সটিটিউটের শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা।

চারুকলায় প্রতি বছর পহেলা বৈশাখ উদযাপনে কমিটি গঠন করা হয়। এবছরের কমিটির সমন্বয়ক সাগর হোসেন সোহাগ বলেন, "২৫/২৬ দিন ধরে মঙ্গল শোভাযাত্রার প্রস্তুতির কাজ চলছিল। শোভাযাত্রার জন্য কখনও খাবারের ব্যবস্থা করা হয়না। তাই এমনি নাশতা করি আমরা। ডিন স্যারও ছিলেন।"

"যেহেতু অর্ডার ছিলনা তাই যা রান্না করা ছিল সেটাই খাওয়া হল। এরপর একদল বলে উঠলো: আমাদের গরুর মাংস খাওয়ানো হল" - বলেন সাগর হোসেন সোহাগ।

'ইচ্ছাকৃত ঘটনা নয়'

সাগর হোসেন সোহাগ বলেন, "ইচ্ছে করে হিন্দু ছাত্রদের গো-মাংস খাওয়ানোর অভিযোগ ভুল।"

"এটা একান্তই ক্যান্টিন মালিকের ব্যাপার। আমাদের এ ধরনের কোনও অর্ডার-ই ছিলনা। শোভাযাত্রার ঢাকী এবং শ্রমিকদের জন্য খিচুড়ির অর্ডার দিয়েছিলাম আমরা" - বলেন তিনি।

এ বিষয়ে কথা বলার জন্য ডিন নিসার হোসেনের সাথে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে তার ফোন বন্ধ পাওয়া যায়।

Image caption চারুকলার মঙ্গল শোভাযাত্রা

তদন্ত করতে বলা হয়েছে : বললেন ঢাবি প্রক্টর

পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর এম আমজাদ আলীর সাথে যোগাযোগ করা হলে বিবিসি বাংলাকে তিনি বলেন, "এ বিষয়ে সবচেয়ে ভালো বলতে পারবেন ডিন। তবে আমি তাদের সাথে (শিক্ষার্থী ও শিক্ষক) বসেছিলাম সমাধানের জন্য। আলোচনা করে মনে হয়েছে, সেখানে ভুল বোঝাবুঝি হয়েছে।"

"চারুকলার ক্যান্টিনে সাধারণত গরুর মাংস পাক করা হয়না। আর তেহারি গরু দিয়ে করা হয়না, করা হয় মুরগি দিয়ে" - বলেন তিনি।

প্রক্টর মি. আলী বলেন "এটা কেন করা হল এবং কারা দায়ী সে বিষয়ে তদন্ত করে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার দরকার বলে আমি ডিনকেও বলেছি"।

এর কারণ কি হতে পারে - জানতে চাইলে তিনি বলেন, "এটা বিভিন্নভাবে চিন্তা করা যায়। এটা ক্যান্টিন মালিকের ইচ্ছাকৃত নাকি মঙ্গল শোভাযাত্রা নিয়ে যাদের আপত্তি রয়েছে তারাই করেছে" সেগুলো খতিয়ে দেখতে হবে বলে তিনি উল্লেখ করেন।

আরো পড়ুন: 'পাল্টা পরমাণু হামলা চালাতে প্রস্তুত' উত্তর কোরিয়া

ভারতে স্কুলের বইয়ে 'নারীদেহের সেরা অনুপাত' : অনলাইনে হৈচৈ

আমেরিকার এই 'মাদার অব অল বোম্বস' কতটা শক্তিশালী?

উত্তর কোরিয়া ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি নিয়ে উদ্বেগ কি কারণে?

আর এ ঘটনার পর থেকে সামাজিক মাধ্যমে এ নিয়ে শুরু হয় লেখা-লেখি ও বিষোদগার। অনেকের বক্তব্য, জোর করে হিন্দু ছাত্রদের গরুর মাংস খাওয়ানো হয়েছে।

বাকি বিল্লাহ তার ফেসবুক ওয়ালে লেখেন, "বৈশাখের বিশেষ উপলক্ষে চারুকলার ক্যান্টিনে তেহারী রান্না হলে সেটা মোটেও অন্যায় নয়, অন্যায় করেছে তারা যারা নিজেদের হীন স্বার্থে তেহারী হিন্দু কাউকে খাইয়েছে। আবার সারা বছর চারুকলার ক্যান্টিনে গরুর মাংস রান্না না হওয়াও মোটেও অন্যায় কিছু না। সাধারণত এগুলো পরিস্থিতির চাহিদা অনুযায়ীই করা হয়। কিন্তু সাম্প্রদায়িক কুষ্ঠরোগে আক্রান্ত প্রাণীগুলোকে আপনি এর কোনোটিই বোঝাতে পারবেন না। ওরা শুধু চান্স খুঁজবে। কোনো একটা ছুতো পেলেই ওরা তাদের পচা গলা শরীর মন উগরে দেবে"।

দীপক সুমন রিখেছেন, "ঢাবি (ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়) চারুকলার ক্যান্টিনের ঘটনা পরিকল্পিত?"

ক্ষমতাসীন দলের ছাত্র সংগঠন কর্মীদের ক্যান্টিনে টাকা বাকি আছে আর সেজন্যই এ কান্ড কী? এমন কমেন্টও রয়েছে ফেসবুকে।

সামাজিক মাধ্যমে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের বিভিন্ন গ্রুপ থেকেও নানা মন্তব্য আসছে।

এ ঘটনায় বিভিন্ন ছাত্র সংগঠনের কর্মীরা ইন্ধন দিচ্ছে কি- সেটাও একটি বড় প্রশ্ন বলে মন্তব্য করেন অনেক সাধারণ শিক্ষার্থী। ক্ষমতাসীন দলের কর্মী-সমর্থকরা দোষ দিচ্ছেন বাম দলের এবং ছাত্রদলের কর্মীদের। আবার ছাত্রলীগের কর্মীদের দোষারোপ করছেন কেউ কেউ।

চারুকলার সাবেক ছাত্র চঞ্চল কর্মকার ১৪১৮ সালের বৈশাখ উদযাপন পরিষদের সমন্বয়ক ছিলেন। তিনিও জানান, "যেহেতু হিন্দু ধর্মের অনুসারী অনেকেই থাকেন, ট্রাডিশনালি ওই ক্যান্টিনে গরুর-মাংস রান্না করা হয়না"।

তিনি বলেন, তারা যখন উৎসবে কাজ করতেন তখন শিক্ষকদের একধরনের তত্ত্বাবধান ছিল। এবারের উৎসব আয়োজনের ক্ষেত্রে সেটা দেখা যায়নি। সেটা থাকা দরকার ছিল"।

এছাড়া শিক্ষার্থীরা আরও বলছেন, কেউ কেউ ক্যান্টিনে বাকিতে খাওয়া-দাওয়া করেন। পাওনা নিয়ে ক্যান্টিন মালিকের সাথে তাদের বিরোধেও এটা ঘটানো হতে পারে।

আবার মঙ্গল শোভাযাত্রা আন্তর্জাতিক র্স্বীকৃতি পাওয়ায় তা নিয়ে বাণিজ্য করার চেষ্টায় আছে অনেকে। তা নিয়েও বিরোধের জের হতে পারে এটি।

সম্পর্কিত বিষয়