পরিবহন মালিক ও শ্রমিকদের দাপটে নির্লিপ্ত সরকার

যাত্রীরা বাসে ওঠার চেষ্টা করছে।
Image caption সিটিং সার্ভিস বাস আবার চলছে এবং এমন বাস থাকবে কিনা, সে ব্যাপারে তিনমাস পর সিদ্ধান্ত নেয়ার কথা বলা হয়েছে।

বাংলাদেশে বিশেষজ্ঞদের অনেকে বলেছেন, সড়ক পরিবহন খাতের মালিক এবং শ্রমিক সংগঠনের দাপটের কাছে সরকার অনেক সময় নির্লিপ্ত ভূমিকার পরিচয় দিচ্ছে। ফলে এই খাতে বিশৃঙ্খলা বা নৈরাজ্য অব্যাহত রয়েছে এবং যাত্রীদের ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে।

সড়ক পরিবহনের জন্য একটি আইনের খসড়া মন্ত্রীসভা নীতিগতভাবে অনুমোদন করেছে।কিন্তু সড়ক দুর্ঘটনায় যাত্রীদের হতাহতের ঘটনায় চালকের সাজা কঠোর করার প্রস্তাবসহ বেশ কিছু বিষয়ে পরিবহণ মালিক ও শ্রমিক সংগঠনের আপত্তি নিয়ে সরকারকে এখন আলোচনা করতে হচ্ছে।

বাস টার্মিনালের রোজকার চিত্র কেমন?

রাজধানী ঢাকার অন্যতম প্রধান বাস টার্মিনাল গাবতলি থেকে উত্তর এবং দক্ষিণ পশ্চিমের জেলাগুলোর বাস চলাচল করে। এখন দেশে বড় কোন উৎসব নেই। যাত্রীর বাড়তি চাপ নেই।

এরপরও গাবতলি বাস টার্মিনালে গিয়ে দেখা যায়, অনেক বাস নির্ধারিত সময়ে ছাড়ছে না।

যাত্রীদের ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হচ্ছে। সব আসন পূর্ণ হওয়ার পরই বাস ছাড়ার কথা বলা হচ্ছে।

গাবতলিতে দুই শিশু সন্তান নিয়ে সুফিয়া বেগম যশোরে বাড়িতে যাওয়ার জন্য সকাল সাতটার বাসের টিকেট কাটেন। কিন্তু সকাল দশটাতেও বাসের দেখা মেলেনি।

তিনি বলছিলেন,ভাড়া বেশি নিলেও কখন বাস পাবেন, কাউন্টার থেকে তার কোন জবাব দেয়া হয় না।

Image caption গাবতলি বাস টার্মিনালে গিয়ে দেখা যায়, অনেক বাস নির্ধারিত সময়ে ছাড়ছে না।যাত্রীদের ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হচ্ছে।

ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী মোখলেসুর রহমান অপেক্ষার কয়েক ঘণ্টায় কয়েকবার কাউন্টারে গিয়ে বাস ছাড়ার সময় জানতে চেয়েছেন।জবাবে পেয়েছেন দুর্ব্যবহার।

এই যাত্রীরা জানেন না, তাদের এসব হয়রানির প্রতিকার তাঁরা পাবেন কার কাছে?

সড়কে ভোগান্তি আর চাঁদাবাজির অভিযোগ নিয়মিত

সড়ক পরিবহনে যাত্রীদের ভোগান্তি এবং রাস্তায়-রাস্তায় গাড়ির উপর চাঁদাবাজিসহ বিশৃঙ্খলার অভিযোগ নতুন নয়।

কিন্তু দিনে-দিনে পরিস্থিতিটা জটিল হয়েছে।এমন পরিস্থিতির অবকাঠামো এবং সরকারের পরিকল্পনার অভাবের কথাও তুলে ধরছেন বিশেষজ্ঞদের অনেকে।

এর সাথে সড়ক পরিবহন মালিক এবং শ্রমিক সংগঠনের দাপটের কথাও উঠছে।

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় বা বুয়েটের অ্যাকসিডেন্ট রিসার্চ ইনস্টিউটের অধ্যাপক শামসুল হক মনে করেন, সড়ক পরিবহণ খাতটি এর মালিক এবং শ্রমিক সংগঠনের উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ায় অরাজকতা বন্ধ করা সম্ভব হচ্ছে না।

তিনি বলছিলেন, "খেয়াল-খুশিমতো রুট পারমিট দেয়া থেকে শুরু করে সব প্রক্রিয়া চলছে। কে বাস সেবা দেবে, কে লেগুনা সেবা দেবে? বাসসহ যানবাহন চলাচলের জন্য রাস্তায় বিভিন্ন জায়গায় টার্মিনাল বা অবকাঠামো কতটা আছে?এসব প্রশ্নে সমন্বিত কোন পরিকল্পনা না থাকায় পরিস্থিতি শুধু খারাপ নয়, জটিল হয়েছে।"

অধ্যাপক শামসুল হক মনে করেন, সমন্বিত পরিকল্পনা না থাকায় সড়ক পরিবহন খাতটি মালিক এবং শ্রমিক সংগঠনের উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে।

"মালিক এবং শ্রমিক সংগঠনের উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ায় সড়ক পরিবহণ ব্যবস্থায় অরাজকতা থাকছে।এই সংগঠনগুলোর স্বার্থ অনেক ক্ষেত্রে কাজ করে। সংগঠনগুলো শক্তিশালী হওয়ায় সরকার কর্নার বা কোণঠাসা।এর প্রভাবে ভোগান্তি হচ্ছে জনগণের।"

মালিক শ্রমিক সংগঠনের প্রভাব

মালিক ও শ্রমিক সংগঠনের প্রভাবের বহি:প্রকাশ সর্বশেষ কিছুদিন আগেই দেখা গেছে ঢাকা রাস্তায়।

ঢাকা নগরীতে সিটিং সার্ভিসের নামে কিছু বাস সব পয়েন্টে থামে এবং অল্প দূরত্বের যাত্রীদের কাছেও পুরো রুটের ভাড়া নেয়।

এ ধরণের নানান অভিযোগের প্রেক্ষাপটে সব পয়েন্ট থেকে যাত্রী ওঠানো এবং দূরত্ব অনুযায়ী ভাড়া নেয়ার নির্দেশ দিয়েছিল সরকার এবং অভিযান চালিয়েছিল।

তখন মালিকরা অনাষ্ঠানিকভাবে বেশ কয়েকদিন বাস চলাচল বন্ধ করে রেখেছিল।

চরম দুর্ভোগে পড়েছিলেন সাধারণ মানুষ। সরকার পিছু হটেছে। এখন আবার সিটিং সার্ভিস বাস চলছে এবং এমন বাস থাকবে কিনা, সে ব্যাপারে তিনমাস পর সিদ্ধান্ত নেয়ার কথা সরকার থেকে বলা হয়েছে।

যাত্রীরা কিন্তু ভোগান্তি থেকে মুক্তি পাননি। ফার্মগেট এলাকার রাস্তায় কয়েকজন যাত্রীর কণ্ঠে ভোগান্তির নানান অভিযোগ পাওয়া গেছে।

পরিবহন বিশৃঙ্খলা এবং দুই মন্ত্রীর অবস্থান

ঢাকায় সিটিং সার্ভিস নিয়ে সমস্যার ক্ষেত্রে সরকারের দু'জন মন্ত্রীর প্রভাবের বিষয় সামনে এসেছিল।

সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশনের নেতা হিসেবে নৌ-পরিবহন মন্ত্রী শাহাজান খান এবং পরিবহন মালিক সমিতির নেতা হিসেবে প্রতিমন্ত্রী মশিউর রহমান রাঙ্গা অনেক সমালোচনার মুখে পড়েছিলেন।

দেশে সড়ক পরিবহনে বিশৃঙ্খল পরিস্থিতির জন্য এই দু'জন মন্ত্রীর প্রভাবের দিকেই অনেকে আঙ্গুল তোলেন। তবে তারা সব অভিযোগ অস্বীকার করে আসছেন।

মন্ত্রী শাজাহান খান বলছিলেন,এখন সড়ক পরিবহনে শৃঙ্খলা ফিরে এসেছে।

Image caption মন্ত্রী শাজাহান খান দাবি করেন, এখন সড়ক পরিবহনে শৃঙ্খলা ফিরে এসেছে।

"সড়ক পরিবহনে আগে কথায় কথায় যেভাবে গাড়ি বন্ধ করা হতো। সেই পরিবেশ বা পরিস্থিতি এখন নেই।অনেক শৃঙ্খলা ফিরে এসেছে। পরিবহন খাতের মালিক-শ্রমিক মিলিয়ে প্রায় এককোটি মানুষ দেশের জনগণ থেকে বাইরে নয়। জনগণের সেবা দিতে প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে কার্যকর সব পদক্ষেপ নেয়া হচ্ছে।"

তিনি দাবি করেন, সড়ক দুর্ঘটনার হারও অনেক কমে এসেছে। পুলিশের তথ্যের ভিত্তিতে বুয়েটে অ্যাকসিডেন্ট রিসার্চ ইন্সটিটিউট বলছে,এখন বছরে সড়ক দুর্ঘটনায় গড়ে প্রায় দু'হাজার জনের মৃত্যু হচ্ছে।

বিশ্বব্যাংকসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার হিসাবে এই সংখ্যা কয়েকগুণ বেশি। দেশে ত্রিশ লাখের বেশি যানবাহনের জন্য অনেক কম অর্থাৎ ষোল লাখের মতো নিবন্ধিত চালক আছে।

Image caption সড়ক দুর্ঘটনায় স্ত্রীর মৃত্যুর পর থেকে নিরাপদ সড়কের দাবিতে আন্দোলন করছেন অভিনেতা ইলিয়াস কাঞ্চন

সড়ক দুর্ঘটনায় স্ত্রীর মৃত্যুর পর প্রায় দুই যুগ ধরে নিরাপদ সড়কের দাবিতে আন্দোলনকারী চলচ্চিত্র অভিনেতা ইলিয়াস কাঞ্চন বলছিলেন, তাঁর আন্দোলনের এত বছরেও রাস্তায় তেমন উন্নতি তিনি দেখছেন না।

"নৈরাজ্যই চলছে। কারণ যারা সড়ক পরিবহণ খাত অপারেট করছে, তারা তাদের ইচ্ছামতো ভাড়া বাড়াচ্ছে এবং জনগণকে সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত করছে। চালকের সংখ্যাও অনেক কম। সেখানে শিক্ষিত চালকের ব্যবস্থা না করায় একই গোষ্ঠীর কাছেই যাত্রীদের জিম্মি থাকতে হচ্ছে।"

সড়ক পরিবহন মন্ত্রীর 'চ্যালেঞ্জ'

বিভিন্ন সময় সড়ক পরিবহন মন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরের বক্তব্যেও পরিবহণ খাতের পরিস্থিতির পিছনে প্রভাবের কথা এসেছে।

যদিও তিনি প্রভাবশালীদের নাম কখনও প্রকাশ করেননি। কিন্তু তাঁর সেসব বক্তব্যে প্রভাবের কাছে সেভাবে কিছু করতে না পারার ইঙ্গিত ছিল।

মন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বিবিসিকে বলছিলেন, সড়ক পরিবহনে পরিবেশ উন্নত করার বিষয়কে তিনি চ্যালেঞ্জ হিসেবে নিয়েছেন। এই চ্যালেঞ্জ নিয়ে এগুতে তিনি সকলের সহযোগিতা চান।

"চ্যালেঞ্জ অতিক্রম করতে আমি হাল ছাড়ছি না। সকলকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। তা না হলে একা যোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের পক্ষে এই চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করা সম্ভব হবে না।"

আইনের ভারসাম্যহীতা

বিভিন্ন মহলের পাশাপাশি সড়ক পরিবহন মালিক এবং শ্রমিকদের সংগঠনগুলোও দীর্ঘদিন ধরে এই খাতে যুগোপযোগী একটি আইন করার দাবি করে আসছিল। শেষ পর্যন্ত মন্ত্রীসভা আইনের একটি খসড়া নীতিগতভাবে অনুমোদন করেছে।

কিন্তু সড়ক দুর্ঘটনায় হতাহতের ঘটনায় সাজা হিসেবে মৃত্যুদণ্ড বা যাবজ্জীবন সাজার প্রস্তাব এসেছে খসড়ায়।

এটিসহ বেশ কিছু বিষয়ে মালিক এবং শ্রমিক সংগঠনগুলো আপত্তি তুলেছে। এসব আপত্তিকে ভিত্তি করে মন্ত্রী শাজাহান খান সংশোধনী প্রস্তাবও দিয়েছেন।

তিনি তাঁদের সংশোধনী প্রস্তাবের ব্যাপারে বলছিলেন, "অনেকে মনে করেন, মৃত্যুদণ্ড হলেই সড়ক দুর্ঘটনা কমে যাবে।কিন্তু দুর্ঘটনার জন্য মৃত্যুদণ্ড বা যাবজ্জীবন সাজার আইন দুনিয়ার কোথাও নেই।এছাড়া হেলাপারদের পঞ্চম শ্রেণী পাস হতে হবে।

হেলাপার যখন দক্ষ হয়ে চালক হবে, তখন সে অষ্টম শ্রেণী পাসের সার্টিফিকেট কোথায় পাবে।এসব নিয়ে মালিক শ্রমিকদের আপত্তি আছে।"

আরেকজন মন্ত্রী এবং সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির নেতা মশিউর রহমান রাঙ্গার সাম্প্রতিক কিছু বক্তব্যেও তাদের অবস্থানের পক্ষে শক্ত বক্তব্য এসেছে।

তাদের আপত্তি বিবেচনা করা না হলে তিনি মন্ত্রীসভা থেকে সরে যাবেন, তাঁর এমন বক্তব্যও সংবাদমাধ্যমে প্রকাশ হয়েছে।তিনি বিবিসিকে বলেছেন, যেভাবে খসড়াটি এসেছে, সেভাবেই পাস হোক সেটা তাঁরা চান।

বিশেষজ্ঞদের অনেকে অবশ্য বলছেন, আইনের খসড়ায় কিছু প্রস্তাবে ভারসাম্যের অভাব তারা দেখছেন।

Image caption অধ্যাপক শামসুল হক মনে করেন, আইনের খসড়ায় কিছু প্রস্তাবে ভারসাম্যের অভাব রয়েছে।

অধ্যাপক শামসুল হক বলছিলেন,সড়ক দুর্ঘটনার জন্য শুধু চালক এবং হেলপারদের বিরুদ্ধেই ব্যবস্থা নেয়ার প্রস্তাব এসেছে এবং এখানে ভারসাম্য আনা প্রয়োজন।

"দুর্ঘটনার জন্য গাড়ির চালক বা হেলপারেরই সাজার প্রস্তাব করা হয়েছে আইনের খসড়ায়। অন্যপক্ষগুলোর দায়ের প্রশ্ন সেখানে আসেনি। ফলে এখানে ভারসাম্য আনা দরকার।"

তবে পরিবহন মালিক-শ্রমিক সংগঠনের আপত্তির উপর ভিত্তি করে তাদের দেয়া প্রস্তাব নিয়ে সরকার এখন আলোচনা চালাচ্ছে।মন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেছেন,সংশ্লিষ্ট সবপক্ষের সাথে আলোচনা করেই সরকার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে।

"নিয়ম অনুযায়ী সব স্টেক হোল্ডারদের সাথে কথা বলেই এই আইন করা হচ্ছে।মন্ত্রীসভায় খসড়া নীতিগত অনুমোদনের পর এখন আইন মন্ত্রনালয়ে ভেটিং চলছে।

এই পর্যায়ে আমি স্টেক হোল্ডারদের পরামর্শ দিয়েছি যে, তাঁরা আইন মন্ত্রণালয়ে কথা বলতে পারেন। তারপর আলোচনার মাধ্যমেই সিদ্ধান্ত নেয়া হবে।"

এখন খসড়া চূড়ান্ত করতে সময়ের প্রয়োজনীয়তার কথা মন্ত্রীর বক্তব্যেই এসেছে।শেষপর্যন্ত আইনটি প্রণয়ন করা হলে সড়ক পরিবহণ খাতে পরিবর্তন আনা সম্ভব হবে বলে সরকার বলছে।

তবে বিশেষজ্ঞরা আইনের পাশাপাশি অবকাঠামোর উন্নয়নসহ পরিবেশ সৃষ্টির জন্য সবপক্ষের নজর দেয়ার বিষয়ে তাগিদ দিচ্ছেন।