এ সপ্তাহের সাক্ষাতকার: সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব সৈয়দ হাসান ইমাম: পরিকল্পনীহীন জীবন যাকে টেনে এনেছে এপর্যন্ত
আপনার ডিভাইস মিডিয়া প্লেব্যাক সমর্থন করে না

এ সপ্তাহের সাক্ষাৎকার: সৈয়দ হাসান ইমাম

  • ২৬ এপ্রিল ২০১৭

বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব সৈয়দ হাসান ইমাম।

একাধিক পরিচয়ে পরিচিত যিনি। স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের শব্দসৈনিক, অভিনেতা, আবৃত্তিকার, পরিচালক এবং ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির আহ্বায়ক।

ভালবাসতেন রবীন্দ্রসঙ্গীত আর খেলা। কিন্তু ধীরে ধীরে জড়িয়ে গেছেন নাটক, চলচ্চিত্র আর সাংস্কৃতিক আন্দোলনে।

একজন ব্যাংকার থেকে অভিনেতা পরিচালক এবং সাংস্কৃতিক আন্দোলন কর্মী। কিভাবে?

বাড়িতেই ছিল রাজনৈতিক আর সাংস্কৃতিক আবহ।

জন্ম বর্ধমানে। ছেলেবেলা পশ্চিমবঙ্গে কেটেছে। বাবা সৈয়দ সোলেমান আলী ইনকাম ট্যাক্স কর্মকর্তা ছিলেন। অল্পবয়সে তিনি মারা যান। আর তখন সৈয়দ হাসান ইমামের বয়স মাত্র দুই বছর বয়স।

বাবার বাড়ি বাগেরহাটে। মামার বাড়ি বর্ধমানে।

"বাবা মারা যাওয়ার আগে চিঠি লিখে রেখে যান এবং মামার বাড়িতে লেখাপড়ার পরিবেশ ভালো ছিল বলে সেখানেই থাকার কথা লিখে যান বাবা"।

১৯৫৭ সালে পূর্ব পাকিস্তানে আসেন। সেবছরই প্রথমে দর্শনার সুগার মিলে এবং পরে ন্যাশনাল ব্যাংক অব পাকিস্তানে কাজে যোগ দেন। এরপর শুরু করেন মঞ্চে অভিনয়।

প্রতিবাদী শিল্পী সমাজের নেতৃত্ব

১৯৬১ সালে প্রতিকূল পরিস্থিতিতে রবীন্দ্র জন্ম শতবর্ষের আয়োজন করেন। রক্তকরবী, রাজা ও রানী, তাসের দেশ নাটকে অভিনয় করেন।

তিনি বলেন, " আসলে রবীন্দ্রনাথের রক্তকরবী যখন করি তখন অসংখ্য মানুষ এসেছিলেন। তারা নিজেদের তার সাথে যুক্ত করেছেন। তারা মনে করেছেন রাজার পতন মানে আইয়ুব খানের পতন। সংস্কৃতির এই তো গুণ। সংস্কৃতি কবর থেকে উঠে এসে আধুনিক হয়ে যায়"।

তিনি বলেন, "রবীন্দ্রনাথকে আমরা ব্যবহার করেছি আমাদের আন্দোলনে। মুক্তিযুদ্ধেও আমরা ব্যবহার করেছি। নজরুল, সুকান্ত, জীবনানন্দ দাশের -এর লেখাও এভাবে আমরা ব্যবহার করেছি"।

আর ৬০ সাল থেকে চলচ্চিত্রে কাজ শুরু। ১৯৬৫ সালে পাকিস্তানের চলচ্চিত্র উৎসবে শ্রেষ্ঠ অভিনেতার সম্মান লাভ করেন- খান আতাউর রহমানের অনেক দিনের চেনা ছবিতে অভিনয়ের জন্য। কিন্তু চলচ্চিত্রে কাজের তেমন ইচ্ছে ছিলনা বলে জানান সৈয়দ হাসান ইমাম।

Image caption সৈয়দ হাসান ইমাম

১৯৬৪ সালে তাঁর অভিষেক হয় টেলিভিশন নাটকে।

এরপর একাত্তর সালে বিক্ষুব্ধ শিল্পী সমাজ গঠন করা হয় শেখ মুজিবর রহমানের অসহযোগ আন্দোলনের অংশ হিসেবে। তার আহ্বায়ক ছিলেন সৈয়দ ইমাম। ৮ই মার্চ থেকে ২৫ মার্চ পর্যন্ত তারা অনুষ্ঠান বন্ধ করার সিদ্ধান্ত নেন। তিনি বলেন টেলিভিশন রেডিওতে তাদের বিরুদ্ধে অনুষ্ঠান- এটা ছিল দারুণ মানে শত্রুপক্ষের অস্ত্র তাদের বিরুদ্ধে ব্যবহার করা।

স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের শব্দ সৈনিক

১৯৭১ সালে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রে নাটক ও কথিতা বিভাগের পরিচালনার দায়িত্ব পালন করেন। জল্লাদের দরবার, চরমপত্র এসব অনুষ্ঠান দারুণ স্রোতাপ্রিয় হয়।

সেসময় 'সালেহ আহমেদ' ছদ্মনামে খবর পাঠ করতেন।

মুক্তিযুদ্ধের পর বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমী প্রতিষ্ঠায় হাসান ইমাম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। তবে একাডেমীর মাধ্যমে সাংস্কৃতিক আন্দোলন গড়ে তোলার লক্ষ্য থাকলেও সেটা আর হয়ে ওঠেনি বলে আক্ষেপ শোনা যায় তার কণ্ঠে।

তিনি মনে করেন, বর্তমানে সংস্কৃতি পড়ে গেছে লগ্নিকারীদের হাতে। আগে বিটিভি সরকারের নিয়ন্ত্রণে থাকলেও অনুষ্ঠান ছিল সংস্কৃতি কর্মীদের হাতে। ফলে বিচিত্র সব অনুষ্ঠান তৈরি হতো।

ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির সংগঠকের দায়িত্ব পালন করেন দীর্ঘসময়। ২০০১ সালে বিএনপি-জামায়াত জোট ক্ষমতায় এলে তিনি দেশ ছাড়তে বাধ্য হন নিরাপত্তার আশংকায়।

একাধিকবার তাকে হত্যার চেষ্টা হয়েছে বলেও তিনি জানান।

একুশে পদক, স্বাধীনতা পুরস্কারসহ অসংখ্য পুরস্কার ও সম্মাননা পেয়েছে অশীতিপর এই সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব।

হাসান ইমাম টেলিভিশন নাট্যকার, নাট্যশিল্পী সংস্থার প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি ছিলেন প্রায় চার দশক।

তিনি বাংলাদেশ টেলিভিশন নাট্যশিল্পী ও নাট্যকার সংসদ, বাংলাদেশ উদীচী শিল্পী গোষ্ঠীসহ বহু সংগঠনের সভাপতি কিংবা আহ্বায়ক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

এখনও তিনি সময় পেলে গান গাইতে ভালবাসেন ।

বিবিসি বাংলার ঢাকা স্টুডিওতে এসেছিলেন সৈয়দ হাসান ইমাম। তাঁর সাক্ষাৎকার নিয়েছেন বিবিসি বাংলার শায়লা রুখসানা।

সম্পর্কিত বিষয়