ইতিহাসের সাক্ষী
আপনার ডিভাইস মিডিয়া প্লেব্যাক সমর্থন করে না

'মিশরের লোককে ফেসবুক চিনিয়েছি আমিই'

  • ৭ মে ২০১৭

২০০৮ সালের এপ্রিল মাসে প্রথমবারের মতো সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহার করে সরকারবিরোধী বিক্ষোভ সংগঠিত করতে চেষ্টা করেছিলেন সে সময় মিশরের গণতান্ত্রিক আন্দোলনের কর্মীরা ।

এদের একজন ইসরা আবদুল ফাত্তাহ - যিনি তারও তিন বছর আগে চেষ্টা করেছিলেন একটি সাধারণ ধর্মঘট ডাকার জন্য ফেসবুক ব্যবহার করতে।

"আমি ফেসবুকের ওই গ্রুপটি গঠন করি মার্চের ২৩ তারিখ। আর এপ্রিল মাসের ৬ তারিখ নাগাদ সেই গ্রুপের সদস্য দাঁড়ালো ৭০ হাজার। আমার জন্য এটা ছিল একেবারেই অপ্রত্যাশিত। ফেসবুকে সেই প্রথম আন্দোলনকারীদের গ্রুপ যে এতটা সাড়া পাবে আমি ভাবতে পারি নি।"

ইসরা আবদুল ফাত্তাহ ছিলেন এজন অধিকারকর্মী। তিনি একটি রাজনৈতিক দলও করতেন। তিনি শুনলেন, মিশরের উত্তরাঞ্চলের একটি শহরের এক টেক্সটাইল কারখানায় ধর্মঘটের পরিকল্পনা হচ্ছে।

শ্রমিকরা নিম্ন বেতন এবং জিনিসপত্রের দাম বাড়ানোর সরকারি সিদ্ধান্তের প্রতিবাদ জানাতে চাচ্ছিলেন। ইসরা জানতেন যে জিনিসপত্রের মূল্যবৃদ্ধি নিয়ে যে শুধু এই কারখানার শ্রমিকরাই অখুশি তা নয়।

"আমি সুপারমার্কেটের মালিক এবং সাধারণ লোকজনের সাথে কথা বলতে শুরু করলাম। সবাই বললো, জিনিসপত্রের দাম বেড়ে যাচ্ছে। আমি যখন তাদের বললাম যে এর বিরুদ্ধে আমরা একদিনের একটা ধর্মঘট করতে পারি, দোকানদাররা দোকান বন্ধ রাখতে পারেন, ক্রেতারা সেদিন জিনিসপত্র কেনা বন্ধ রাখতে পারেন - তারা সবাই এতে সাড়া দিলেন।"

ছবির কপিরাইট Carl Court

তার কিছুকাল আগেই ফেসবুকে একাউন্ট খুলেছিলেন ইসরা। তিনি একটি ছোট আকারের বিক্ষোভ সংগঠিত করার জন্য এটি ব্যবহারও করেছিলেন। তিনি ভাবতে লাগলেন, ফেসবুককে কি আরো বড় কিছুর জন্য কাজে লাগানো যায় না?

"যখন আমি এবং আমার সহকর্মী আহমেদ মাহের ধর্মঘটের কথা শুনলাম, আমরা ভাবলাম - এটাকে আমরা একটা শ্রমিক ধর্মঘট থেকে সাধারণ ধর্মঘটে পরিণত করতে পারি কিনা। তখনই আমরা সিদ্ধান্ত নিলাম, একটা সাধারণ ধর্মঘট করার জন্য ডাক দিয়ে আমরা ফেসবুকে প্রচার চালাবো। "

আহমেদ মাহের ছিলেন আরেকজন রাজনৈতিক কর্মী। তিনি পরে ২০১১ সালের কায়রোর গণতান্ত্রিক বিপ্লবের একজন নেতায় পরিণত হয়েছিলেন। কিন্তু ২০০৮ সালের বসন্তে, তিনি এবং ইসরা একটি ফেসবুক গ্রুপ গঠন করলেন যার নাম ছিল - মিশরে সাধারণ ধর্মঘট।

খুব শিগগিরই এতে হাজার হাজার লোক যোগ দিতে লাগলেন। তারা একটি বিবৃতি প্রকাশ করলেন - যাতে স্বাক্ষর করলেন অনেকগুলো সরকারবিরোধী গোষ্ঠার নেতারা।

"আমাদের যেসব বন্ধু এবং গণতান্ত্রিক কর্মীরা ব্লগ লিখতো তাদের আমরা আমন্ত্রণ জানালাম। তাদের বললাম এই নতুন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম আমাদের এক জায়গায় হতে সাহায্য করতে পারে। আমাদের পরিচিত লোকেরা - যাদের ইমেল ঠিকানা আমাদের কাছে ছিল তাদের সবাইকে আমরা ফেসবুকে একাউন্ট খুলতে আহ্বান জানালাম। "

ছবির কপিরাইট AHMAD AL-RUBAYE
Image caption তাহরির স্কোয়ারে গণবিক্ষোভ

'ধর্মঘটের ঠিক আগের দিন, পাঁচই এপ্রিল রাতে -মিশরের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় একটি ইশতেহার প্রকাশ করলো। তাতে বলা হলো - কেউ বিক্ষোভ প্রদর্শন করলে বা যানবাহন চলাচলে বাধা দিলে সঙ্গে সঙ্গে ব্যবস্থা নেয়া হবে।"

৬ই এপ্রিল সকাল বেলা ইসরা কায়রোর রাস্তায় বের হলেন। তিনি সংগ্রামের জন্য প্রস্তুত।

"আমি কাজে যাই নি। আমি চলে গেলাম তাহরির স্কোয়ারে, সেখানে আমার সহযোগী কর্মীদের সাথে সাক্ষাত হলো - ঠিক যেমনটা কথা ছিল। আমি কালো কাপড় পরে ছিলাম এবং এটাও ছিল পরিকল্পনার একটি অংশ।"

"আমার মায়ের ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় ছিল খুবই প্রখর। তার মনে হয়েছিল, আমি বাড়ি থেকে বেরোলে আর ফিরবো না। তিনি বার বার আমাকে সতর্ক করলেন আমি যেন বাইরে না যাই। কিন্তু আমি তাকে বললাম, এতদিন ধরে আমরা যা করেছি - এর পর রাস্তায় না নামাটা আমার পক্ষে অসম্ভব।"

কায়রোতে জনগণের মধ্যে ধর্মঘট নিয়ে বিভক্তি ছিল। সবাই যে অংশ নিয়েছিল তা নয়।

ছবির কপিরাইট Spencer Platt
Image caption তাহরির স্কোয়ার

"খবরে দেখা গেছে, অন্যান্য দিনের তুলনায় কায়রোর রাস্তায় যানবাহন ছিল কম। অনেকেই ভয় পাচ্ছিল, রাস্তায় বিক্ষোভকারী আর পুলিশের সংঘর্ষ হবে, তাই তারা তাদের বাচ্চাকাচ্চাদের স্কুলে পাঠায়নি।"

মাহল আল কবরা শহরে সাদা পোশাকের নিরাপত্তা বাহিনীর লোকেরা আগের রাত থেকেই টেক্সটাইল কারখানাটির দখল নিয়েছিল। শহরের প্রধান স্কোয়ারে পুলিশ এবং শ্রমিকদের মধ্যে সংঘর্ষ হয়েছিল। মিশরের অন্যান্য জায়গায় কিন্তু পুলিশের ব্যাপক উপস্থিতির কারণে ধর্মঘট মোটামুটি ব্যর্থই হয়। কিন্তু ইসরা বিশ্বাস করেন তার পরও এটা একটা প্রভাব ফেলেছিল।

"তারা এমন একটি ফেসবুক ইভেন্টএর আয়োজন করলো - যা নিয়ে সবাই আলোচনা করছিল। একটি টিভি চ্যানেল যখন একটা নামকরা টক শোর মাঝখানে এ নিয়ে খবর জানালো, এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রণালয়ের বিবৃতিটি পড়লো - আমার মনে হলো এটা একটা সাফল্য।"

কায়রোতে ইসরা এবং তার সহযোগীরা তাহরির স্কোয়ারে সমবেত হলেন। তারা ফাঁকা রাস্তার ছবি তুললেন। অনেকখন হাঁটার পর তার বিশ্রাম নিতে একটা ক্যাফেতে ঢুকে বসলেন।

"ঠিক সেই সময় একটা বাস এসে ক্যাফের সামনে থামলো এবং আমাদের সবাইকে গ্রেফতার করে তাতে ওঠালো।"

ইসরাকে স্থানীয় পাবলিক প্রসিকিউটরের অফিসে নিয়ে যাওয়া হলো। পরের দিন তাকে একটি থানায় নিয়ে যাওয়া হলো, সারা রাত সেখানে রাখা হলো।

"আমার সেই বন্দীদশার সবচাইতে কঠিন দিকটা ছিল সেই অতি ছোট ঘরটাতে থাকা। এতে বড়জোর পাঁচজন লোকের জায়গা হতে পারে। কিন্তু তাতে ছিল প্রায় ৭০ জন লোক।"

প্রথমে ইসরাকে নিয়ে যাওয়া হলো মেয়েদের একটি কারাগারে। তার পর এপিলের ১৬ তারিখ তাকে রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা ভবনে নিয়ে যাওয়া হলো এক দিনের জন্য।

"সারা দিন আমাকে চোখ বেঁধে জিজ্ঞাসাবাদ করা হলো। আমি শুনতে পাচ্ছিলাম অনেক লোকের আওয়াজ - এবং তাদের ওপর স্পষ্টতই নির্যাতন করা হচ্ছিল। আমার মনে হলো আমি যদি সব স্বীকার না করি তাহলে আমার ওপরও একভাবে নির্যাতন করা হবে।"

"আমাকে বলা হলো যে উচ্চস্তরের রাজনৈতিক কর্মীরা - যারা এ দেশকে ধ্বংস করতে চায় - তারা আমাকে ব্যবহার করছে। আমি তাদের বোঝানোর চেষ্টা করলাম যে আমিই এই ধর্মঘটের ডাক দিয়েছিলাম - আমার কম্পিউটার ব্যবহার করে। আমি ভেবেছিলাম এতে দেশে একটা পরিবর্তন আসবে। কিন্তু ওরা আমার কথা বিশ্বাস করে নি।"

মিশরের সংবাদমাধ্যমে ইসরার গ্রেফতারের খবর বের হলো - তাকে নাম দেয়া হলো 'দি ফেসবুক গার্ল'।

ছবির কপিরাইট Dan Kitwood
Image caption ফেসবুক

"নামটা আমার ভালোই লেগেছে। আমি মিশরের লোককে ফেসবুকের সাথে পরিচয় করিয়ে দিয়েছি। আমি আমার ফেসবুক পেজে ওই নামটা ব্যবহারও করেছি।"

অনলাইনের মাধ্যমে এরকম জনমত তৈরি করা থেকেই জন্ম নিলো সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমকে কেন্দ্র করে আন্দোলনকারীদের তৎপরতা বা এ্যাকটিভিজম। ২০১১ সাথে জানুয়ারির ২৫ ও ২৬ তারিখ প্রেসিডেন্ট হোসনি মুবারকের সরকারের বিরুদ্ধে গণবিক্ষোভের ডাক দেবার জন্য আবার সামজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহৃত হলো।

"সেই বিক্ষোভে পক্ষে জনগণকে সংগঠিত করতে আমরা সবাই কাজ করেছিলাম। আমরা জনগণকে ব্যাখ্যা করলাম কেন আমরা এই বিক্ষোভ করছি, কি আমাদের দাবি।"

এবার কিন্তু ফেসবুকের মাধ্যমে করা এই আন্দোলন সফল হলো। জানুয়ারির ২৫ থেকে ২৮ পর্যন্ত মিশরের লোক রাস্তায় নেমে এলো। লক্ষ লক্ষ বিক্ষোভকারী তাহরির স্কোয়ার দখল করে অবস্থান নিলো।

অবশেষে ৩০ বছর ক্ষমতায় থাকার পর ফেব্রুয়ারির ১১ তারিখ হোসনি মুবারক পদত্যাগ করলেন। এখন ইসরা যখন ২০০৮ এবং ২০১১-র সেই দিনগুলোর কথা ভাবেন - তার মনে হয়, এর কোনটাই বিফল হয় নি।

"দুটো ঘটনারই মূল লক্ষ্য হচ্ছে, তারা জনগণকে তাদের মত প্রকাশ করতে অনুপ্রাণিত করেছিল। আমরা কখনোই ২৬শে জানুয়ারির পরিবর্তন ঘটতে দেখতাম না , যদি তার আগেকার রাজনৈতিক পর্বগুলো না ঘটতো। আমি গর্বিত এ আমি ওই ঘটনাগুলো দেখিছি, এবং তাতে একটা ভুমিকা পালন করতে পেরেছি।"

ইসরা আবদুল ফাত্তাহ এখন একজন ফ্রিল্যান্স সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম বিশেষজ্ঞ হিসেবে কাজ করেন।