ফ্রান্সের নির্বাচন কি ইউরোপ এবং বিশ্বের রাজনীতিকে বদলে দিতে পারে?

ফরাসী নির্বাচন ছবির কপিরাইট Reuters
Image caption নির্বাচনে লড়াই করবেন ১১ জন প্রার্থী।

ফ্রান্সই কি পরবর্তী পশ্চিমা দেশ যেখানে উদারপন্থী মূল্যবোধ এবং রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানকে চ্যালেঞ্জ করা হবে?

ফরাসী প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে শীর্ষে থাকা চারজন প্রার্থীর দুজনই রাজনীতির চরম দুই মেরুতে অবস্থান করছেন। চরম-ডানপন্থী মারি লে পেন এবং চরম-বামপন্থী জঁ-লুক মেলেশন।

এই দুই প্রার্থীর যেকোন একজনের জয়ই ইউরোপিয় ইউনিয়নে ফ্রান্সের সদস্যপদকে প্রশ্নবিদ্ধ করবে। ব্রেক্সিটের পর ইইউ-র অপর এক প্রতিষ্ঠাতা সদস্যের বিদায় হলে সংস্থাটির ভবিষ্যৎ নিয়ে মারাত্মক উদ্বেগ তৈরি হবে।

এরই মধ্যে বৃহস্পতিবার প্যারিসে পুলিশের ওপর এক বন্দুকধারীর হামলা অস্বস্তিকর পরিবেশ আরো বাড়িয়েছে।

প্রশ্ন হচ্ছে, ব্রেক্সিট এবং যুক্তরাষ্ট্রে ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিজয়ের পর ফ্রান্সও কি গতানুগতিক রাজনীতির ওপর আঘাত হানতে যাচ্ছে?

নির্বাচনে নতুন কি?

ফ্রান্সের বর্তমান সমাজতন্ত্রী প্রেসিডেন্ট ফ্রাঁসোয়া ওলাদ খুবই অজনপ্রিয় এবং দ্বিতীয়বারের মতো নির্বাচনেও তিনি নির্বাচনে দাঁড়াননি। আধুনিক ফ্রান্সের ইতিহাসে এমন ঘটনা এই প্রথম।

খোলা মাঠে এখন প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন ১১ জন প্রার্থী। কেউই ২৩শে এপ্রিলের নির্বাচনে ৫০% ভোট পাবেন বলে মনে হচ্ছে না, ফলে অনেকটা অবধারিতভাবে নির্বাচন গড়াবে ৭ই মে-র রান অফে। যেখানে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন শীর্ষ দুই প্রার্থী।

ঐতিহাসিকভাবে ফরাসী রাজনীতিতে আধিপত্য করে এসেছে বামপন্থী এবং মধ্য-ডানপন্থীরা, তবে এবার সেই মডেল একেবারে চুরমার হয়ে যেতে পারে।

ছবির কপিরাইট Getty Images
Image caption সবচেয়ে পরিচিত প্রার্থীরা: (বাঁ থেকে) ফ্রাসোয়া ফিলন, বেনোয়াঁ হ্যামন, মারি লে পেন,ইমানুয়েল ম্যাক্রন এবং জঁ-লুক মেলেশন।

সমাজতন্ত্রী প্রার্থী বেনোয়াঁ হ্যামন একরকম হিসেবের বাইরেই চলে গেছেন। এদিকে তার রক্ষণশীল প্রতিদ্বন্দ্বী, রিপাবলিকান প্রার্থী ফ্রাসোয়া ফিলনের বিরুদ্ধে স্ত্রীকে "মিথ্যা চাকরি" দেয়ার অভিযোগে বিচার বিভাগীয় তদন্ত হবার পর তাকে টিকে থাকার জন্য লড়াই করতে হচ্ছে।

কে জিততে পারে?

জনমত জরিপকে বিশ্বাস করলে মূল প্রতিদ্বন্দ্বী দুজন হচ্ছেন, চরম-ডানপন্থী ন্যাশনাল ফ্রন্টের নেত্রী মারি লে পেন এবং মধ্যপন্থী ইমানুয়েল ম্যাক্রন।

মিজ লে পেন ২০১১ সালে তার বাবার কাছ থেকে ন্যাশনাল ফ্রন্টের নেতৃত্ব নেন এবং এরপর থেকে দলের চরমপন্থি অতীত থেকে সরে আসার চেষ্টা করছেন।

অপরদিকে ৩৯ বছর বয়সী সাবেক বিনিয়োগ ব্যাংকার, মি. ম্যাক্রন প্রেসিডেন্ট ওলাদের অধীনে অর্থনীতি বিষয়ক মন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেছেন। তবে প্রেসিডেন্ট পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতার উদ্দেশ্যে ২০১৬ সালে তিনি পদত্যাগ করেন।

শুরুতে ফেভারিট থাকা মি. ফিলনের বিরুদ্ধে তার স্ত্রীকে 'মিথ্যা চাকরি'-র তথ্য দেখিয়ে সরকারী অর্থ দেয়ার অভিযোগ আসল তার প্রেসিডেন্ট হবার স্বপ্ন অনেকটাই নিরাশায় পর্যবসিত হয়। তার বিরুদ্ধে এখন আনুষ্ঠানিক তদন্ত হচ্ছে এবং তিনি এসব অভিযোগকে রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র বলে দাবী করছেন।

ছবির কপিরাইট AFP
Image caption প্যারিসের কৃষি মেলায় যান মিজ লে পেনসহ প্রেসিডেন্ট প্রার্থীরা।

অনেকটা চমক নিয়ে এসেছেন চরম-বামপন্থী প্রার্থী মি. ম্যালেশন, যার বুদ্ধিদীপ্ত ব্যক্তিত্ব নতুন সমর্থকদের নজর কেড়েছে।

৬৫ বছর বয়স্ক সাবেক সমাজতন্ত্রী মন্ত্রী মি. ম্যালেশন ২০০৮ সালে দল থেকে পদত্যাগ করেন। বর্তমানে তিনি আসুমিস ফ্রান্স (অদমিত ফ্রান্স) নামের একটি দলের নেতৃত্ব দিচ্ছেন। নির্বাচনী প্রচারে হলোগ্রাম প্রযুক্তির সাহায্যে একইসাথে একাধিক সমাবেশে বক্তব্য দিয়ে সাড়া ফেলেছেন তিনি।

নির্বাচনে ইস্যু কি?

প্রধান একটি ইস্যু বেকারত্ব। দেশটিতে বেকারত্বের হার ১০ শতাংশ।

২৮ টি ইইউ-ভুক্ত দেশের মধ্যে বেকারত্বের দিক দিয়ে ফ্রান্সের অবস্থান অষ্টম।

আরেকটি প্রধান ইস্যু নিরাপত্তা। নির্বাচনের দুদিন আগেই প্যারিসে হামলার ঘটনা ঘটেছে এবং পাঁচ দিন আগে মার্সেইতে হামলার পরিকল্পনার অভিযোগে দুজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

ছবির কপিরাইট AFP
Image caption ১১ জনের মধ্যে দুজন প্রার্থী দ্বিতীয় পর্যায়ে যেতে পারেন।

২০১৫ সাল থেকে ২৩০ জন সন্ত্রাসী হামলায় মারা গেছে এবং ফ্রান্স এখনো জরুরী অবস্থার মধ্যে রয়েছে। কর্মকর্তাদের আশঙ্কা, ইরাক এবং সিরিয়ায় যুদ্ধে যাওয়া শত-শত ফরাসী মুসলিম তরুণ হয়তো দেশে ফিরে নানা ধরণের সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড শুরু করবে।

অনেকেরই ধারণা, ইসলামপন্থীদের হামলার ফলে ডানপন্থীদের সমর্থন আরো বাড়বে। বিশেষ করে মিজ লে পেনের প্রতি, যিনি ঘোষণা দিয়েছেন সব ধরণের বৈধ অভিবাসন বন্ধ করার এবং বিদেশীদের আগে চাকরি, আবাসন এবং স্কুলের ক্ষেত্রে ফরাসী নাগরিকদের প্রাধান্য দেয়ার।

প্যারিস থেকে বিবিসির হিউ স্কোফিল্ড বলছেন, গোয়েন্দাদের ধারণা যে হামলাকারীরা সজ্ঞানেই লে পেনের বিজয় চাইছে। কারণ, এই বিজয় দেশটিকে আরো বিশৃঙ্খলার দিকে ঠেলে দেবে।

হলোগ্রামের বিষয়টা কি?

চরম-বামপন্থী প্রার্থী জঁ-লুক মেলেশন তার প্রচারণা শুরু করেছেন লিয়ান এবং প্যারিসে একইসাথে সমাবেশে বক্তব্য দিয়ে। এ ঘটনা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়।

তিনি এবং মিজ লে পেন উভয়েই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহারে ব্যাপক পারদর্শী।

ছবির কপিরাইট AFP
Image caption ২০১৬ সালে লরি হামলায় অনেক মানুষ মারা যায়।

মিজ লে পেনের টুইটার ফলোয়ারের সংখ্যা প্রায় ১৪ লাখ এবং মি. মেলেশনের ইউটিউব সাবস্ক্রাইবারের সংখ্যা ৩ লাখ।

মার্কিন নির্বাচনের মত 'ফেক নিউজ' বা মিথ্যা খবর ফ্রান্সের নির্বাচনেও আলোচনায় এসেছে। একটি ব্যঙ্গাত্মক খবরকে আলজেরিয়ান একটি বার্তা সংস্থা সত্য মনে করে ছেপেছে, যেখানে বলা হয় মিজ লে পেন ফ্রান্সের চারিদিকে দেয়াল তুলবেন এবং তার খরচ দিতে বাধ্য করবেন আলজেরিয়াকে।

ন্যাশনাল ফ্রন্ট কেন চরম-ডানপন্থী?

মিজ লে পেনের বাবা তার ঘৃণাসূচক বক্তব্যের জন্য বেশ নিন্দিত ছিলেন। কিন্তু ক্ষমতা গ্রহণের পর থেকে দলের ভাবমূর্তি মিজ লে পেন দলের ভাবমূর্তি পরিবর্তন করে মধ্যপন্থী এবং বামপন্থীদেরও আকর্ষণ করার চেষ্টা করছেন।

ছবির কপিরাইট AFP/Getty
Image caption হলোগ্রামের মাধ্যমে বক্তব্য দেন মি. ম্যালেশন

তবে তার মূল সমর্থকগোষ্ঠি এখনো চরম-ডানপন্থীরাই। তিনি সকল ধরণের নাগরিক সেবায় বিদেশীদের আগে ফরাসী নাগরিকদের প্রাধান্য দিতে চান এবং সবধরনের বৈধ অভিবাসনও বন্ধ করে দেয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।

ন্যাশনাল ফ্রন্টের সাথে ইউরোপের অন্যান্য চরম-ডানপন্থী দলের সম্পর্কও বেশ ভালো, যার মধ্যে রয়েছে অস্ট্রিয়ার ফ্রিডম পার্টি। যদিও মূলধারার ডানপন্থী দলগুলো সবসময় এধরণের দলগুলোকে এড়িয়ে চলেছে।

আরও পড়ুন:

কড়া নিরাপত্তার মাঝে নির্বাচনের প্রস্তুতি নিচ্ছে ফ্রান্স

বিশ্বজুড়ে বিজ্ঞানের জন্য মিছিল

বাংলাদেশে 'নারীদের মধ্যে তামাক এবং মাদক ব্যবহার বাড়ছে'

সম্পর্কিত বিষয়