ইতিহাসের সাক্ষী
আপনার ডিভাইস মিডিয়া প্লেব্যাক সমর্থন করে না

জিন প্রযুক্তিতে তৈরি টমাটো

উনিশশো চুরানব্বই সাল। ঐ বছরই প্রথমবারের মতো বাজারে জিন পরিবর্তন ঘটিয়ে তৈরি টমাটোর বিক্রি শুরু হলো। এটি তৈরি করেছিল একটি আমেরিকান কোম্পানি। তাদের লক্ষ্য ছিল এই টমাটো পাকবে ধীরে ধীরে এবং এটি তাজা থাকবে দীর্ঘদিন। এই টমাটোকে বলা হতো ফ্ল্যাভা-সেভা।

রজার স্যালকুইস্ট যেমন ঠিক টমাটো ফ্যান নন। তেমনি তিনি বিজ্ঞানীও নন। তিনি ভালবাসেন নতুন নতুন প্রযুক্তি নিয়ে কাজ করতে। এমন সব প্রযুক্তি যা জীবনকে বদলে দেয়।আগে তিনি কাজ করতেন পরমাণু শিল্পে, এরপর তিনি কাজ করেন সোলার এনার্জি বা সৌরশক্তি খাতে।

এরপর একজন ঘনিষ্ঠ বন্ধু নর্ম গোল্ডফার্ব যখন তাকে ক্যালজিন নামে এক কোম্পানিতে যোগ দেয়ার প্রস্তাব দিলেন, তখন তিনি সেই প্রস্তাব লুফে নিলেন। ক্যালজিন কোম্পানির কাজ হলো কৃষিখাতে জেনেটিক এঞ্জিনিয়ারিং-এর প্রয়োগ ঘটানো।

সেদিনের কথা মনে করে তিনি বলছিলেন, "নর্ম আমাকে বলেছিল আমাদের হাতে অনেক ধরনের প্রযুক্তি রয়েছে। কিন্তু এই প্রযুক্তি ব্যবহার করে কিভাবে অর্থ কামানো যায়, সে সম্পর্কে আমরা কিছুই জানিনা। এর আগে কেউ কখনো কোন গাছের ওপর জিন প্রযুক্তি ব্যবহার করেনি।

"তার কোন ধারণাই ছিল না এসব প্রযুক্তি ব্যবহার করে কী ধরনের পণ্য উৎপাদন করা যাবে। কিংবা কিভাবে এসব গবেষণার জন্য পুঁজির জোগাড় করা হবে। পুরো ব্যাপারটাই ছিল একটা অন্ধ বিশ্বাস। আমি তার সাথে যোগ দিলাম। এর পেছনে একটা কারণ হচ্ছে কৃষি আমার খুব পছন্দের বিষয়। আর এই কাজের মধ্যে একটা চ্যালেঞ্জও ছিল।"

চ্যালেঞ্জ তো ছিলই। কারণ সেটা ছিল জেনেটিক এঞ্জিনিয়ারিং-এর শৈশব কাল। কিন্তু এই প্রযুক্তি খুলে দিয়েছিল অপার এক সম্ভাবনার দুয়ার। কারও কারও মনে জেনেটিক এঞ্জিনিয়ারিং নিয়ে ছিল প্রবল শঙ্কা।

ছবির কপিরাইট MARTIN BOND/SCIENCE PHOTO LIBRARY
Image caption জিন পরিবর্তন করে তৈরি টমাটোর ব্যাপারে ভয় কাজ করছিল।

এদেরই একজন ছিলেন ওয়াশিংটন-ভিত্তিক পরিবেশ বিজ্ঞানী জেরেমি রিফকিন। তিনি বলেছিলেন, "এই প্রযুক্তির মধ্য দিয়ে প্রাণীর বিবর্তনের প্রক্রিয়ায় যত ধরনের সীমারেখা তৈরি হয়েছে, তার সবই ভেঙে ফেলা যাবে।"

জিন প্রযুক্তি নিয়ে প্রথম সফল গবেষণা হয়েছিল ১৯৭২ সালে। সে সময় একটি ব্যাকটেরিয়ার জিন সম্পূর্ণ ভিন্ন আরেকটি ব্যাকটেরিয়ার দেহে প্রতিস্থাপন করা হয়েছিল। কিন্তু ১৯৮০ সালের মধ্যেই বিজ্ঞানীরা উদ্ভিদের জিন প্রাণকোষে, কিংবা প্রাণীর দেহ থেকে নেয়া জিন উদ্ভিদের ওপর বসিয়ে দিচ্ছিলেন।

বিজ্ঞানের এই নতুন শাখা বিপ্লব ঘটিয়ে ফেলেছিল। কিন্তু এ নিয়ে সন্দেহবাদীদের আশঙ্কা ছিল মানুষের স্বাস্থ্য কিংবা পরিবেশের জন্য এই প্রযুক্তি ভয়ংকর ফল বয়ে আনতে পারে। বলছিলেন জেরেমি রিফকিন, "এখন বিজ্ঞানী এবং কর্পোরেশনগুলো মানুষের জিন পশুর দেহে, পশুর জিন উদ্ভিদের দেহে বসিয়ে দিচ্ছে। তার মানে হলো, এটা খুবই শক্তিশালী এক প্রযুক্তি। একে ব্যবহার করে বৈজ্ঞানিক প্রাণী এবং উদ্ভিদের দেহকোষের জিনগত কাঠামো বদলে দিতে পারে।"

এ বিষয়ে তবে রজার স্যালকুইস্টের বক্তব্য হলো জেনেটিং এঞ্জিনিয়ারিং সম্পর্কে মানুষের মধ্যে পরিষ্কার ধারণা ছিল না।

তিনি বলেন, "এই প্রযুক্তির কোন কোন বিরোধিতাকারী নাম দিয়েছিলেন 'ফ্র্যাংকেনফুড'। তাদের কথা শুনলে মনে হবে লতাগুল্মগুলো পৃথিবীর ওপর হামলা চালাচ্ছে। এমনকি ওয়াল স্ট্রিটের বিশ্লেষকরা, যারা আসলে সবজান্তা, এই প্রযুক্তি সম্পর্কে তাদেরও কোন পরিষ্কার ধারণা ছিল না।"

Image caption টমাটোর বাইরে জিন প্রযুক্তি ব্যবহার করে আজকাল বহু কৃষিপণ্য আবাদ করা হচ্ছে।

জেনেটিক এঞ্জিনিয়ারিং যে নিরাপদ, প্রয়োজনীয়, এবং সর্বোপরি এর থেকে মুনাফা হতে পারে, এটা ওয়াল স্ট্রিটের ধনী পুঁজিপতিদের বিশ্বাস করানোর ভার দেয়া হয়েছিল রজার স্যালকুইস্টের ওপর।

ক্যালজিন কৃষি শিল্পে ঢুকতে চাইছিল এমন এক টমাটো তৈরি করে যার স্বাদ হবে ভাল এবং যেটা তাজা থাকবে দীর্ঘদিন। কিছুদিনের মধ্যেই তারা গবেষণায় সুফল পেতে শুরু করলো।

কিন্তু কিভাবে জেনেটিং এঞ্জিনিয়ারিং-এ পুঁজি আকর্ষণ করা হয়েছিল? রজার স্যালকুইস্ট বলছেন, "ওয়াল স্ট্রিটের প্রতিটি স্টক ব্রোকার কিংবা অ্যানালিস্টের স্বপ্ন ছিল জানুয়ারি মাসের শীতের মধ্যে সুস্বাদু নিউজার্সি টমাটো খাওয়া। এই প্রসঙ্গটি উঠলেই খুশিতে তাদের চোখ জ্বলজ্বল করে উঠতো। আর আমি এটা দিয়েই তাদের বড়শিঁতে গেঁথেছিলাম। আমি তাদের বলেছিলাম আমরা বিশ্বের এক নম্বর টমাটো উৎপাদনকারী কোম্পানিতে পরিণত হবো। আমাদের টমাটোর স্বাদ হবে অতুলনীয়। একথা বলেই আমি বিনিয়োগকারীদের কাছ থেকে সবচেয়ে বেশি অর্থ উঠিয়েছিলাম।"

সুতরাং চ্যালেঞ্জ ছিল এমন একটি টমাটো তৈরি করা যেটি ফসলের ক্ষেত থেকে বাজারের দোকানে যাওয়া পর্যন্ত পচে যাবে না। জেনেটিক এঞ্জিনিয়ারিং-এ একটা দুর্ভাবনা সব সময়েই কাজ করে। সেটা হলো একটি প্রজাতির প্রাণীর দেহ থেকে জিন সরিয়ে নিয়ে অন্য একটি প্রজাতির প্রাণীর দেহে প্রতিস্থাপন করার সমস্যা।

কিন্তু ক্যালজিনের বিজ্ঞানীরা ভাবলেন তারা সেটি করবেন না। তারা টমাটোর নিজের জিনের মধ্যেই প্রয়োজনীয় পরিবর্তন ঘটাবেন।

রজার স্যালকুইস্ট বলছেন, "জেনেটিক এঞ্জিনিয়রিং-এ সবাই চায় কিছু একটা যোগ করতে। আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম যে আমরা কিছু যোগ করবো না। আমরা কিছু একটা বিয়োগ করবো। আমরা টমাটোর দেহ থেকে যে জিনিসটি বাদ দিতে চেয়েছিলাম তা হলো একটি বিশেষ জৈব-রস যার কারণে টমাটোতে পচন ধরে।"

ছবির কপিরাইট John Innes Centre
Image caption বেগুনি টমাটো, জিন প্রযুক্তির ফসল।

ক্যালজিনের বিজ্ঞানীরা দেখতে পেলেন যদি টমাটোর একটি বিশেষ জিনে পরিবর্তন ঘটানো যায়, তাহলে টমাটোর তাজা থাকার মেয়াদ নাটকীয়ভাবে বেড়ে যায়। এর মানে হলো এই টমাটোকে বেশিদিন ধরে গাছে রাখা যায়, যাতে এর স্বাভাবিক স্বাদ বৃদ্ধি পায়। এটি পাকা টসটসে হলে গাছ থেকে তুলে নেয়া যায় এবং বাজারে ওঠার আগে এতে পচন ধরে না।

এই পর্যন্ত ব্যাপারটা বেশ সহজ ছিল। সমস্যা হলো কিভাবে এই টমাটোর ব্যবসা শুরু করা যায়। কারণ, সাধারণ টমাটো উৎপাদনকারীরা নতুন এই টমাটোর ফলাফল না দেখে চাষাবাদের জন্য অতিরিক্ত বিনিয়োগ করতে রাজী ছিলেন না বলে বলছিলেন মি. স্যালকুইস্ট, "নতুন ধরনের এই টমাটো চাষের জন্য কেউই রাজী ছিলেন না। সরকারি নিয়মনীতি রক্ষা, কৃষি বিভাগের আরোপ করা আইনকানুন মেনে চলা হচ্ছে কিনা, তা তদারকির জন্য আমাদের আলাদা স্টাফ নিয়োগ করতে হয়েছিল।"

ঐ সময়ে যুক্তরাষ্ট্রে টমাটোর বাজারের মোট মূল্য ছিল ৪০০ কোটি ডলার। আর সেই বাজার ধরতে সময় লেগেছিল ১০ বছর। বিনিয়োগ করতে হয়েছিল মোট ১০ কোটি ডলার। কিন্তু এই সময়টার বেশিরভাগই কেটেছিল ওয়াল স্ট্রিটের বিনিয়োগকারী এবং সাধারণ জনগণকে বুঝিয়ে শুনিয়ে রাজি করাতে যে জিন পরিবর্তন ঘটিয়ে তৈরি টমাটো খাওয়াতে কোন রকম ঝুঁকি নেই।

মি. স্যালকুইস্ট এক মজার ঘটনার কথা উল্লেখ করেন, "আমি যখন নিউ ইয়র্কে যেতাম বিনিয়োগকারীদের সাথে কথা বলতে, তখন সাথে করে এক কেস টমাটো নিয়ে যেতাম। আমার হোটেলের উল্টো দিকেই ছিল খুবই ভাল একটি ইটালিয়ান রেস্টুরেন্ট। তার মালিককে আমি ঐ টমাটো উপহার দিতাম। সে তার খদ্দেরদের ঐ টমাটো খেতে দিত। এটা নিয়ে তার নিজের বা তার কর্মচারীদের মনে কোনও দ্বিধা ছিল কিনা, জানি না। কিন্তু আমি নিজে নিয়মিতভাবেই ঐ রেস্টুরেন্টে খাওয়াদাওয়া করতাম।"

জেনেটিক পরিবর্তনের মাধ্যমে তৈরি কৃষিপণ্যের প্রভাব খতিয়ে দেখার জন্য মার্কিন সরকার নতুন কোন বিভাগ তৈরি করেনি। এর পরিবর্তে এই দায়িত্বটি সম্মিলিতভাবে দেয়া হয়েছিল কৃষি বিভাগ, পরিবেশ বিভাগ এবং খাদ্য ও ওষুধ প্রশাসনকে এফডিএ-কে। তাদের কাজ ছিল জিন প্রযুক্তি যেন মানুষের জন্য নিরাপদ থাকে তা নিশ্চিত করা।

১৯৯৪ সালে মার্কিন সরকার ক্যালজিনকে তাদের টমাটো বাজারজাত করার অনুমতি দেয়। ক্যালজিন এই টমোটোর নাম দেয় ফ্ল্যাভা-সেভা। সেই দিনটিতে রজার স্যালকুইস্ট সব টিভি চ্যানেলে সাক্ষাৎকার দিয়েছিলেন। তার হাতে ছিল একটি পাকা টসটসে টমাটো। তিনি টিভি দর্শকদের জানিয়েছিলেন ঐ টমাটো ক্ষেত থেকে তোলা হয়েছিল এক মাস আগে। মানুষ ব্যাপারটা খুবই পছন্দ করেছিল।

কিন্তু ফ্ল্যাভা-সেভা ছিল স্বল্প-স্থায়ী এক পণ্য। বিপুল চাহিদা থাকার পরও এতে থেকে কোন মুনাফা হতে পারেনি। কারণ এর উৎপাদন এবং সরবরাহের ব্যয় ছিল অনেক বেশি।

যুক্তরাষ্ট্র এবং পুরো এশিয়া জুড়ে এখন জিন পরিবর্তনের মধ্যে তৈরি কৃষিপণ্যের চাষাবাদ চলছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নে এধরনের শুধু একটি মাত্র ফসল চাষ করার অনুমতি রয়েছে।

রজার স্যালকুইস্ট এখন অবসর নিয়েছেন।

(ইতিহাসের সাক্ষীর এই পর্বটি তৈরি করেছেন ক্লেয়ার বোওজ। পরিবেশন করেছেন মাসুদ হাসান খান।)

সম্পর্কিত বিষয়