ভারতের নবাবি শহর লখনৌতে মাংসের আকাল, হুমকিতে কাবাব-বিরিয়ানির ঐতিহ্য

ছবির কপিরাইট ANNA ZIEMINSKI
Image caption লখনৌয়ের মাটন বিরিয়ানির ঐতিহ্য বহুদিনের

গত দুদিন ধরে লখনৌ শহরের মাংস বিক্রেতারা রাস্তায় নেমে এর বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানাচ্ছেন, কিন্তু পৌর কর্তৃপক্ষ নতুন করে লাইসেন্স দিতে এখনও রাজি হয়নি।

সরকারের এই নীতি বহাল থাকলে লখনৌর 'তেহজিব' বা সংস্কৃতির একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ বিলুপ্ত হয়ে যাবে বলে খাদ্যরসিকরা আক্ষেপ করছেন।

লখনৌ মানেই অনেকের কাছে জিভে জল আনা টুন্ডে বা মুখে মিলিয়ে যাওয়া তুলতুলে গিলাওয়াটি কাবাব।

কিন্তু গত মাসে উত্তরপ্রদেশে বিপুল গরিষ্ঠতা নিয়ে যোগী আদিত্যনাথের নেতৃত্বে বিজেপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর থেকেই রাজধানী লখনৌতে মাংস বিক্রেতাদের দুর্দিন শুরু হয়েছে।

শহরের বিখ্যাত টুন্ডে কাবাবি তাদের ট্রেডমার্ক 'বড়ে গোস্ত' বা মহিষের মাংসের কাবাব বানানো বন্ধই করে দিতে বাধ্য হয়েছে। আর এখন ছাগল বা পাঁঠার মাংসেও টান পড়েছে - কারণ লখনৌর পুর কর্তৃপক্ষ কোনও মাংসের দোকানকেই বৈধভাবে ব্যবসা করার ছাড়পত্র দিচ্ছে না।

শহরের গোস্ত ও বকরি ব্যাপার মন্ডল বা মাংস বিক্রেতা সমিতির সদস্যরা এর বিরুদ্ধেই আন্দোলনে নেমেছেন।

তাদের বক্তব্য খুব পরিষ্কার, "হয় সরকার আমাদের নতুন ব্যবসার পথ করে দিক - নয়তো যেমন এতদিন চলছে তেমন চলতে দিক। আমাদের লাইসেন্সও নবায়ন করা হচ্ছে না, পাশাপাশি বহু দোকানে হানা দিয়ে সিল করে দেওয়া হচ্ছে, ব্যবসায়ীদের তুলে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে।"

লখনৌতে যে ছশোরও বেশি মাংসের দোকান, তার মধ্যে লাইসেন্স আছে সিকিভাগেরও কম দোকানের। সেগুলোরও লাইসেন্সের মেয়াদ ফুরিয়েছে গত ১৫ এপ্রিল - কিন্তু সেগুলো নবায়ন না-হওয়ায় শহরে এখন কোনও বৈধ মাংসের দোকানই নেই।

ফলে লখনৌর মাংস-নির্ভর খানাপিনার যে ঘরানা, সেটা এখন ভীষণ বিপন্ন বলেই মনে করছেন ওই শহরে জন্মানো ও বেড়ে ওঠা বাঙালি গৌতম মিত্র।

তিনি বলছিলেন, "এটা লখনৌর ওপর একটা বিরাট আঘাত। কারণ আপনাকে মনে রাখতে হবে, এখানকার যে অওয়ধি ক্যুইজিন, তাতে এখনও আমিষ রান্নায় পুরনো লখনৌতে কম করে পঞ্চাশ-ষাট রকমের মশলা ব্যবহার করা হয়। লখনৌর খাবারের যে বিখ্যাত খুশবু বা অ্যারোমা, তা কিন্তু ওখান থেকেই আসে।"

"আপনি এখানকার বিরিয়ানিই বলুন, বা শামি কাবাব, শর্মিলি কাবাব, কাটি কাবাব কিংবা গিলাওয়াটি - এ স্বাদ আপনি ভূভারতে কোথাও পাবেন না। এই শহরে দস্তরখানের মতো চেইন, কিংবা টুন্ডে-করিমসের মতো দোকানগুলো এই রেওয়াজকেই বজায় রেখেছে, আর বহু মুসলিম খানদান বহু বহু বছর ধরে তা পরিবেশন করে আসছে।"

ছবির কপিরাইট SAJJAD HUSSAIN
Image caption কাবাব ছাড়া লখনৌ শহরকে কেউ কল্পনাও করতে পারেন না

যে মুসলিম পরিবারগুলো বংশপরম্পরায় এই মাংসের ও কাবাবের ব্যবসা করে আসছেন, তাদের রুটিরুজিও এখন লাটে ওঠার উপক্রম।

মাংস-বিক্রেতাদের সংগঠনের নেতা আইসাম-উল হক কুরেশির কথায়, "কুরেশিরা বহু প্রজন্ম ধরে যে কারবার চালিয়ে আসছে, উত্তরপ্রদেশ সরকার রাতারাতি সেটাকে অবৈধ বলে ফরমান দিয়ে ব্যবসা বন্ধ করে দিচ্ছে।"

"কে আইনি আর কে বেআইনি তারও কোনও বাছবিছার না-করে একধারসে সব মাংসের দোকানে তালা ঝুলিয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা করা হচ্ছে। এতো জোর যার মুলুক তার অবস্থা!"

তবে কাবাব-বিরিয়ানির দফারফা হওয়াতে লখনৌতে সবাই যে অখুশি তা নয়। লখনৌ বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক চন্দনা দে-ই যেমন মনে করেন তাদের শহরে বহু নিরামিষ বিকল্পও আছে - যেগুলো মোটেই কম স্বাদু নয়।

ড: দে-র কথায়, "কাবাব মানেই পাঁঠার মাংসের কাবাব হতে হবে কে বলল? মসুর ডালের কাবাব, কাঁঠালের কাবাব, সয়া গ্র্যানিউলসের কাবাব, পদ্মবীজের কাবাব কিংবা ভেজিটেবল, ফিশ বা চিকেন কাবাব ইত্যাদি নানা ধরনের কাবাব এই শহরে পাওয়া যায় আর মানুষ সেগুলো দারুণ ভালওবাসেন।"

মাংস-বিক্রেতাদের কেবল বৈধ লাইসেন্সের আওতাতেই ব্যবসা করতে দেওয়ার সিদ্ধান্তে লখনৌর সংস্কৃতি আরও পরিচ্ছন্ন হয়ে উঠবে এবং লোককল্যাণেই সরকার এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে বলেও অধ্যাপক দে মনে করেন।

মাংস বিক্রিতে হাইজিন বা পরিচ্ছন্নতা আনার প্রয়াসে কেউ আপত্তি করছেন না - তবে গিলাওয়াটি কাবাবের বিকল্প সয়াবিনের চাপ, এটা মানতে লখনৌতে অনেকেই রাজি নন।

তাদের বক্তব্য খুব পরিষ্কার, একটা নির্দিষ্ট শ্রেণীর খাদ্যাভ্যাসকে পুরো সমাজের ওপর চাপিয়ে দিতেই মাংস বিক্রেতাদের ওপর সরকারের কোপ পড়ছে।