'সেনাবাহিনী কিছু লাকড়ি আর তেল দিয়ে দাহ করেছে, পরিবারের কাউকে ডাকেনি'

ছবির কপিরাইট ফোকাস বাংলা
Image caption রোমেল চাকমার মৃত্যুতে ঢাকায় একটি বাম ছাত্র সংগঠণের সমাবেশ

বাংলাদেশে পার্বত্য জেলা রাঙামাটিতে সেনা সদস্যদের নির্যাতনে দৃষ্টি প্রতিবন্ধী এক কলেজ ছাত্রের মৃত্যুর অভিযোগ নিয়ে গত কদিন ধরে তোলপাড়া চলার পর মৃত রোমেল চাকমার স্বজনরা গুরুতর সব অভিযোগ করেছেন।

পরিবারের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে রমেল চাকমা নামের ঐ ছাত্রের মরদেহ নিয়ে পুড়িয়ে দিয়েছে সেনাবাহিনীর সদস্যরা। সে সময় বাবা-মা সহ পরিবারের কাউকে ঘেঁষতে দেয়া হয়নি।

তবে স্থানীয় পুলিশ ও সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে পাওয়া গেছে ভিন্ন ধরনের ভাষ্য।

গত কয়েকদিন ধরেই বিষয়টি নিয়ে ব্যাপক সমালোচনার ঝড় উঠেছে, বিশেষ করে সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমগুলোতে। রমেল চাকমা ছিলেন পাহাড়ি ছাত্র পরিষদের রাঙামাটি নানিয়ারচর শাখার সাধারণ সম্পাদক। এক চোখে দেখতে পেতেন না। এ বছর উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষা দিচ্ছিলেন।

তার কাকা রনো বিকাশ চাকমা বিবিসিকে বলেছেন, "এপ্রিলের পাঁচ তারিখ তাকে স্থানীয় সেনা ক্যাম্পে ডেকে নিয়ে যাওয়া হয়। রাত বারোটার দিকে তাকে হাসপাতালে ভর্তি করার জন্য নিয়ে গিয়েছিলো। এমনভাবে মারধোর করেছে যা বলার মতো নয়"

রমেল চাকমা ১৯ শে এপ্রিল চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান। তার মরদেহ আনতে পরিবারের সদস্যরা চট্টগ্রামে যান কিন্তু তাদের মরদেহ দেখতে দেয়া হয়নি বলে তারা অভিযোগ করেছেন।

তাহলে নির্যাতনের চিহ্ন কিভাবে দেখলেন তার জবাবে রনো বিকাশ চাকমা বলেন, "এলাকার মুরুব্বিরা যারা মরদেহ আনতে চট্টগ্রাম গিয়েছিলেন তারা দেখেছেন।"

এলাকার ঐ মুরুব্বিদের একজন ছিলেন নানিয়ারচর গিলাছড়ি ইউনিয়ন পরিষদের মেম্বার যোগেন্দ্র চাকমা। তিনি বলেন, "আমি লাশখানায় দেখেছি রমেলের গায়ে সব কালো। এত ফর্সা চেহারার রমেলের সব কালো হয়ে গেছে।"

এছাড়া অভিযোগ উঠেছে রমেল চাকমার মরদেহ তার পরিবারের কাছে হস্তান্তর না করে তাদের অনুপস্থিতিতে সেনা সদস্যরাই মরদেহটি দাহ করেছে। রনো বিকাশ চাকমা বলছেন, "আমাদের পাহাড়িদের নিয়ম অনুযায়ী যেভাবে দাহ করি সেভাবে না করে সেনাবাহিনী এসে কিছু লাকড়ি আর তেল নিয়ে দাহ করেছে। সে সময় ওনার মা -বা সহ পরিবারের কাউকে ডাকা হয়নি"

আরও পড়ুন: সৌদিদের কাছে টানছেন ট্রাম্প, পরিণতি কি?

দিল্লিতে মোষ পরিবহনের অপরাধে মারধর, জেল

এসব অভিযোগ সম্পর্কে জানতে চাইলে আন্ত:বাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তর বা আইএসপিআর এর পরিচালক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মোহাম্মদ রাশিদুল হাসান বিবিসিকে জানিয়েছেন গত পাঁচই এপ্রিল দুটি বাস লুট ও একটি ট্রাক পোড়ানোর মামলায় সেনাবাহিনী রমেল চাকমাকে গ্রেফতার করে। সেদিন রাতেই তাকে পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয়। এর পর পুলিশের তত্ত্বাবধানে চট্টগ্রামে মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন এবং সেখানেই তিনি ১৯ এপ্রিল চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান।

এই মৃত্যুকে ঘিরে গত কয়েক দিন ধরে চলছে বিতর্ক ও প্রতিবাদ। এটিকে ঘিরে কিছু প্রশ্নও তৈরি হয়েছে সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে। মরদেহ পরিবারকে দেখতে না দেয়া অথবা মরদেহ দাহ করতে না দেয়ার অভিযোগের সাথে যুক্ত হয়েছে স্থানীয় পুলিশের ভিন্ন ধরনের ভাষ্য।

নানিয়ারচর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মোহাম্মদ আব্দুল লতিফ বলেন, "গত পাঁচ তারিখ দিবাগত রাত্রে বারোটা সাড়ে বারোটার দিকে তারা একটা রোগী নিয়ে আসে। আমরা তাকে রোগীই বলবো। তখন কর্তব্যরত অফিসার বলেছে তাকে চিকিৎসা করান নিয়া। চিকিৎসার পরেই আপনারা আইনগত ব্যবস্থা নেবেন। এরপর তারা সড়ক দুর্ঘটনায় আহত হয়েছে বলে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করে। তারপর ঐ রাত্রেই তাকে তারা চিটাগাং রেফার করে। এতটুকু আমি জানি।"

মি লতিফ বলছেন রমেল চাকমার বিরুদ্ধে কোন মামলাও তার থানায় ছিলো না। তিনি বলছেন, "তার বিরুদ্ধে আমাদের কাছে কোন মামলা নাই। তারা আমাদের কাছে তাকে হস্তান্তর করার চেষ্টাও করে নাই। ডিউটি অফিসার দেখেছে যে রোগীর অবস্থা খারাপ। তখন বলছে আপনারা চিকিৎসা করান।"

অন্যদিকে আইএসপিআর এর পরিচালক মি হাসান বলেছেন, ২১ এ এপ্রিল দুপর দেড়টা থেকে চারটার মধ্যে নানিয়ারচর থানা পুলিশ, কাউখালী উপজেলার ইউএনও এবং স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের উপস্থিতিতে রমেল চাকমার মরদেহ দাহ করা হয়েছে। তিনি কোন ধরনের নির্যাতনের কথা অস্বীকার করেছেন।

রোমেল চাকমার কথিত হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে পার্বত্য জেলা রাঙামাটিতে সড়ক ও নৌ অবরোধ শুরু হয়েছে।

সম্পর্কিত বিষয়